ঢাকা, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬,
সময়: ১০:৪৫:২৭ PM

উপন্যাস:“লুচ্চা”

মান্নান মারুফ
17-04-2026 09:24:04 PM
উপন্যাস:“লুচ্চা”

পর্ব:-৬

যার কোনোদিন হাতটাও ধরে নি—যাকে ছুঁয়ে দেখার সাহসও হয়নি—সেই ভালোবাসার মানুষটি যখন কুদ্দুছকে “লুচ্চা” উপাধি দিল, তখনও সে বিষয়টাকে নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চেয়েছিল।

সে ভেবেছিল—এটা শুধু তার আর মেহরিনের মধ্যে একটা ভুল বোঝাবুঝি।

কিন্তু সে ভুল ছিল।

কারণ, শব্দ কখনও এক জায়গায় থেমে থাকে না। বিশেষ করে যখন সেটা তাচ্ছিল্য বা অভিযোগের হয়—তখন তা খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

এখন সেই “লুচ্চা” শব্দটা শুধু কুদ্দুছের কানে নয়, আশেপাশের মানুষের মুখেও ঘুরে বেড়াতে শুরু করেছে।

প্রথম যেদিন সে বিষয়টা বুঝতে পারল, সেদিন তার বুকের ভেতরটা যেন হঠাৎ করে শূন্য হয়ে গেল।

কলেজের করিডোরে দাঁড়িয়ে ছিল সে। কয়েকজন ছেলে পাশ দিয়ে যেতে যেতে নিচু গলায় কিছু বলল—

“ওই যে… ওই ছেলেটা…”
“হ্যাঁ, শুনছি একটু লুচ্চা টাইপ…”

কুদ্দুছ স্পষ্ট শুনতে পেল না পুরোটা, কিন্তু যতটুকু শুনল—তাতেই তার শরীর ঠাণ্ডা হয়ে গেল।

সে বুঝে গেল—কথাটা ছড়িয়ে গেছে।

তার মাথা নিচু হয়ে গেল।

সে দ্রুত সেখান থেকে সরে পড়লো।

তার মনে হচ্ছিল—সবাই তাকে দেখছে, সবাই তাকে নিয়ে কথা বলছে।

যদিও বাস্তবে হয়তো সবাই জানে না, তবুও তার মনে হচ্ছিল—সে যেন এক অদৃশ্য বিচারালয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে, আর সবাই তার বিচার করছে।

সবচেয়ে কষ্টের বিষয়—সে কিছুই করতে পারছে না।

সে কাউকে গিয়ে বলতেও পারে না—
“আমি এমন না…”

কারণ, সে জানে—মানুষের মধ্যে ধারণা একবার তৈরি হয়ে গেলে তা ভাঙা খুব কঠিন।

আর সে নিজের ভালোবাসাকে প্রমাণ করার জন্য কোনো নাটক করতে চায় না।

একদিন রাশেদ এসে সরাসরি বলল—
“শুনছি, তোর সম্পর্কে কিছু কথা ছড়িয়েছে…”

কুদ্দুছ চুপ করে রইল।

রাশেদ একটু থেমে বলল—
“তুই কিছু বলবি?”

কুদ্দুছ ধীরে মাথা নাড়ল—
“না।”

“কেন?”—রাশেদের কণ্ঠে বিস্ময়।

কুদ্দুছ শান্ত গলায় বলল—
“যারা বিশ্বাস করার, তারা এমনিতেই বিশ্বাস করবে।
আর যারা করবে না, তাদের বোঝানোর কোনো মানে নেই।”

এই কথাটা বলার সময় তার কণ্ঠ স্থির ছিল, কিন্তু ভেতরে ভিতরে সে ভেঙে পড়ছিল।

কুদ্দুছ এখন বুঝতে পারছে—তার ভালোবাসার একটা নতুন নাম হয়ে গেছে।

“লুচ্চা।”

