জুলাই আন্দোলনে ছাত্র-জনতার ওপর বলপ্রয়োগ ও গুলির নির্দেশদাতা হিসেবে অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তারা বর্তমানে কোথায় কর্মরত—এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দুই বছর পেরিয়ে গেলেও আন্দোলন দমনে দায়িত্ব পালনকারী অনেক পুলিশ কর্মকর্তা এখনো বিভিন্ন ইউনিটে দায়িত্ব পালন করছেন। আবার অনেকের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা, সাময়িক বরখাস্ত, অবসর কিংবা বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, জুলাই আন্দোলনের সময় মেট্রোপলিটন পুলিশ, বিভিন্ন রেঞ্জ ও জেলা পর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী ডিআইজি, অতিরিক্ত ডিআইজি ও এসপি পদমর্যাদার মোট ১১৬ জন কর্মকর্তা আন্দোলন দমনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দায়িত্বে ছিলেন। এর মধ্যে ৪১ জন এখনো বিভিন্ন দপ্তরে স্বাভাবিক দায়িত্ব পালন করছেন। অনেককে পুলিশ সদর দপ্তর, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন), রেলওয়ে পুলিশ, পুলিশ একাডেমি সারদা, পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারসহ বিভিন্ন ইউনিটে সংযুক্ত বা পদায়ন করা হয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জুলাই আন্দোলনে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের ৩৫ শতাংশের বেশি এখনো চাকরিতে সক্রিয় রয়েছেন। বিষয়টিকে উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাদের অভিযোগ, এসব কর্মকর্তার একটি অংশ এখনো প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বাইরে পাচার করছেন এবং বাহিনীর অভ্যন্তরে বিভক্তি সৃষ্টি করছেন।
এদিকে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে মাত্র ১৭ জন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে, যা মোট সংখ্যার প্রায় ১৪ শতাংশ। অন্যদিকে ৫৭ জন কর্মকর্তাকে বিভিন্ন দপ্তরে সংযুক্ত রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, পর্যায়ক্রমে কারও বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা, কারও বিরুদ্ধে বরখাস্ত এবং কারও ক্ষেত্রে অবসরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। বিদেশে অবস্থানরত পলাতক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলনের সময় দেশের ৬৪ জেলায় দায়িত্ব পালনকারী ৭৭ জন এসপির মধ্যে ৩৫ জন এখনো বিভিন্ন ইউনিটে কর্মরত। অর্থাৎ সে সময় দায়িত্ব পালনকারী প্রায় ৪৫ শতাংশ এসপি এখনো নিয়মিত দায়িত্বে রয়েছেন। অপরদিকে ৪২ জন এসপি বরখাস্ত, সংযুক্তকরণ বা অন্যান্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থার আওতায় এসেছেন। এই তালিকায় পলাতক কর্মকর্তারাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।
গত দুই বছরে দেশের আটটি মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার এবং আটটি রেঞ্জের ডিআইজিদের বিরুদ্ধেও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে আটজন কমিশনার ও ছয়জন ডিআইজিকে অবসরে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া তিনজন ডিআইজি ও একজন কমিশনারকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
আন্দোলনের সময় দায়িত্ব পালনকারী ২১ জন অতিরিক্ত ডিআইজির মধ্যে ছয়জন এখনো গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত রয়েছেন। বাকিদের বিভিন্ন কার্যালয়ে সংযুক্ত রাখা হয়েছে। কয়েকজন কর্মকর্তা এখনো আত্মগোপনে রয়েছেন বলেও জানা গেছে। তাদের বিরুদ্ধেও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের একটি সূত্র জানায়, আন্দোলনের সময় যেসব জেলার এসপিদের বিরুদ্ধে সরাসরি গুলির নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে, তাদের অনেকের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হয়েছে। কেউ বরখাস্ত হয়েছেন, কেউ কারাগারে আছেন, আবার কেউ বিচারাধীন মামলার আসামি হিসেবে পলাতক রয়েছেন। তবে অনেক কর্মকর্তাই বর্তমানে পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার, এপিবিএন, হাইওয়ে পুলিশ, ট্যুরিস্ট পুলিশ, রেলওয়ে পুলিশ, সিআইডি, পুলিশ টেলিকমসহ বিভিন্ন ইউনিটে দায়িত্ব পালন করছেন। অভিযোগ রয়েছে, কয়েকজন কর্মকর্তা প্রভাব খাটিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদও পেয়েছেন।
বর্তমানে বিভিন্ন দপ্তরে কর্মরত কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন টাঙ্গাইলের সাবেক এসপি সরকার মোহাম্মদ কায়সার, যিনি পদোন্নতি পেয়ে অতিরিক্ত ডিআইজি হওয়ার পর বর্তমানে রাঙামাটির বেতবুনিয়া পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারে কর্মরত। এছাড়া ফরিদপুরের সাবেক এসপি মোহাম্মদ মোর্শেদ আলম, রাজবাড়ীর জিএম আবুল কালাম আজাদ, শরীয়তপুরের মাহবুবুল আলম, মাদারীপুরের মোহাম্মদ শফিউর রহমান, নেত্রকোনার ফয়েজ আহমেদ, শেরপুরের মোনালিসা বেগম ও আকরামুল হোসেন, কক্সবাজারের মাহফুজুল ইসলাম, বান্দরবানের সৈকত শাহীন, খাগড়াছড়ির মুক্তা ধর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মোহাম্মদ শাখাওয়াত হোসেনসহ আরও অনেকে বিভিন্ন ইউনিটে দায়িত্ব পালন করছেন।
এছাড়া চাঁদপুর, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ, সাতক্ষীরা, চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া, নড়াইল, মেহেরপুর, পিরোজপুর, ভোলা, ঝালকাঠি, বরগুনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনা, নওগাঁ, জয়পুরহাট, রংপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, নীলফামারী, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামের সাবেক এসপিদেরও বিভিন্ন পুলিশ ইউনিটে দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে।
রেঞ্জ পর্যায়ের অতিরিক্ত ডিআইজিদের মধ্যেও কয়েকজন এখনো গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন। তাদের মধ্যে মাহফুজুর রহমান বর্তমানে টাঙ্গাইল পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারে, প্রবীর কুমার রায় নৌ পুলিশে, মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম পুলিশ সদর দপ্তরে, মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার হিসেবে এবং লিটন কুমার সাহা খুলনা পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারে দায়িত্ব পালন করছেন।
অন্যদিকে, সাময়িক বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকা জেলার সাবেক এসপি মো. আসাদুজ্জামান, নারায়ণগঞ্জের গোলাম মোস্তফা রাসেল, লক্ষ্মীপুরের মোহাম্মদ তারেক বিন রশিদ, যশোরের প্রলয় কুমার জোয়ারদার, সিরাজগঞ্জের আরিফুর রহমান মণ্ডল, বগুড়ার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী এবং রংপুরের মো. শাহজাহান। এছাড়া নোয়াখালীর মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান, কুমিল্লার আব্দুল মান্নান এবং বাগেরহাটের আবুল হাসনাত খান বর্তমানে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত আইজিপি একেএম আওলাদ হোসেন বলেন, "ফ্যাসিস্ট সরকারকে সহায়তায় জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পর্যায়ক্রমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
তবে প্রতিবেদনে উল্লিখিত তথ্যগুলোর বেশিরভাগই প্রশাসনিক সূত্র ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে উপস্থাপিত। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের অনেকগুলোই এখনো তদন্তাধীন বা বিচারাধীন রয়েছে। ফলে চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত এসব অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত বলে গণ্য করা যাবে না।