ঢাকা, বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬,
সময়: ১০:০৫:৪৯ PM

গল্প,”অবহেলা”

মান্নান মারুফ
29-04-2026 08:52:37 PM
গল্প,”অবহেলা”
 

শুরুতেই বলে দিতে যে, মাঝ পথে হাতটা ছেড়ে দিবে—তবে হয়তো মায়ার বাধনটা এত শক্ত হত না। এই কথাগুলো কুদ্দুছ লিখে রেখেছিল ডায়েরির একেবারে প্রথম পাতায়। ঠিক যেদিন তটিনী চলে গেল, সেদিনই। তারিখটা আজও স্পষ্ট—কারণ মানুষ যত বড় আঘাত পায়, তত বেশি করে মনে রাখে তার শুরুটা। কুদ্দুছের বেলায় তাই হয়েছে।

আমাদের পরিচয়টা ছিল খুব সাধারণ। কলেজের লাইব্রেরিতে, বইয়ের তাকের পাশে দাঁড়িয়ে তুমি হঠাৎ বলেছিলে, “এই বইটা কি নেবেন? আমি একটু আগে দেখছিলাম।” তোমার কণ্ঠে ছিল একধরনের কোমলতা, যা অচেনা হয়েও অদ্ভুতভাবে পরিচিত মনে হয়েছিল। আমি বইটা এগিয়ে দিয়েছিলাম, আর তুমি হেসে বলেছিলে, “ধন্যবাদ। তবে আপনি আগে নিন।”

সেই ছোট্ট বিনিময় থেকেই শুরু হয়েছিল গল্পটা। তারপর ধীরে ধীরে আমরা একই বেঞ্চে বসতে শুরু করলাম, একসঙ্গে ক্লাস শেষে চা খাওয়া, রিকশায় করে বাড়ি ফেরা—সবকিছু যেন খুব সহজভাবে ঘটে যাচ্ছিল। তুমি কখন যে আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেলে, তা আমি নিজেও বুঝতে পারিনি।

তোমার সবচেয়ে ভালো গুণ ছিল—তুমি কথা রাখার চেষ্টা করতে। অন্তত আমি তাই ভাবতাম। তুমি বলেছিলে, “আমি কাউকে মাঝপথে ছেড়ে যাই না।” তখন বিশ্বাস করেছিলাম, অন্ধভাবে। কারণ ভালোবাসা মানুষকে অন্ধ করে দেয়, এই কথাটা তখনও বুঝিনি।

আমাদের সম্পর্কটা ছিল খুব নির্ভরশীল। তুমি ছিলে আমার প্রতিদিনের অভ্যাস। সকালে ঘুম থেকে উঠে তোমার মেসেজ না পেলে দিনটাই অসম্পূর্ণ লাগত। আর রাতের শেষ কথাটাও তুমি ছাড়া কল্পনা করতে পারতাম না। তুমি বলেছিলে, “আমরা একসঙ্গে অনেক দূর যাবো।” আমি বিশ্বাস করেছিলাম—কারণ তোমার চোখে তখন কোনো দ্বিধা ছিল না।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু বদলাতে শুরু করল। প্রথমে খুব সূক্ষ্মভাবে। তুমি আগের মতো নিয়মিত ফোন করতে না। মেসেজের উত্তর দিতে দেরি হতে লাগল। আমি জিজ্ঞেস করলে তুমি বলেছিলে, “ব্যস্ত আছি, বুঝো না?” আমি বুঝতে চেয়েছিলাম। ভালোবাসার নামে মানুষ অনেক কিছুই বুঝে নেয়, এমনকি না বুঝেও।

তুমি ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছিলে—আর আমি সেটাকে ‘সময়’ বলে মেনে নিচ্ছিলাম। ভাবছিলাম, হয়তো এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটা অজানা ভয় কাজ করছিল—যেটাকে আমি স্বীকার করতে চাইনি।

একদিন সন্ধ্যায়, হঠাৎ করে তুমি বললে, “আমাদের একটু কথা বলা দরকার।” এই বাক্যটা মানুষ সাধারণত তখনই বলে, যখন সবকিছু শেষ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। কিন্তু আমি তখনও আশা করছিলাম, হয়তো অন্য কিছু।

আমরা বসেছিলাম সেই একই চায়ের দোকানে, যেখানে একসময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিতাম। কিন্তু সেদিনের পরিবেশটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তুমি আমার চোখের দিকে তাকাচ্ছিলে না।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কি হয়েছে?”

তুমি একটু থেমে বললে, “আমার মনে হয়, আমরা একসঙ্গে থাকাটা ঠিক হচ্ছে না।”

এই একটা বাক্য যেন আমার পুরো পৃথিবীটাকে থামিয়ে দিল। আমি কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলাম। তারপর খুব ধীরে বললাম, “মানে?”

