ঢাকা, শনিবার, ২১ মার্চ ২০২৬,
সময়: ০৬:০৪:০৫ PM

উপন্যাস: মালি

মান্নান মারুফ
20-03-2026 10:58:48 AM
উপন্যাস: মালি

পর্ব–৪

কুদ্দুছ আর নাদিয়া এখন দূরের কেউ নয়—তারা যেন একে অপরের শ্বাস-প্রশ্বাস। একে অপর ছাড়া তাদের পৃথিবী অচল। সম্পর্কটা এতটাই গভীরে গিয়েছে যে, ভালো-মন্দ, ঠিক-ভুল—সব সীমারেখা যেন মুছে গেছে। তারা জানে, এই পথ বিপজ্জনক, তবুও তারা থামতে পারে না। কারণ ভালোবাসা কখনো কখনো মানুষকে বাঁচায় না—বরং ধীরে ধীরে পুড়িয়ে শেষ করে দেয়।

সেই রাতটা ছিল অদ্ভুত নীরব। আকাশে চাঁদ ছিল না, শুধু কালো মেঘের ছায়া। শহরের আলোও যেন সেদিন ম্লান হয়ে গিয়েছিল। কুদ্দুছ আর নাদিয়া হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে ছিল—এক অজানা ভবিষ্যতের সামনে।

“ভয় পাচ্ছো?” কুদ্দুছ ধীরে জিজ্ঞেস করল।

নাদিয়া একটু থেমে বলল, “ভয় তো লাগছেই… কিন্তু তোমাকে হারানোর ভয় তার চেয়েও বেশি।”

এই এক বাক্যেই যেন সবকিছু স্পষ্ট হয়ে গেল। তারা জানে না সামনে কী আছে, কিন্তু জানে—একসাথে থাকাটাই তাদের একমাত্র সত্য।

নাদিয়া সঙ্গে করে এনেছে কিছু গয়না—তার জীবনের স্মৃতি, অতীতের চিহ্ন। কিন্তু সবচেয়ে বড় জিনিসটা সে নিয়ে এসেছে—তার স্বাধীনতা। যে স্বাধীনতার জন্য সে এতদিন বন্দি ছিল সোনার খাঁচায়, আজ সে মুক্তির স্বাদ নিতে চায়।

তারা খুব গোপনে বিমানবন্দর পার হয়ে যায়। কেউ টের পায় না, কেউ জানে না—দুটি মানুষ নিজেদের ভাগ্য বদলাতে চলেছে। বিমানে ওঠার আগে একবার নাদিয়া পেছনে তাকায়। তার চোখে পানি জমে ওঠে।

“কী দেখছো?” কুদ্দুছ জিজ্ঞেস করে।

“আমার অতীত… যেটা আর কোনোদিন ফিরে পাবো না।”

কুদ্দুছ কিছু বলে না। সে শুধু নাদিয়ার হাতটা শক্ত করে ধরে রাখে।

বিমান আকাশে উড়তে শুরু করে। নিচে শহরের আলো ছোট হয়ে যায়। যেন তাদের পুরোনো জীবনটাও দূরে সরে যাচ্ছে।


নতুন দেশে পৌঁছে তারা বুঝতে পারে—স্বপ্ন আর বাস্তবতার মধ্যে কত পার্থক্য। শুরুটা এত সহজ ছিল না।

একটি ছোট, অন্ধকার ঘরে তারা আশ্রয় নেয়। ঘরটিতে না ছিল ঠিকমতো আলো, না ছিল কোনো স্বাচ্ছন্দ্য। কিন্তু তবুও তাদের চোখে এক ধরনের আশার আলো ছিল।

“আমরা পারবো, তাই না?” নাদিয়া কাঁপা গলায় বলে।

কুদ্দুছ হাসে, কিন্তু সেই হাসিতে আত্মবিশ্বাসের চেয়ে দুঃখটাই বেশি ছিল।
“পারতেই হবে… কারণ আমাদের আর ফিরে যাওয়ার পথ নেই।”

দিন যেতে থাকে। কাজ খুঁজতে খুঁজতে কুদ্দুছ ক্লান্ত হয়ে পড়ে। একসময় যে মানুষ স্বপ্ন দেখত, এখন সে শুধু বেঁচে থাকার লড়াই করে। অন্যদিকে নাদিয়া—সে তার গয়না একে একে বিক্রি করতে শুরু করে।

প্রথম গয়নাটা বিক্রি করার সময় তার হাত কেঁপে উঠেছিল। যেন নিজের এক টুকরো জীবন সে বিক্রি করে দিচ্ছে।

“এইগুলো ছাড়া কি চলবে?” কুদ্দুছ একদিন জিজ্ঞেস করেছিল।

নাদিয়া শান্তভাবে বলেছিল,
“এগুলো দিয়ে কি আমরা বাঁচতে পারবো? না… কিন্তু এগুলো ছাড়া হয়তো আমরা বাঁচার চেষ্টা করতে পারবো।”

তার চোখে জল ছিল, কিন্তু মুখে ছিল এক ধরনের দৃঢ়তা।


তাদের ভালোবাসা তখনও ছিল—কিন্তু সেই ভালোবাসার রং বদলাতে শুরু করেছিল। আগের মতো উজ্জ্বল নয়, বরং ধূসর হয়ে যাচ্ছে।

একদিন রাতে, অনেকক্ষণ না খেয়ে থাকার পর, কুদ্দুছ হঠাৎ চিৎকার করে উঠল—
“আমি পারছি না নাদিয়া! আমি আর পারছি না!”

