ঢাকা, বুধবার, ৫ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ০২:৪৮:১২ AM

গল্প” মায়া”

মান্নান মারুফ
04-08-2026 05:35:59 PM
গল্প” মায়া”

মানুষ প্রেমে পড়ে বহুবার, কিন্তু মায়ায় পড়ে একবার। প্রেম কখনও শেষ হয়ে যায়, নতুন প্রেম আসে; কিন্তু মায়া এমন এক অদৃশ্য বন্ধন, যা ভেঙে গেলেও হৃদয়ের ভেতর থেকে যায়। প্রেম বদলায়, মানুষ বদলায়, সময় বদলায়—কিন্তু মায়া বদলায় না।

রুদ্র প্রথম প্রেমে পড়েছিল কলেজে। নীলা ছিল তার প্রথম ভালো লাগা। দুজনে একসঙ্গে ক্লাস করত, বৃষ্টিভেজা বিকেলে ক্যাম্পাসে হাঁটত, ক্যান্টিনে এক কাপ চা ভাগাভাগি করে খেত। রুদ্র ভেবেছিল এটাই হয়তো জীবনের শেষ ভালোবাসা।

কিন্তু জীবন তো গল্পের মতো চলে না।

একদিন নীলার বিয়ে হয়ে গেল পরিবারের পছন্দের এক মানুষের সঙ্গে। রুদ্র কাঁদল, ভাঙল, আবার নিজেকে গুছিয়ে নিল। কয়েক বছর পর সে আবার প্রেমে পড়ল। অফিসের সহকর্মী মেঘলার সঙ্গে। মেঘলা ছিল প্রাণবন্ত, হাসিখুশি। সে রুদ্রের জীবনে নতুন আলো এনে দিয়েছিল।

কিন্তু সেই সম্পর্কও টিকল না। বিদেশে চাকরি নিয়ে চলে গেল মেঘলা। দূরত্ব ধীরে ধীরে সম্পর্কটাকে নিঃশব্দে শেষ করে দিল।

রুদ্র তখন বুঝল, প্রেম আসলে বারবার আসে। মানুষের হৃদয় ভাঙে, আবার জোড়া লাগে। নতুন মানুষ আসে, পুরোনো স্মৃতি একটু একটু করে ফিকে হয়।

ঠিক তখনই তার জীবনে এল মায়া।

মায়া নামটা যেন তার চরিত্রের মতোই ছিল। সাধারণ একটি মেয়ে। বড় বড় স্বপ্ন ছিল না, দামি উপহার চাইত না। শুধু রুদ্রের পাশে বসে গল্প করতে ভালোবাসত। রুদ্র অসুস্থ হলে রাত জেগে ফোনে খোঁজ নিত। রুদ্র অফিস থেকে ফিরতে দেরি করলে না খেয়ে অপেক্ষা করত। রুদ্রের প্রিয় গানগুলো মুখস্থ ছিল তার।

একদিন রুদ্র মজা করে জিজ্ঞেস করেছিল,
—"তুমি আমাকে এত ভালোবাসো কেন?"

মায়া হেসে বলেছিল,
—"ভালোবাসি কি না জানি না। তবে তোমার জন্য অপেক্ষা করতে ভালো লাগে।"

সেদিন কথাটার গভীরতা বুঝতে পারেনি রুদ্র।

তাদের বিয়ে হয়নি। কারণ, রুদ্র তখন নিজের ক্যারিয়ার গড়তে ব্যস্ত। সে ভাবত, সময় তো আছেই। আজ না হয় কাল।

কিন্তু সময় কখনও কারও জন্য অপেক্ষা করে না।

এক বর্ষার রাতে মায়া মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়। হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই সে চলে যায়।

রুদ্র খবরটা শুনে বিশ্বাস করতে পারেনি।

হাসপাতালের সাদা বিছানায় নিথর হয়ে শুয়ে থাকা মায়াকে দেখে সে শুধু বলেছিল,
—"আরেকটু অপেক্ষা করতে পারতে না?"

কোনো উত্তর আসেনি।

মায়ার মৃত্যুর পর রুদ্র বুঝতে পারল, সে শুধু একজন মানুষকে হারায়নি; সে তার জীবনের সবচেয়ে বড় অভ্যাসটাকে হারিয়েছে।

এরপর বহু বছর কেটে গেল।

বন্ধুরা বলল, "আবার বিয়ে কর।"

পরিবার বলল, "জীবন থেমে থাকে না।"

রুদ্র আবার সম্পর্কেও জড়িয়েছিল। দু-একজন ভালো মানুষের সঙ্গেও পরিচয় হয়েছিল। তাদের কেউ খারাপ ছিল না। বরং সবাই তাকে ভালোবাসতে চেয়েছিল।

কিন্তু যখনই কেউ জিজ্ঞেস করত,
—"খেয়েছো?"

