ঢাকা, শনিবার, ২০ জুন ২০২৬,
সময়: ১২:৫০:১৭ AM

কেরানীগঞ্জে আতঙ্কিত মানুষ,ভয়ে মুখ খুলছে না কেউ

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
19-06-2026 09:22:42 PM
কেরানীগঞ্জে আতঙ্কিত মানুষ,ভয়ে মুখ খুলছে না কেউ

রাজধানী ঢাকার পার্শ্ববর্তী এলাকা কেরানীগঞ্জে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, ব্যবসা-বাণিজ্যে হস্তক্ষেপ এবং পশুর হাট ইজারা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে স্থানীয় জনমনে ব্যাপক উদ্বেগ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তবে অভিযোগগুলো নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পাচ্ছেন না অধিকাংশ বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাদের আশঙ্কা, মুখ খুললে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, ব্যবসা এবং সামাজিক অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, কেরানীগঞ্জের উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিম—প্রায় পুরো এলাকাজুড়েই বিএনপির কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার আধিপত্য রয়েছে। তাদের মধ্যে একজন নারী নেত্রী এবং অপরদিকে একজন প্রভাবশালী নেতা ও তাঁর সন্তানকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ শোনা যাচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিতে রাজি নন অধিকাংশ স্থানীয় বাসিন্দা।

এলাকার অনেকের ভাষ্য, মাঠ-ঘাটের নিয়ন্ত্রণ, জমি-সংক্রান্ত বিরোধ, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, হাউজিং কোম্পানি এবং বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে প্রভাব খাটানোর অভিযোগ দীর্ঘদিনের। একাধিক ব্যবসায়ী দাবি করেন, নানা অজুহাতে তাদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা হয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন বা আদালতের কোনো রায় এখনো সামনে আসেনি।

সম্প্রতি কোরবানির পশুর হাটকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কেরানীগঞ্জের বিভিন্ন পশুর হাট ইজারা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে হাসনাবাদ পশুর হাট, আগানগর বালুর মাঠ পশুর হাট, জিঞ্জিরা পশুর হাট এবং ঘাটারচর মিলেনিয়াম পশুর হাটের ইজারা কম মূল্যে প্রদান করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, এসব হাটের প্রকৃত বাজারমূল্যের তুলনায় অনেক কম মূল্যে ইজারা দেওয়া হয়েছে, যার ফলে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এছাড়া স্থানীয়ভাবে আলোচিত একটি অভিযোগ হলো, হাটের সিডিউল ক্রয় করতে গিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি হামলার শিকার হয়েছেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, ওই ঘটনায় কয়েকজন আহত হন এবং এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। অভিযোগ রয়েছে, ঘটনার দিন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রহস্যজনকভাবে উপজেলা কার্যালয়ে উপস্থিত ছিলেন না। তবে এ বিষয়ে প্রশাসনের কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, প্রভাবশালী রাজনৈতিক গোষ্ঠীর প্রভাবের কারণে উপজেলা প্রশাসন কার্যত চাপে রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে প্রশাসনের ভেতরেও অনিয়ম ও দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হচ্ছে। যদিও এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যবসায়ী জানান, এলাকায় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তারা বলেন, অভিযোগ নিয়ে মুখ খুললে ব্যবসায়িক ক্ষতি, হয়রানি কিংবা নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে হতে পারে।

একজন হাউজিং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধায়ক বলেন, “আমরা অনেক কিছু দেখছি এবং শুনছি। কিন্তু প্রকাশ্যে কিছু বলার সাহস পাচ্ছি না। সবাই ভয়ের মধ্যে আছে। আমরা চাই বিষয়গুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হোক এবং সত্য উদঘাটিত হোক।”

কেরানীগঞ্জে দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির শক্তিশালী জনসমর্থন রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান। ফলে এলাকায় অন্য কোনো রাজনৈতিক শক্তির কার্যকর উপস্থিতি তুলনামূলক কম। এই বাস্তবতায় স্থানীয় পর্যায়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের প্রভাবও অনেক বেশি। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কোনো এলাকায় একটি দলের শক্তিশালী অবস্থান থাকলেই সেখানে অনিয়ম হচ্ছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধান এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য।

এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি প্রত্যাশা কাজ করছে যে, দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব স্থানীয় পর্যায়ের এসব অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে। অনেকেই মনে করেন, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিভিন্ন সময়ে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কথা বলেছেন। ফলে কেরানীগঞ্জে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়েও তিনি নজর দেবেন বলে আশা করছেন স্থানীয়রা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন হাউজিং কোম্পানির মালিক ও ব্যবসায়ী বলেন, “আমরা কোনো রাজনৈতিক বিরোধ চাই না। আমরা শুধু চাই সুষ্ঠু ব্যবসায়িক পরিবেশ। যদি কোনো অনিয়ম হয়ে থাকে, তাহলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।”

স্থানীয়দের মধ্যে এমনও মত রয়েছে যে, অতীতে এলাকায় যাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ ছিল, বর্তমানে নতুন কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তিকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ সেই পুরনো বিতর্ককেও ছাড়িয়ে গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা নেতাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করেন, গণতান্ত্রিক সমাজে যেকোনো অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া অত্যন্ত জরুরি। অভিযোগ সত্য হলে আইনের আওতায় ব্যবস্থা নিতে হবে, আর অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে সেটিও জনগণের সামনে স্পষ্ট করতে হবে। এতে জনমনে আস্থা ফিরবে এবং রাজনৈতিক পরিবেশ আরও স্থিতিশীল হবে।

তাদের মতে, স্থানীয় সরকার প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এ ধরনের বিতর্কের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে তারা ভয়ভীতি ছাড়াই নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরতে পারেন।

কেরানীগঞ্জের সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নাগরিকদের প্রত্যাশা—উত্থাপিত অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হবে এবং প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হবে। তারা এমন একটি পরিবেশ চান, যেখানে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কেউ বাড়তি সুবিধা পাবে না এবং সাধারণ মানুষও ভয়-ভীতি ছাড়াই নিজের অধিকার নিয়ে কথা বলতে পারবেন।

তবে প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নেতা-নেত্রী, উপজেলা প্রশাসন এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী সময়ে প্রকাশ করা হবে।