নাদিয়া চমকে ওঠে।
“তুমি এভাবে বলছো কেন?”

“কারণ আমি ব্যর্থ! আমি তোমাকে কিছুই দিতে পারিনি। শুধু কষ্ট… শুধু অনিশ্চয়তা!”

নাদিয়া চুপ করে থাকে। কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে তার কাছে গিয়ে বসে।

“তুমি আমাকে একটা জিনিস দিয়েছো,” সে বলে।

“কি?”

“ভালোবাসা… আর সেই সাহস, যেটা দিয়ে আমি সব ছেড়ে তোমার সাথে এসেছি।”

কুদ্দুছ চোখ নামিয়ে নেয়।
“কিন্তু এই ভালোবাসা কি আমাদের বাঁচাতে পারবে?”

নাদিয়া উত্তর দেয় না। কারণ সে জানে—সব ভালোবাসার শেষ সুখে হয় না।


দিনগুলো আরও কঠিন হয়ে ওঠে। কাজের অভাব, টাকার সংকট, আর চারপাশের অপরিচিত পরিবেশ—সব মিলিয়ে তাদের জীবন যেন এক দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়।

একদিন কুদ্দুছ অনেক রাত করে বাড়ি ফেরে। তার চোখ লাল, মুখ ক্লান্ত।

“কোথায় ছিলে?” নাদিয়া জিজ্ঞেস করে।

“কাজ খুঁজছিলাম…”

কিন্তু তার গলায় কিছু একটা লুকানো ছিল। নাদিয়া বুঝতে পারে—সবকিছু ঠিক নেই।

“তুমি আমাকে কিছু লুকাচ্ছো?” সে সরাসরি জিজ্ঞেস করে।

কুদ্দুছ কিছুক্ষণ চুপ থাকে, তারপর বলে—
“আমাকে একটা কাজের অফার দিয়েছে… কিন্তু সেটা ঠিক ভালো কাজ না।”

নাদিয়ার বুক কেঁপে ওঠে।
“মানে?”

“ঝুঁকিপূর্ণ… হয়তো অবৈধও হতে পারে।”

নাদিয়া ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়।
“না কুদ্দুছ, তুমি এটা করতে পারো না। আমরা ভুল পথে আসিনি, আবার ভুল পথে যাবো না।”

কুদ্দুছ বিরক্ত হয়ে বলে,
“তাহলে কী করবো? না খেয়ে মরবো?”

এই কথাটা যেন ছুরির মতো বিঁধে যায় নাদিয়ার মনে।


সেই রাতে তারা কেউ ঘুমাতে পারেনি। বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল, আর ঘরের ভেতর নীরবতা। মাঝে মাঝে বিদ্যুতের আলো ঘরটাকে আলোকিত করে আবার অন্ধকারে ডুবিয়ে দিচ্ছিল—ঠিক তাদের জীবনের মতো।

নাদিয়া জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। তার মনে হচ্ছিল, এই শহরটা তাকে গ্রাস করে নিচ্ছে।

“আমরা কি ভুল করেছি?” সে হঠাৎ বলে ওঠে।

কুদ্দুছ উত্তর দেয় না। কারণ সে নিজেও সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাচ্ছে না।


কয়েকদিন পর কুদ্দুছ সিদ্ধান্ত নেয়—সে সেই কাজটা করবে। নাদিয়া তাকে থামানোর চেষ্টা করে, কিন্তু পারে না।

“আমি এটা আমাদের জন্যই করছি,” কুদ্দুছ বলে।

নাদিয়ার চোখ ভিজে যায়।
“কিন্তু যদি তোমাকে হারিয়ে ফেলি?”

কুদ্দুছ তার মুখ ছুঁয়ে বলে,
“তাহলে মনে রেখো—আমি তোমাকে ভালোবেসেছিলাম।”

এই কথাটার মধ্যে এমন এক অদ্ভুত বিদায় লুকিয়ে ছিল, যা নাদিয়ার হৃদয়কে কাঁপিয়ে দেয়।


সেদিন রাতে কুদ্দুছ বেরিয়ে যায়। নাদিয়া দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে—যতক্ষণ না তার ছায়াটাও অদৃশ্য হয়ে যায়।

তারপর ধীরে ধীরে দরজা বন্ধ করে দেয়।

ঘরটা আবার নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে।

নাদিয়া মেঝেতে বসে পড়ে। তার চোখ থেকে অঝোরে পানি ঝরতে থাকে।

সে বুঝতে পারে—ভালোবাসা তাকে এখানে এনে দাঁড় করিয়েছে, কিন্তু এই ভালোবাসাই হয়তো তাকে একদিন একা করে দেবে।


রাত বাড়তে থাকে।

বাইরে বৃষ্টি থামে না।

আর নাদিয়ার অপেক্ষাও শেষ হয় না…

চলবে…