ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
সময়: ০৫:০২:৫০ AM

টিউলিপকে ফ্ল্যাট: ইস্টার্ন হাউজিংয়ের পাচার

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
09-09-2026 07:37:48 PM
টিউলিপকে ফ্ল্যাট: ইস্টার্ন হাউজিংয়ের পাচার

ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেডের চেয়ারম্যান মঞ্জুরুল ইসলাম, পরিচালক ও পরিকল্পনা বিভাগের প্রধান মুহাম্মদ মাজহারুল ইসলাম এবং সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ধীরাজ মালাকারের বিরুদ্ধে বিদেশে প্রায় হাজার কোটি টাকা পাচার, ক্ষমতার অপব্যবহার, ভূমি দখল, জালিয়াতি ও প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিশেষ সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত এই তিন ব্যক্তির সম্পদ ও দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান করতে গিয়ে এসব তথ্য পাওয়ার দাবি করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

দুদকের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, অনুসন্ধান চলাকালে ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেডের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও তথ্য সংগ্রহে প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। একাধিকবার নথিপত্র চাওয়া হলেও প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বিভিন্ন অজুহাতে তা এড়িয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এমনকি অনুসন্ধান দলের সদস্যদের হুমকি-ধমকি দেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে বলে ওই কর্মকর্তা জানান।

দুদকের অনুসন্ধানে দুর্নীতির অভিযোগ
দুদকের নথি অনুযায়ী, চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত এক সভায় মঞ্জুরুল ইসলাম ও ধীরাজ মালাকারের সম্পদ, জালিয়াতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, ভূমি দখল, প্রতারণা এবং বিদেশে অর্থ পাচার-সংক্রান্ত অভিযোগ খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অনুসন্ধান এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইস্টার্ন হাউজিংয়ের পরিচালক ও পরিকল্পনা বিভাগের প্রধান মুহাম্মদ মাজহারুল ইসলামের নামও এতে উঠে আসে।

পাঁচ সদস্যের অনুসন্ধান কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন দুদকের উপপরিচালক মো. হাফিজুল ইসলাম। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন সহকারী পরিচালক শাহ আলম শেখ ও এস এম রাশেদুল হাসান এবং উপসহকারী পরিচালক রুবেল হোসেন ও হাবিবুর রহমান।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অনুসন্ধান কমিটির প্রধান হাফিজুল ইসলাম কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনুসন্ধান কমিটির এক সদস্য বলেন, মঞ্জুরুল ইসলাম শুধু ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেডের সঙ্গে যুক্ত নন; তিনি বেঙ্গল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং কমপ্লেক্স, নাভানা ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, নাভানা ফার্মাসিউটিক্যাল লিমিটেড, জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতাল, সুরমা লাফার্জ হোলসিম বাংলাদেশ (পিএলসি) এবং আফতাব বহুমুখী ফার্ম লিমিটেডেরও পরিচালক।

ওই সদস্যের দাবি, বছরের বেশিরভাগ সময় মঞ্জুরুল ইসলাম যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করেন। একাধিকবার সাক্ষাতের জন্য সময় চাওয়া হলেও তিনি সাড়া দেননি। তবে সম্প্রতি তিনি দেশে ফিরেছেন বলে জানা গেছে। এ অবস্থায় অনুসন্ধান কমিটি আবারও তার সাক্ষাতের জন্য সময় চাইবে।

কমিটির আরেক সদস্যের ভাষ্য, মঞ্জুরুল ইসলামের সঙ্গে ধীরাজ মালাকার ও মুহাম্মদ মাজহারুল ইসলামের ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার তথ্য অনুসন্ধানে এসেছে। তাদের বিরুদ্ধে মঞ্জুরুল ইসলামের কথিত অনিয়ম ও দুর্নীতিমূলক কর্মকাণ্ড সমন্বয়ের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

যেসব অভিযোগ অনুসন্ধানে এসেছে
দুদকের অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, মঞ্জুরুল ইসলাম ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে কয়েকটি গুরুতর অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

প্রথমত, হাউজিং ব্যবসার আড়ালে রাজধানীর রামপুরা, আফতাবনগর ও মিরপুর এলাকায় সাধারণ মানুষের বসতভিটা এবং সরকারি খাসজমি দখল করে প্লট তৈরি ও বিক্রির মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।

দ্বিতীয়ত, নিজেদের প্রভাববলয় সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে যুক্তরাজ্যের সাবেক সিটি মিনিস্টার ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাগনি টিউলিপ সিদ্দিককে ঘুষ হিসেবে ফ্ল্যাট উপহার দেওয়ার অভিযোগও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তৃতীয়ত, সরকারি সম্পত্তি দখল ও আত্মসাৎ করে সেখানে প্লট তৈরি করার অভিযোগ রয়েছে।

চতুর্থত, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর ও অস্ট্রেলিয়ায় বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের অভিযোগও অনুসন্ধানের আওতায় রয়েছে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মঞ্জুরুল ইসলাম, ধীরাজ মালাকার ও মুহাম্মদ মাজহারুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

মঞ্জুরুল ইসলামের ‘টিউলিপ কানেকশন’
রাজধানীর গুলশানে ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেডের একটি ফ্ল্যাট অবৈধভাবে নেওয়ার অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছোট বোন শেখ রেহানার মেয়ে এবং যুক্তরাজ্যের সাবেক সিটি মিনিস্টার টিউলিপ সিদ্দিকসহ তিনজনের বিরুদ্ধে গত বছরের ১৫ এপ্রিল মামলা করে দুদক।

