ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ০৯:২৩:৪১ AM

এক গ্রাম থেকেই ১১২ জনের নিয়োগ:গোপন চুক্তি

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
20-06-2026 09:50:51 PM
এক গ্রাম থেকেই ১১২ জনের নিয়োগ:গোপন চুক্তি

কোনো ধরনের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ছাড়াই আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরে ১৮৫ জনকে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে ১১২ জনই কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলার আকবপুর গ্রামের বাসিন্দা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র এক মাস আগে গোপনে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। নিয়োগের ক্ষেত্রে লিখিত বা মৌখিক পরীক্ষা কিংবা কোনো প্রতিযোগিতামূলক যাচাই-বাছাইয়ের ব্যবস্থাও করা হয়নি।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে ছয়টি ক্যাটাগরিতে এসব জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়। এর মধ্যে পরিচ্ছন্নতাকর্মী ১০৪ জন, ডেসপ্যাচ রাইডার (মেসেঞ্জার) ৫৯ জন, লিফটম্যান ১০ জন, গার্ডেনার (মালি) ৬ জন, পাম্প অপারেটর ৪ জন এবং ইলেকট্রিশিয়ান ২ জন।

নির্ধারিত মাসিক বেতনের মধ্যে ইলেকট্রিশিয়ানদের জন্য ২০ হাজার ২১২ টাকা, পাম্প অপারেটরদের জন্য ১৯ হাজার ৬৩৬ টাকা, গার্ডেনারদের জন্য ১৮ হাজার ৬৬০ টাকা এবং ডেসপ্যাচ রাইডার, লিফটম্যান ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের জন্য ১৮ হাজার ১৮৯ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

যমুনা স্টার সেভ গার্ড সার্ভিসেসের সঙ্গে গোপন চুক্তির অভিযোগ

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ‘যমুনা স্টার সেভ গার্ড সার্ভিসেস লিমিটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিপুল অর্থের বিনিময়ে গোপন চুক্তির মাধ্যমে এসব নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ঘুষ লেনদেন-সংক্রান্ত কয়েকটি ব্যাংক হিসাবের তথ্যও অনুসন্ধানকারী গণমাধ্যমের হাতে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, পরীক্ষা বা প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া ছাড়াই পুরো নিয়োগ কার্যক্রম সমন্বয় করেন পাসপোর্ট অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক সালাউদ্দিন ও উপপরিচালক তারিক সালমান। তদারকির দায়িত্বে ছিলেন পরিচালক শিহাব উদ্দিন, যিনি নিয়োগ প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এক গ্রাম থেকে ১১২ জনের নিয়োগ

নিয়োগপ্রাপ্ত ১৮৫ জনের মধ্যে ১১২ জনের স্থায়ী ঠিকানা কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলার আকবপুর গ্রাম। জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য যাচাই করে এ তথ্য পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই ১১২ জনের মধ্যে অন্তত ৮৮ জন পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পাসপোর্ট অধিদপ্তরে সুইপার, এমএলএসএস, নৈশপ্রহরী ও ডেসপ্যাচ রাইডার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পূর্ববর্তী চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার ছয় মাস পর নতুন নিয়োগেও তাদের বড় একটি অংশ পুনরায় সুযোগ পেয়েছেন।

আগেও একই গ্রাম থেকে নিয়োগ পেয়েছিলেন ১৫০ জন

আওয়ামী লীগ সরকারের পুরো মেয়াদে পাসপোর্ট অধিদপ্তরে জনবল সরবরাহ করেছিল ‘কান্ট্রি সিকিউরিটি সার্ভিসেস লিমিটেড’। ওই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া প্রায় ২৫০ জনের মধ্যে ১৫০ জনই ছিলেন আকবপুর গ্রামের বাসিন্দা। তাদের মধ্য থেকেই নতুন করে ১১২ জন পুনরায় নিয়োগ পেয়েছেন।

অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন অতিরিক্ত মহাপরিচালক (এডিজি) রফিকুল ইসলামের সুপারিশে ওই সময় এসব নিয়োগ হয়েছিল। তার সুপারিশে নিয়োগ পাওয়া অনেকেই নতুন নিয়োগেও বিভিন্ন পদে সুযোগ পেয়েছেন।