রুদ্রের মনে পড়ে যেত মায়ার সেই রাত জেগে অপেক্ষা করার কথা।

কেউ যখন বলত,
—"আজ খুব ক্লান্ত লাগছে তোমাকে।"

তার মনে পড়ে যেত মায়ার হাতের এক কাপ লেবু চা।

কেউ যখন জন্মদিনে উপহার দিত, সে মনে মনে খুঁজে বেড়াত সেই হাতে লেখা ছোট্ট চিঠিগুলো, যেখানে মায়া লিখত,
"তুমি ভালো থাকলেই আমার সব উৎসব পূর্ণ হয়ে যায়।"

প্রেমগুলো নতুন ছিল।

কিন্তু মায়াটা ছিল পুরোনো।

আর সেই পুরোনো মায়াকে কেউ ছুঁতে পারল না।

একদিন আলমারি গুছাতে গিয়ে রুদ্র একটি ছোট্ট বাক্স পেল। সেখানে মায়ার রেখে যাওয়া কিছু জিনিস ছিল—একটি শুকিয়ে যাওয়া কৃষ্ণচূড়ার ফুল, পুরোনো সিনেমার টিকিট, আর একটি ভাঁজ করা কাগজ।

চিঠিতে লেখা—

"যদি কোনোদিন আমি হারিয়ে যাই, তাহলে নতুন করে ভালোবাসতে ভয় পেও না। কারণ ভালোবাসা মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। কিন্তু একটা কথা মনে রেখো, ভালোবাসার থেকেও বড় হলো যত্ন। মানুষ ভালোবাসা ভুলে যায়, কিন্তু যত্ন কোনোদিন ভুলে না।"

চিঠিটা পড়ে রুদ্র অনেকক্ষণ কাঁদল।

সেদিন সে প্রথম বুঝল, সে আসলে প্রেমকে নয়, মায়াকে খুঁজে বেড়াচ্ছিল।

ভালোবাসা ছিল অনেকের সঙ্গে।

কিন্তু যত্ন ছিল একজনের।

বছর দশেক পর এক শরতের বিকেলে রুদ্র মায়ার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। আকাশে সাদা মেঘ ভাসছে। কাশফুল দুলছে বাতাসে।

সে ধীরে ধীরে বলল,

"জানো মায়া, আমি সত্যিই বহুবার প্রেমে পড়েছি। জীবনের প্রয়োজনেই পড়েছি। মানুষ একা থাকতে পারে না। কিন্তু তোমার পরে আর কখনও কারও মায়ায় পড়তে পারিনি। কারণ মায়া তো কাউকে খুঁজে পাওয়া নয়, মায়া হলো কাউকে হারিয়েও তার জন্য বেঁচে থাকা।"

এক ফোঁটা বৃষ্টি এসে পড়ল তার হাতের ওপর।

রুদ্র আকাশের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
"প্রেম বদলায়, মানুষ বদলায়, সম্পর্ক বদলায়। কিন্তু তুমি ঠিকই বলেছিলে—যত্নের কোনো মৃত্যু নেই।"

ফিরে আসার সময় সে কবরের পাশে একটি সাদা শিউলি ফুল রেখে গেল।

হাঁটতে হাঁটতে তার মনে হলো, পৃথিবীতে কিছু মানুষ ভালোবাসা হয়ে আসে, আর কিছু মানুষ মায়া হয়ে।

ভালোবাসা মানুষকে হাসতে শেখায়।

মায়া মানুষকে সারাজীবন মনে রাখতে শেখায়।

কারণ সত্যিই—মানুষ প্রেমে পড়ে বহুবার, কিন্তু মায়ায় পড়ে মাত্র একবার। আর সেই মায়া যদি একবার হৃদয়ে বাসা বাঁধে, তবে সময়, দূরত্ব কিংবা মৃত্যু—কোনোটাই তাকে মুছে দিতে পারে না। প্রেমের রং বদলায়, কিন্তু মায়ার রং কখনও ফিকে হয় না। সমাপ্ত।।