পর্ব–১ : মায়ার নাম সমাপ্তি
ক্লাস এইট। স্কুলজীবনের সেই বয়স—যখন জীবনটা এখনো ঠিক বুঝে ওঠা হয়নি, কিন্তু মন বুঝে ফেলে অনেক কিছু। তখন হৃদয়ের ভেতর জমে ওঠা অনুভূতিগুলোর কোনো নাম থাকে না, কোনো ভাষাও থাকে না। শুধু থাকে এক ধরনের অদ্ভুত টান, যা না চাইতেও মনকে টেনে নেয়।
সমাপ্তি তখন আমাদেরই ক্লাসে পড়ে।
স্কুলের স্যারের মেয়ে।
এর আগে কোনোদিন কুদ্দুছ তাকে দেখেনি। একই স্কুল, একই আঙিনা—তবু দেখা হয়নি। যেন সময় নিজেই অপেক্ষা করছিল সেই নির্দিষ্ট দিনের জন্য। ক্লাস এইটের শুরুতেই একদিন হঠাৎ খবর এলো—স্যারের মেয়ে নতুন করে ভর্তি হয়েছে, আমাদেরই ক্লাসে।
সেই দিনটা কুদ্দুছের আজও মনে আছে।
ক্লাসরুমে ঢুকে সে প্রথমেই লক্ষ্য করেছিল এক অপরিচিত মুখ। খুব বেশি সাজগোজ নয়, খুব বেশি উজ্জ্বলতাও নয়—তবু কেন জানি চোখ সেখানেই আটকে গিয়েছিল। সমাপ্তি বেঞ্চে বসেছিল শান্তভাবে, চোখ নামানো, মুখে অদ্ভুত এক নির্লিপ্ত ভাব। যেন চারপাশের কোলাহল তার কাছে কিছুই না।
কুদ্দুছ জানত না, ওই প্রথম দেখাটাই তার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী দেখার শুরু।
প্রথম দিনেই মায়ায় পড়ে গেল সে।
এই মায়া কোনো হালকা টান ছিল না।
এই মায়া ছিল আঠার মতো—
যে মায়া একবার লেগে গেলে ছাড়ে না।
যে মায়া চাইলেই উপড়ে ফেলা যায় না।
ক্লাস চলছিল, স্যার পড়াচ্ছিলেন, বন্ধুরা ফিসফিস করছিল—কিন্তু কুদ্দুছের মন ছিল অন্য কোথাও। সে বারবার নিজের অজান্তেই তাকিয়ে ফেলছিল সমাপ্তির দিকে। আর প্রতিবার তাকিয়েই বুকের ভেতর অদ্ভুত এক কাঁপুনি উঠছিল।
দিন গড়াতে লাগল।
সমাপ্তি খুব বেশি কথা বলত না। হাসত কম। ক্লাস শেষে সোজা বাড়ি চলে যেত। অথচ তার নীরব উপস্থিতিটাই কুদ্দুছের জন্য হয়ে উঠেছিল সবচেয়ে বড় শব্দ।
সময় পেরিয়ে অনেক দিন হয়ে গেছে।
ক্লাস বদলেছে, জীবন বদলেছে, বয়স বদলেছে।
তবু আজও কুদ্দুছ ভুলতে পারেনি।
ভুলতে চেয়েছে—অনেকবার।
নিজেকে বোঝাতে চেয়েছে—এটা কেবল কিশোর বয়সের আবেগ, এক ধরনের ভুল বোঝাবুঝি।
কিন্তু কিছু মায়া ভুলে থাকা যায় না।
চেষ্টা করলেই বোঝা যায়—ভুলে যাওয়া আসলে আরও বেশি মনে রাখা।
ক্লাসে বসে থাকলে কুদ্দুছের মনে হতো—
একটু কথা বলি।
খুব সাধারণ কিছু।
হয়তো কোনো প্রশ্ন, হয়তো খাতা নেওয়ার অজুহাত।
কিন্তু সাহস আসত না।
চারপাশের মানুষগুলো ভয় দেখাত।
বন্ধুরা ফিসফিস করে বলত—
“ও স্যারের মেয়ে, দূরে থাক।”
“ওর সাথে কথা বললে বিপদ।”
“স্যারকে বলে দিলে তো শেষ।”
“টিসি দিয়ে দেবে, বুঝছিস?”
এই কথাগুলো কুদ্দুছের মাথার ভেতর ঘুরত। ভয় পেত সে। সত্যিই পেত। স্যারদের চোখ, স্কুলের নিয়ম—সবকিছু মিলিয়ে ভয়টা বাস্তব ছিল।
তবু মন তো নিয়ম বোঝে না।
মন তো ভয় মানে না।
যতই সিদ্ধান্ত নিক—
আজ তাকাবে না,
আজ আর দেখবে না—
চোখ ঠিকই খুঁজে নিত সমাপ্তিকে।
কুদ্দুছ অনেক সময় নিজেই নিজের ওপর রাগ করত।
ভাবত—এত ভয় পাস কেন?
একটা কথা বললেই বা কী হয়?
কিন্তু আবার ভাবত—
যদি সত্যিই বলে দেয়?
যদি সত্যিই সব শেষ হয়ে যায়?
এই দ্বন্দ্বই তাকে প্রতিদিন পোড়াত।
সমাপ্তি হয়তো কিছুই জানত না।
বা জানত, কিন্তু বুঝেও না বোঝার ভান করত।
কুদ্দুছ কখনো তার চোখে চোখ রাখতে পারেনি বেশি সময়। ভয় হতো—চোখে যদি মনের কথা ধরা পড়ে যায়।
স্কুল ছুটি হলে কুদ্দুছ দূর থেকে তাকিয়ে দেখত—সমাপ্তি ধীরে ধীরে গেটের দিকে যাচ্ছে। সেই হাঁটার ভঙ্গি, ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে নেওয়ার দৃশ্য—সবই কুদ্দুছের মনে গেঁথে যেত।
রাতে ঘুম আসত না।
বারবার সেই মুখটা ভেসে উঠত।
সে বুঝতে শুরু করল—এই মায়া সাধারণ নয়।
এই মায়া কষ্টের।
ভীষণ কষ্টের।
তবু তখনো কুদ্দুছ জানত না—এই নীরব, না-বলা ভালোবাসাই একদিন তার জীবনের সবচেয়ে গভীর গল্প হয়ে উঠবে। এমন এক গল্প, যেখানে থাকবে ভালোবাসা, ভয়, অভিমান, বিচ্ছেদ আর অসংখ্য না বলা কথা।
সবকিছুর শুরু হয়েছিল
স্কুলের সেই ক্লাস এইটের বেঞ্চে,
একটি নীরব মেয়েকে প্রথম দেখার মধ্য দিয়ে।
সমাপ্তি—
যে শুধু স্যারের মেয়ে ছিল না,
সে ছিল কুদ্দুছের জীবনের সবচেয়ে গভীর মায়া।
চলবে..............