দুদকের ঢাকা সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মনিরুল ইসলাম বাদী হয়ে মামলাটি করেন। মামলায় টিউলিপ রিজওয়ানা সিদ্দিক, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সাবেক সহকারী আইন উপদেষ্টা শাহ মো. খসরুজ্জামান এবং সাবেক সহকারী আইন উপদেষ্টা-১ সরদার মোশারফ হোসেনকে আসামি করা হয়।

মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে ক্ষমতার অপব্যবহার করে কোনো অর্থ পরিশোধ না করেই ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেডের গুলশান-২ এলাকার একটি ফ্ল্যাট দখলে নেন। পরে সেটি নিজেদের নামে নিবন্ধন করিয়ে নেওয়ার অভিযোগ করা হয়।

ফ্ল্যাটটির ঠিকানা হিসেবে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে—ফ্ল্যাট বি/২০১, বাড়ি নম্বর ৫এ ও ৫বি (পুরোনো), বর্তমানে ১১৩ ও ১১বি, রোড নম্বর ৭১, গুলশান-২।

এই মামলার তদন্তেও মঞ্জুরুল ইসলামের নাম উঠে এসেছে বলে দুদক-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। একই সঙ্গে টিউলিপ সিদ্দিক ছাড়াও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অন্য কোনো আত্মীয় মঞ্জুরুল ইসলামের মাধ্যমে সুবিধা নিয়েছেন কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে সূত্রটির দাবি।

তদন্ত শেষে দাখিল হতে যাওয়া চার্জশিটে এসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত হতে পারে বলেও জানা গেছে। তবে চার্জশিট দাখিল ও আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত এসব অভিযোগকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।

আফতাবনগরের প্লট মালিকদের অভিযোগ
দুদকের অনুসন্ধানের পাশাপাশি আফতাবনগর প্রকল্পের বরাদ্দপ্রাপ্ত প্লট মালিক ও গ্রাহকদের একাংশও ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেডের বর্তমান ব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন।

তাদের অভিযোগ, কোনো ধরনের পূর্বনোটিশ ছাড়াই প্লটের বরাদ্দ বাতিল করা হচ্ছে, অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হচ্ছে, গ্রাহকদের কাছ থেকে পেমেন্ট গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে এবং তাদের ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে।

‘আফতাবনগর ভুক্তভোগী প্লট মালিকবৃন্দ’ ব্যানারে সংগঠিত হয়ে ভুক্তভোগীরা গত ৩ মে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেন। তাদের অভিযোগের তালিকায় রয়েছেন প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান মঞ্জুরুল ইসলাম, বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সিদ্দিক আহমেদ, পরিচালক ও পরিকল্পনা বিভাগের প্রধান মুহাম্মদ মাজহারুল ইসলাম এবং পরিচালক (লিগ্যাল) মতিউর রহমান।

ভুক্তভোগীদের দাবি, বাংলাদেশের রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০-এর ১৪ ধারা অনুযায়ী কোনো গ্রাহক কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হলেও অন্তত ৬০ দিনের লিখিত নোটিশ ছাড়া তার প্লটের বরাদ্দ বাতিল করার সুযোগ নেই। বিলম্বে কিস্তি পরিশোধের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ সুদসহ অর্থ গ্রহণের বিধান রয়েছে বলেও তারা দাবি করেন।

তাদের অভিযোগ, বাস্তবে কোনো লিখিত নোটিশ, শোকজ বা ব্যক্তিগত শুনানির সুযোগ না দিয়েই প্রায় ১০০ থেকে ১২০টি প্লটের বরাদ্দ বাতিল করা হয়েছে।

এ ছাড়া পূর্বনির্ধারিত মূল্যের বাইরে প্রতি কাঠায় ২০ লাখ থেকে ৭৫ লাখ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকেরা। তাদের ভাষ্য, এ ধরনের অর্থ দাবি বেআইনি ও প্রতারণামূলক।

বক্তব্য পাওয়া যায়নি ইস্টার্ন হাউজিংয়ের
দুদকের অনুসন্ধান এবং গ্রাহকদের অভিযোগের বিষয়ে ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেডের বক্তব্য জানতে প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কেউ এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।

চেয়ারম্যান মঞ্জুরুল ইসলাম ও পরিচালক মুহাম্মদ মাজহারুল ইসলামের সঙ্গেও একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

ফলে বিদেশে অর্থ পাচার, ভূমি দখল, ফ্ল্যাট উপহার, ক্ষমতার অপব্যবহার, প্লট বরাদ্দ বাতিল এবং অতিরিক্ত অর্থ দাবিসহ উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে অভিযুক্তদের বক্তব্য এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

সব মিলিয়ে দুদকের চলমান অনুসন্ধান এবং আফতাবনগরের প্লট মালিকদের অভিযোগ—দুই দিক থেকেই ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেড ও এর শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। এখন দুদকের পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান প্রতিবেদন, তদন্তের ফলাফল এবং প্রয়োজনে আদালতে দাখিল করা চার্জশিটের মাধ্যমে এসব অভিযোগের সত্যতা কতটা প্রতিষ্ঠিত হয়, সেটিই দেখার বিষয়।