নিয়োগের নেপথ্যে স্থানীয় প্রভাবশালীদের ভূমিকার অভিযোগ

আকবপুর গ্রাম থেকে বিপুলসংখ্যক নিয়োগের পেছনে তাড়াইল উপজেলার তালজাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবুজাহেদ ভূঞার ভূমিকার অভিযোগ উঠেছে। তার ছোট ভাই রফিকুল ইসলাম পাসপোর্ট অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ছিলেন।

অধিদপ্তরের একটি সূত্রের দাবি, আওয়ামী লীগ আমলে আকবপুর থেকে নিয়োগ পাওয়া অনেকেই বর্তমানে আর্থিকভাবে সচ্ছল হয়েছেন। একই সঙ্গে নিজ এলাকার বিপুলসংখ্যক মানুষকে চাকরি দেওয়ার কারণে আবুজাহেদ ভূঞা বারবার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

চুক্তির মেয়াদ শেষ হলেও কর্মরত ছিলেন জনবল

পাসপোর্ট অধিদপ্তরের সঙ্গে কান্ট্রি সিকিউরিটি সার্ভিসেস লিমিটেডের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয় গত বছরের ১৪ মে। পরে সাময়িকভাবে দেড় মাস মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়, যা ৩০ জুন পর্যন্ত কার্যকর ছিল।

পরবর্তীতে ১ জুলাই ২০২৫ তারিখে অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠানটিকে লিখিতভাবে জানায় যে, তাদের আর জনবল সরবরাহ করতে হবে না এবং সেদিন থেকে কোনো বেতনও প্রদান করা হবে না।

তবে অভিযোগ রয়েছে, চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও ডেসপ্যাচ রাইডার, অফিস সহায়ক, নৈশপ্রহরী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীসহ বিপুলসংখ্যক কর্মীকে একই কর্মস্থলে বহাল রাখা হয়।

অবৈধ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ

সূত্রগুলোর দাবি, চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সরকারি অর্থে বেতন দেওয়ার সুযোগ না থাকায় সংশ্লিষ্ট কর্মীদের দালালচক্রের ফাইল সুপারিশের অনানুষ্ঠানিক সুযোগ দেওয়া হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রায় ছয় মাস ধরে প্রতিদিন নির্দিষ্টসংখ্যক ফাইল অনুমোদনের মাধ্যমে তারা আর্থিক সুবিধা লাভ করেন।

রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সুপারিশে নিয়োগ

প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে কান্ট্রি সিকিউরিটি সার্ভিসেস লিমিটেডের মাধ্যমে হওয়া নিয়োগে বিভিন্ন মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পাসপোর্ট অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তা এবং অন্যান্য প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সুপারিশ ছিল।

সুপারিশকারীদের তালিকায় তৎকালীন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা, অতিরিক্ত মহাপরিচালক, পরিচালক, উপপরিচালক ও সহকারী পরিচালকদের নামও রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

পাসপোর্ট অধিদপ্তরের বক্তব্য

অভিযোগের বিষয়ে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের কাছে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটি লিখিতভাবে জানায়, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগে সরকারের নির্ধারিত বিধিমালা অনুসরণ করা হয়েছে। অধিদপ্তরের চাহিদার ভিত্তিতে সরকার অনুমোদিত ও নিবন্ধিত আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠান ১৮৫ জন জনবল সরবরাহ করেছে।

অধিদপ্তর আরও জানায়, কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলার আকবপুর গ্রামের ১১২ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে—এমন তথ্য সঠিক নয়। এছাড়া সাবেক এডিজি রফিকুল ইসলাম বা বর্তমান কর্মকর্তাদের কোনো সুপারিশে জনবল নিয়োগের তথ্য তাদের কাছে নেই বলেও দাবি করা হয়েছে।

আবুজাহেদ ভূঞার বক্তব্য

তালজাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবুজাহেদ ভূঞা জানিয়েছেন, সাবেক এডিজি রফিকুল ইসলাম তার ছোট ভাই ছিলেন। তিনি দায়িত্বে থাকাকালে গ্রামের যোগ্য ব্যক্তিরা চাকরির জন্য তার কাছে গেলে সুযোগ পেতেন। তবে চাকরির বিনিময়ে কোনো অর্থ লেনদেন হয়নি বলে তিনি দাবি করেন।