তুমি বললে, “আমি আর আগের মতো অনুভব করছি না।”

আমি তখনও বিশ্বাস করতে চাইনি। বললাম, “তুমি তো বলেছিলে…”

তুমি আমাকে থামিয়ে দিলে। বললে, “মানুষের অনুভূতি বদলাতে পারে।”

এই কথাটা হয়তো সত্যি। কিন্তু সেই মুহূর্তে এটা ছিল সবচেয়ে নির্মম মিথ্যা। কারণ অনুভূতি বদলানোর আগে মানুষ জানে—সে বদলাচ্ছে। আর তখনই বলা উচিত ছিল।

আমি বললাম, “তুমি আগে বলতে পারতে।”

তুমি চুপ করে ছিলে। সেই নীরবতাই ছিল সবচেয়ে বড় উত্তর।

সেদিন তুমি চলে গেলে। খুব সহজভাবে। যেন কিছুই হয়নি। যেন আমরা কখনো একে অপরের জীবনে ছিলামই না।

আর আমি বসে রইলাম, সেই একই জায়গায়। চারপাশে মানুষ ছিল, শব্দ ছিল—কিন্তু আমার ভেতরটা ছিল সম্পূর্ণ নিঃশব্দ।

তারপর শুরু হলো এক অন্য জীবন। যেখানে তুমি নেই, কিন্তু তোমার স্মৃতি আছে। যেখানে প্রতিটা জায়গা তোমার কথা মনে করিয়ে দেয়। যেখানে প্রতিটা গান, প্রতিটা রাস্তা, প্রতিটা বিকেল—সবকিছুতেই তোমার ছায়া।

আমি নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম—সব ঠিক হয়ে যাবে। সময় সব ঠিক করে দেয়। কিন্তু সময় শুধু দূরত্ব বাড়ায়, শূন্যতাকে ভরাট করে না।

রাতে ঘুম আসত না। তোমার পুরোনো মেসেজগুলো পড়তাম। ভাবতাম—কোথায় ভুল হয়েছিল? আমি কি কম ভালোবেসেছিলাম? নাকি বেশি?

একসময় বুঝলাম, সমস্যা ভালোবাসায় ছিল না। সমস্যা ছিল প্রত্যাশায়। আমি বিশ্বাস করেছিলাম—যে মানুষটা বলেছিল, সে কখনো ছেড়ে যাবে না। কিন্তু সে-ই প্রথম ছেড়ে গেল।

তুমি যদি শুরুতেই বলে দিতে—যে তুমি মাঝপথে হাতটা ছেড়ে দিবে, তাহলে হয়তো আমি এতটা জড়িয়ে পড়তাম না। হয়তো নিজের চারপাশে একটা সীমা টেনে রাখতাম। হয়তো এতটা বিশ্বাস করতাম না।

মিথ্যা আশ্বাসের চেয়ে স্পষ্ট অবহেলা অনেক ভালো। কারণ অবহেলা মানুষকে আগেই প্রস্তুত করে দেয়। কিন্তু মিথ্যা আশা মানুষকে শেষ পর্যন্ত ভেঙে দেয়।

অনেকদিন পর, একদিন হঠাৎ তোমার সঙ্গে দেখা হলো। রাস্তায়। তুমি অন্য কারো সঙ্গে ছিলে। তোমার মুখে সেই একই হাসি—যেটা একসময় শুধু আমার জন্য ছিল।

তুমি আমাকে দেখে একটু থেমেছিলে। তারপর বললে, “কেমন আছো?”

এই প্রশ্নটা খুব সাধারণ। কিন্তু উত্তরটা ছিল সবচেয়ে কঠিন।

আমি বললাম, “ভালো আছি।”

মিথ্যা বললাম। কারণ সত্যিটা বলার কোনো মানে ছিল না।

তুমি বললে, “ভালো থেকো।”

আমি মাথা নেড়ে চলে এলাম। পিছনে তাকাইনি। কারণ আমি জানতাম—যদি একবার তাকাই, তাহলে আবার দুর্বল হয়ে পড়ব। বারবার তাকাতে মন চাইবে।

এখন অনেক সময় পেরিয়ে গেছে। আমি নিজেকে নতুন করে গুছিয়ে নিয়েছি। শিখেছি—সবাই থাকে না। কেউ কেউ শুধু শেখাতে আসে।

তুমি আমাকে শিখিয়ে গেছো—ভালোবাসা মানে শুধু অনুভূতি নয়, দায়িত্বও। আর দায়িত্বহীন ভালোবাসা শেষ পর্যন্ত কষ্টই দেয়।

আজও মাঝে মাঝে তোমার কথা মনে পড়ে। কিন্তু সেই কষ্টটা আর আগের মতো তীব্র নয়। সময় তাকে ধীরে ধীরে ম্লান করে দিয়েছে।

তবুও মাঝে মাঝে মনে হয়—যদি তুমি একটু আগে সত্যিটা বলতে, তাহলে হয়তো আমার জীবনটা অন্যরকম হতে পারত। হয়তো শেষটা এতটা কঠিন হতো না।

কিন্তু জীবন কখনো “হয়তো”-এর ওপর চলে না।

তাই এখন আর কোনো প্রশ্ন করি না। শুধু মেনে নিয়েছি—সব মানুষের শেষ একরকম হয় না। কিছু মানুষ অসম্পূর্ণ থাকলেই হয়তো সুন্দর হয়।

আর আমার এই জীবনটা? হয়তো এটা অসম্পূর্ণই থাকলো । আর এটাই এখন ভালো। কষ্টই যেন ভাল।  সমাপ্ত ।।