ঢাকা, রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬,
সময়: ০৬:০৯:২৯ PM

দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও বহিষ্কৃতরা ফেরার অপেক্ষায়

মান্নান মারুফ
26-04-2026 04:40:30 PM
দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও বহিষ্কৃতরা ফেরার অপেক্ষায়

বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-এর ভেতরে সাম্প্রতিক সময়ে শৃঙ্খলাজনিত পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা তীব্র হয়েছে। বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকা ও সাংগঠনিক পর্যায়ে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য, বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়া, কিংবা অভ্যন্তরীণ নির্দেশনা উপেক্ষার অভিযোগে বহু নেতা-কর্মী বহিষ্কারের মুখে পড়েছেন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই বহিষ্কৃতদের একটি বড় অংশ এখন পুনর্বহালের আশায় দলের হাইকমান্ডের দিকে তাকিয়ে আছেন।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, বহিষ্কারের পর অনেক নেতা কার্যত রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন। দীর্ঘদিন মাঠে সক্রিয় থাকা এসব নেতার অনুপস্থিতিতে তৃণমূল সংগঠনে একধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসূচি বাস্তবায়নে গতি কমেছে, নেতৃত্বে বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে এবং কর্মীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ফলে দলীয় কার্যক্রম অনেক জায়গায় “ঢিলেঢালা” অবস্থায় পরিচালিত হচ্ছে।

রংপুর বিভাগ: সাংগঠনিক শূন্যতার ইঙ্গিত

রংপুর বিভাগের দিনাজপুর ও নীলফামারীর মতো গুরুত্বপূর্ণ জেলাগুলোতে বহিষ্কারের প্রভাব স্পষ্ট। দিনাজপুর-২ আসনের আ ন ম বজলুর রশিদ এবং দিনাজপুর-৫ আসনের এ জেড এম রেজয়ানুল হকের মতো নেতারা দীর্ঘদিন ধরে সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় ছিলেন। একইভাবে নীলফামারী-৪-এর রিয়াদ আরাফান সরকার রানা স্থানীয় রাজনীতিতে পরিচিত মুখ। তাদের অনুপস্থিতিতে নেতৃত্বের ঘাটতি তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয়রা মনে করছেন।

রাজশাহী বিভাগ: একাধিক আসনে নেতৃত্ব সংকট

রাজশাহী বিভাগের নওগাঁ, নাটোর, রাজশাহী ও পাবনায় বহিষ্কারের তালিকা তুলনামূলক দীর্ঘ। নাটোর-১ আসনে একাধিক নেতার বহিষ্কার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। বিশেষ করে ডা. ইয়াসির আরশাদ রাজনের প্রত্যাহারপত্র সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ায় গ্রহণ না হওয়া ঘটনাটি দলীয় অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলার কঠোরতার উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই অঞ্চলে দাউদার মাহমুদ, ইসফা খাইরুল হক শিমুল ও ব্যারিস্টার রেজাউল করিমের মতো নেতাদের বহিষ্কার সংগঠনের ভারসাম্যে প্রভাব ফেলেছে।

খুলনা বিভাগ: তৃণমূলের গতি শ্লথ

খুলনা বিভাগের কুষ্টিয়া, নড়াইল, যশোর ও সাতক্ষীরায়ও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। নড়াইল-২ আসনের মনিরুল ইসলাম এবং যশোর-৫-এর অ্যাডভোকেট শহিদ ইকবালের মতো নেতারা মাঠ পর্যায়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখতেন। তাদের অনুপস্থিতিতে কর্মসূচির বাস্তবায়ন ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

বরিশাল ও ঢাকা বিভাগ: কেন্দ্রীয় রাজনীতির প্রভাব

বরিশাল বিভাগে বহিষ্কারের সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও ঢাকা বিভাগে তা উল্লেখযোগ্য। নারায়ণগঞ্জ, টাঙ্গাইল, নরসিংদী ও মুন্সিগঞ্জে একাধিক নেতার বহিষ্কার দলীয় কাঠামোয় চাপ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে টাঙ্গাইল জেলার কয়েকটি আসনে শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের বহিষ্কার স্থানীয় রাজনীতিকে প্রভাবিত করছে।

ময়মনসিংহ ও ফরিদপুর বিভাগ: নেতৃত্ব পুনর্গঠনের প্রয়োজন

ময়মনসিংহ বিভাগের বিভিন্ন আসনে যুগ্ম আহ্বায়ক ও সিনিয়র নেতাদের বহিষ্কার সংগঠনের কার্যক্রমে ধীরগতি এনেছে। একইভাবে ফরিদপুর বিভাগের মাদারিপুর, রাজবাড়ী ও গোপালগঞ্জে একাধিক নেতার বহিষ্কার স্থানীয় নেতৃত্বে শূন্যতা তৈরি করেছে।

সিলেট, কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম বিভাগ: বিস্তৃত প্রভাব

সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে এবং কুমিল্লা বিভাগের ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কুমিল্লায় বহিষ্কারের ঘটনা সংগঠনের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। চট্টগ্রাম বিভাগেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যেখানে সাবেক সংসদ সদস্যসহ গুরুত্বপূর্ণ নেতারা তালিকাভুক্ত।

তৃণমূলের প্রতিক্রিয়া

তৃণমূলের অনেক নেতা-কর্মী মনে করেন, শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন হলেও দীর্ঘদিন বহিষ্কার বহাল থাকলে সংগঠনের ক্ষতি হয়। তারা চান, দল পরিস্থিতি বিবেচনা করে যোগ্য ও অভিজ্ঞ নেতাদের পুনর্বহালের সুযোগ দিক। বিশেষ করে যারা ভুল স্বীকার করেছেন বা দলের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছেন, তাদের ক্ষেত্রে নমনীয়তা দেখানোর আহ্বান উঠেছে।

হাইকমান্ডের নীরবতা

এখন পর্যন্ত দলীয় হাইকমান্ড থেকে পুনর্বহাল নিয়ে স্পষ্ট কোনো ঘোষণা আসেনি। এতে করে সংশ্লিষ্ট নেতাদের পাশাপাশি সাধারণ কর্মীদের মধ্যেও অপেক্ষা ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দল যদি দ্রুত সিদ্ধান্ত না নেয়, তবে তৃণমূলের এই স্থবিরতা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় দলগুলো প্রায়ই শৃঙ্খলা ও ঐক্যের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করে। বিএনপির ক্ষেত্রেও একই চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। বহিষ্কারকৃত নেতাদের পুনর্বহাল করা হবে কিনা, হলে কবে—এ প্রশ্ন এখন দলের অভ্যন্তরে বড় আলোচ্য বিষয়।

সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়, বহিষ্কার একটি তাৎক্ষণিক শৃঙ্খলামূলক পদক্ষেপ হলেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সংগঠনের ওপর গভীর হতে পারে। তাই তৃণমূলের কর্মচাঞ্চল্য ফিরিয়ে আনতে এবং দলকে আরও শক্তিশালী করতে নেতৃত্বের বিচক্ষণ সিদ্ধান্তই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।