ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
সময়: ০৫:০২:৩৫ AM

আরপিসিএলকে ঘিরে নানা অভিযোগ

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
09-09-2026 08:02:46 PM
আরপিসিএলকে ঘিরে  নানা অভিযোগ

বিদ্যুৎ খাতের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (আরপিসিএল) ঘিরে নিয়োগ ও পদোন্নতিতে অনিয়ম, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা, ঠিকাদারকে কথিত সুবিধা দেওয়া, সরকারি অর্থের ক্ষতি, অতিরিক্ত দায়িত্ব এবং ক্রয়প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে বারবার আসছে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এএইচএম রাশেদ, নির্বাহী পরিচালক (ওএন্ডএম) মো. রেজাউল কবীর এবং নির্বাহী পরিচালক (অর্থ ও হিসাব), অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা মো. শাহজাহান ফকিরের নাম।

আরপিসিএলের সরকারি ওয়েবসাইটে বর্তমানে এএইচএম রাশেদকে এমডি, রেজাউল কবীরকে নির্বাহী পরিচালক (ওএন্ডএম) এবং শাহজাহান ফকিরকে নির্বাহী পরিচালক (অর্থ ও হিসাব), অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা হিসেবে দেখানো হয়েছে। একই সঙ্গে শাহজাহান ফকির মহাব্যবস্থাপক (অর্থ ও হিসাব) হিসেবেও তালিকাভুক্ত।

অভিযোগকারীদের দাবি, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে এমডি নিয়োগ পরীক্ষায় দ্বিতীয় হওয়া সত্ত্বেও এএইচএম রাশেদকে অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়। এ প্রক্রিয়ায় রেজাউল কবীর, শাহজাহান ফকির ও বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের তৎকালীন সদস্য (অর্থ) নাজমুস সায়াদাত ভূমিকা রাখেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এমনকি তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ফাওজুল কবীরকে প্রভাবিত করার অভিযোগও করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ করে এমন কোনো প্রকাশ্য সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন বা আদালতের রায় পাওয়া গেছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।

ময়মনসিংহে নির্মাণাধীন ৩৬০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়েও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হারবিন ইঞ্জিনিয়ারিংকে বিভিন্ন সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে রেজাউল কবীর ও শাহজাহান ফকির কথিত আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন। প্রকল্পের ২৪০ এমভিএ, ১৩২ কেভি স্টেপ-আপ ট্রান্সফরমার নষ্ট অবস্থায় সরবরাহের পর বোর্ডের সিদ্ধান্ত ছাড়াই তা মেরামত করে পুনরায় সরবরাহের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত এমডি নাজমুস সায়াদাতের অনুমোদনের কথাও বলা হয়েছে।

একই প্রকল্প প্রায় দুই বছর বিলম্বিত হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, প্রকল্প পরিচালক হিসেবে রেজাউল কবীরের বিরুদ্ধে জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে তাকে দ্রুত পদোন্নতি দেওয়া হলো কেন। তাদের দাবি, তিনি তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী থেকে প্রধান প্রকৌশলী এবং পরবর্তী সময়ে অল্প সময়ের মধ্যেই নির্বাহী পরিচালক (ওএন্ডএম) হন। তবে পদোন্নতির প্রক্রিয়া ও প্রকল্প বিলম্বের মধ্যে কোনো অনিয়ম ছিল কি না, তা নথি যাচাই ছাড়া নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

শাহজাহান ফকিরকে অতিরিক্ত দায়িত্বে রাখার বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, নির্বাহী পরিচালক (অর্থ ও হিসাব) পদে নিয়োগের জন্য বোর্ডের সিদ্ধান্ত থাকলেও নির্ধারিত সময়ে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়নি। তার প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও অভিযোগ করা হয়েছে। বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর শাহজাহান ফকিরের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) আবেদন করা হয়েছিল। সেখানে তার অতিরিক্ত দায়িত্ব, শিক্ষাগত যোগ্যতা, নিয়োগপ্রক্রিয়া বিলম্ব এবং একাধিক প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনের বিষয় উত্থাপন করা হয়। অভিযোগ দাখিল হওয়া অবশ্য অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার সমান নয়।

