বর্ষাকাল এলেই সাপ নিয়ে নানা ধরনের গুজব, ভয় এবং ভুল ধারণা ছড়িয়ে পড়ে। বাস্তবে সাপ সম্পর্কে আমাদের অনেক বিশ্বাসই বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। তাই সচেতনতা বাড়ানোর জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরা হলো।
সাপ কি বীন বাজালে নাচে?
সিনেমায় দেখা যায় বীন বাজালে সাপ নাচতে শুরু করে। বাস্তবে বিষয়টি ভিন্ন। সাপ মূলত শব্দের চেয়ে কম্পন এবং সামনের বস্তুর নড়াচড়া বেশি অনুভব করে। তাই বীন বাজানোর সময় সাপ বাদ্যযন্ত্রের নড়াচড়ার প্রতিক্রিয়া দেখায়, সুরের নয়।
সাপ কি মানুষের ওপর আক্রমণ করে?
সাধারণত সাপ মানুষকে আক্রমণ করতে চায় না। বরং মানুষের উপস্থিতি টের পেলে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। মাটির কম্পন ও আশপাশের পরিবেশের পরিবর্তন অনুভব করে তারা বুঝতে পারে বড় কোনো প্রাণী কাছে এসেছে। তাই শব্দ করে হাঁটলে বা লাঠি দিয়ে মাটি ঠুকে এগোলে সাপ সাধারণত সরে যায়।
বেলি, হাসনাহেনা বা গন্ধরাজ ফুলে কি সাপ আসে?
অনেকেই মনে করেন সুগন্ধি ফুলের গাছে সাপ আসে। বাস্তবে ফুলের গন্ধের জন্য নয়, বরং ফুলে আসা পোকামাকড়ের কারণে ব্যাঙ আসে এবং ব্যাঙের সন্ধানে সাপ আসতে পারে। তাই ঝোপঝাড় বা নির্জন স্থানে এমন গাছ থাকলে মাঝে মাঝে সাপ দেখা যেতে পারে।
সাপের প্রতিশোধ নেওয়ার গল্প কি সত্য?
একটি সাপ মেরে ফেললে তার সঙ্গী প্রতিশোধ নিতে আসে—এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। সাপ মানুষের মতো প্রতিশোধপরায়ণ নয়। তবে কোনো এলাকায় সাপের গর্ত বা প্রজননকাল থাকলে কাছাকাছি আরও সাপ দেখা যেতে পারে। এর সঙ্গে প্রতিশোধের কোনো সম্পর্ক নেই।
ছোট সাপ কি বিষহীন?
না। ছোট সাপ মানেই বিষহীন—এ ধারণা ভুল। বিষধর সাপের বাচ্চাও বিষধর। তাই ছোট বা বড়—যেকোনো সাপের কামড়কে গুরুত্ব দিতে হবে।
সাপ কি দুধ খায়?
সিনেমায় দেখানো হলেও অধিকাংশ সাপ দুধ খায় না। তাদের স্বাভাবিক খাদ্য হলো ব্যাঙ, ইঁদুর, পোকামাকড়, টিকটিকি, ছোট প্রাণী ইত্যাদি। বিশেষ করে দাড়াশ সাপ ইঁদুর খেয়ে কৃষকের উপকার করে।
সাপে কাটলে কী করা যাবে না?
নিচের কাজগুলো কখনো করবেন না—
ব্লেড দিয়ে কেটে বিষ বের করার চেষ্টা করবেন না।
মুখ দিয়ে বিষ চুষে বের করার চেষ্টা করবেন না।
ক্ষতস্থানে মরিচ, তেল, ভেষজ বা রাসায়নিক পদার্থ লাগাবেন না।
শক্ত করে দড়ি, তার বা সুতলি বেঁধে রক্ত চলাচল বন্ধ করবেন না।
ওঝা, কবিরাজ বা ঝাড়ফুঁকের ওপর নির্ভর করবেন না।
সাপে কাটলে কী করবেন?
১. আতঙ্কিত হবেন না।
২. আক্রান্ত ব্যক্তিকে যতটা সম্ভব স্থির রাখুন।
৩. ক্ষতস্থান সাবান ও পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে নিন।
৪. আংটি, চুড়ি, ব্রেসলেট বা আঁটসাঁট অলংকার খুলে ফেলুন।
৫. হাত বা পায়ে কামড় হলে অপ্রয়োজনীয় নড়াচড়া বন্ধ রাখুন।
৬. প্রয়োজনে ঢিলাভাবে কাপড় বা ব্যান্ডেজ পেঁচিয়ে রাখা যেতে পারে, তবে রক্ত চলাচল বন্ধ করা যাবে না।
৭. যত দ্রুত সম্ভব নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যান।
সাপ কখন বেশি দংশন করে?
সাধারণত নিম্নোক্ত পরিস্থিতিতে সাপ দংশনের ঘটনা বেশি ঘটে—
বর্ষাকালে, যখন গর্তে পানি উঠে যায়।
অন্ধকারে হাঁটার সময়।
সাপের ওপর পা পড়লে।
ইঁদুরের গর্ত বা ঝোপঝাড়ে হাত-পা দিলে।
ঘরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সাপ বিরক্ত হলে।
বাংলাদেশে সব সাপ কি বিষধর?
না। বাংলাদেশে পাওয়া অধিকাংশ সাপ বিষহীন। অল্প কয়েকটি স্থলচর প্রজাতি মানুষের জন্য বিপজ্জনক। তবে কোনো সাপের কামড়কেই অবহেলা করা উচিত নয়।
বিষধর সাপের কামড়ের লক্ষণ
বিষধর সাপের কামড়ে—
চোখ ঝাপসা দেখা,
চোখের পাতা ঝুলে পড়া,
অতিরিক্ত দুর্বলতা,
শ্বাসকষ্ট,
বমি,
মুখ দিয়ে লালা পড়া,
ক্ষতস্থানে ফোলা, ব্যথা বা রক্তক্ষরণ
ইত্যাদি লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
ওঝা নয়, হাসপাতালে যান
সাপে কাটার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো দ্রুত হাসপাতালে যাওয়া। অ্যান্টিভেনম এবং অন্যান্য চিকিৎসার মাধ্যমে অধিকাংশ রোগী সুস্থ হয়ে ওঠে। সময় নষ্ট করে ওঝা বা লোকজ চিকিৎসার ওপর নির্ভর করলে পরিস্থিতি জটিল হতে পারে।
সাপ সংরক্ষণও জরুরি
সাপ বাস্তুতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তারা ইঁদুর ও বিভিন্ন ক্ষতিকর প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করে। তাই অযথা সাপ হত্যা না করে প্রয়োজনে প্রশিক্ষিত স্নেক রেসকিউ টিমের সহায়তা নিন।
সতর্ক থাকুন
বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখুন।
ঝোপঝাড় নিয়মিত পরিষ্কার করুন।
খড়, লাকড়ি বা ইটের স্তূপে হাত দেওয়ার আগে লাঠি দিয়ে শব্দ করুন।
রাতে টর্চলাইট ব্যবহার করুন।
বিছানা, বালিশ ও কাপড় ব্যবহারের আগে দেখে নিন।
ইঁদুরের গর্ত থাকলে ভরাট করুন।
উপসংহার
সাপকে অকারণে ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই, আবার অবহেলাও করা যাবে না। সচেতনতা, সতর্কতা এবং দ্রুত চিকিৎসাই সাপের কামড় থেকে নিরাপদ থাকার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
© ডা. রাজীব হোসাইন সরকার