শাহজাহান ফকিরকে আরপিসিএলের পাশাপাশি আরএনপিএল ও বিপিইএমসিতেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের অভিযোগ রয়েছে। বিপিইএমসির সিএফও হিসেবেও তাকে দীর্ঘদিন অতিরিক্ত দায়িত্বে রাখা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা ব্যয়ে স্মার্ট প্রি-পেইড মিটার ও আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম ডিপিএম পদ্ধতিতে কেনার উদ্যোগে অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে বোর্ডের সিদ্ধান্ত, অনুমোদন, দরপত্র ও ক্রয়সংক্রান্ত নথি পরীক্ষা করা জরুরি।

আরএনপিএলের ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ‘পিটি সাম্পার’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কয়লা কেনার প্রক্রিয়াতেও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, একক দরপত্রের মাধ্যমে বিপুল অর্থের কার্যাদেশ দেওয়া হয় এবং পরে নিম্নমানের কয়লা সরবরাহের কারণে কেন্দ্রটির উৎপাদন ব্যাহত হয়। রাশেদ, শাহজাহান ফকির ও নাজমুস সায়াদাতের বিরুদ্ধে অবৈধ সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এসব দাবির সত্যতা যাচাইয়ে দরপত্র, মূল্যায়ন কমিটির কার্যবিবরণী, চুক্তি, কয়লার মান পরীক্ষার প্রতিবেদন ও সরবরাহের তথ্য পর্যালোচনা প্রয়োজন।

ময়মনসিংহ ২১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের গ্যাস টারবাইন-৪ প্রায় ১৪ মাস বন্ধ থাকার অভিযোগও সামনে এসেছে। বলা হচ্ছে, ২০২৫ সালের মার্চ থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত ইউনিটটি বন্ধ থাকায় আরপিসিএলের প্রায় ১১০ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে। ওই সময় এএইচএম রাশেদ কেন্দ্রটির প্লান্ট ইনচার্জ ছিলেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। তবে ক্ষতির পরিমাণ ও দায় নির্ধারণে উৎপাদন-ঘাটতি, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, বিদ্যুৎ বিক্রয় এবং রাজস্বের হিসাব যাচাই করতে হবে।

এ ছাড়া নির্বাহী প্রকৌশলী ও উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস, অর্থের বিনিময়ে পছন্দের প্রার্থীকে পদোন্নতি এবং সিনিয়রিটি লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। নিয়োগ কমিটিতে নির্বাহী পরিচালক (পিএন্ডডি) কে এম নঈম খানকে বাদ দিয়ে রেজাউল কবীরকে রাখার বিষয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

যানবাহন ব্যবহারের ক্ষেত্রেও অভিযোগ রয়েছে। সরকারি কৃচ্ছ্রসাধনের নির্দেশনার মধ্যে আরপিসিএল চারটি নতুন পাজেরো জিপ কেনে এবং সেগুলো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ক্রয় অনুমোদন, গাড়ি বরাদ্দ, লগবুক ও জ্বালানি ব্যয়ের হিসাব পর্যালোচনা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে অভিযোগগুলো আরপিসিএলের নিয়োগ, পদোন্নতি, প্রকল্প বাস্তবায়ন, ক্রয়, জ্বালানি ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিভিন্ন স্তরকে স্পর্শ করেছে। তবে অভিযোগ ও প্রমাণকে আলাদা রাখা জরুরি। কোনো কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে তদন্ত বা আদালতের সিদ্ধান্ত ছাড়া সত্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।

তাই পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধানে এমডি নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি ও ফলাফল, নিয়োগ কমিটির কার্যবিবরণী, রেজাউল কবীরের পদোন্নতির নথি, শাহজাহান ফকিরের অতিরিক্ত দায়িত্ব ও শিক্ষাগত যোগ্যতার কাগজপত্র, ময়মনসিংহ ৩৬০ মেগাওয়াট প্রকল্পের চুক্তি ও ট্রান্সফরমার-সংক্রান্ত নথি, আরএনপিএলের কয়লা ক্রয়ের দলিল, প্রকৌশলী পদোন্নতি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ও মূল্যায়ন নথি এবং ময়মনসিংহ ২১০ মেগাওয়াট কেন্দ্রের দীর্ঘ outage-সংক্রান্ত আর্থিক হিসাব পরীক্ষা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি অভিযোগে যাদের নাম এসেছে, তাদের বক্তব্য নেওয়াও জরুরি। এসব নথি ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যের ভিত্তিতেই অভিযোগগুলোর প্রকৃত সত্যতা নির্ধারণ করা সম্ভব।