এই শব্দটাই যেন তার অনুভূতির বিকৃত প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সে একসময় ভাবত—ভালোবাসা পবিত্র।

এখন সে ভাবছে—
“হয়তো ভালোবাসার অপর নামই লুচ্চা…”

এই চিন্তাটা তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।

রাতে সে ডায়েরি খুলে লিখল—

“আমি তো কোনোদিন তার হাতও ধরিনি।
আমি শুধু দূর থেকে তাকে ভালোবেসেছি।
তবুও আমি লুচ্চা হয়ে গেলাম।”

তার চোখ অন্ধকার হয়ে আসে।

সে আবার লিখে—

“তাহলে কি ভালোবাসা মানেই ভুল বোঝাবুঝি?
তাহলে কি অনুভূতির কোনো মূল্য নেই?”

কুদ্দুছের ভেতরে এখন এক অদ্ভুত যন্ত্রণা বাসা বেঁধেছে।

এটা শুধু অপমানের না—এটা এক ধরনের অসহায়তা।

সে জানে, সে নির্দোষ।
কিন্তু সেটা প্রমাণ করার কোনো পথ নেই।

এই অসহায়তাই তাকে ভেতর থেকে কাঁদায়।

দিন যত যাচ্ছে, তার হৃদয়ের কান্না যেন ততই বেড়ে যাচ্ছে।

সে বাইরে থেকে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে, কিন্তু একা হলেই তার ভেতরের ভাঙনটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ছাদের কোণে বসে, কিংবা ঘরের অন্ধকারে—সে চুপচাপ কাঁদে।

কেউ দেখে না, কেউ জানে না।

একদিন রাতে সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দিকে তাকাল।

তার চোখ লাল, মুখ শুকনো।

সে নিজেকেই বলল—
“তুই কি সত্যিই এত খারাপ?”

তার নিজের প্রতিচ্ছবি যেন কোনো উত্তর দেয় না।

শুধু নীরব তাকিয়ে থাকে।

মেহরিনকে সে এখনও আগের মতোই দেখে—দূর থেকে।

কিন্তু এখন সেই দেখা আর আগের মতো স্বস্তি দেয় না। শুধু কষ্ট ।

এখন সেই দেখার সঙ্গে একটা ভয় মিশে থাকে—
“সে কি জানে, কথাটা ছড়িয়ে গেছে?”
“সে কি থামাতে পারত?”

এই প্রশ্নগুলো তার মাথায় ঘুরতে থাকে।

তবুও, সে মেহরিনের প্রতি কোনো রাগ পোষণ করে না।

অদ্ভুতভাবে—তার ভালোবাসা এখনও অটুট।

সে ভাবে—
“হয়তো সে বুঝতে পারেনি…”

এই ভাবনাটাই তাকে মেহরিনের বিরুদ্ধে কিছু বলতে দেয় না।

একদিন বিকেলে বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিল কুদ্দুছ।

তার চোখের জল বৃষ্টির সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল।

সে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল—

“আমি যদি ভুল হয়ে থাকি,
তাহলে আমায় ঠিক করে দাও…
কিন্তু আমাকে এমন নাম দিয়ো না,
যেটা আমি কখনও ছিলাম না…”

তার কণ্ঠ থেকে কথা বের হচ্ছিল না।।

কুদ্দুছ এখন বুঝতে পারছে—
ভালোবাসা শুধু আনন্দ দেয় না,
অনেক সময় তা মানুষের পরিচয়ও বদলে দেয়।

সে একজন সাধারণ ছেলে থেকে এখন “লুচ্চা” নামে পরিচিত।

এই পরিবর্তনটা সে মেনে নিতে পারছে না, তবুও মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে।

ডায়েরির শেষ পাতায় সে লিখল—

“আমি জানি, আমি কে।
আমি জানি, আমার ভালোবাসা কেমন।
তবুও, মানুষের মুখ বন্ধ করতে পারি না।
হয়তো এটাই আমার নিয়তি।”

তার হৃদয়ের কান্না এখনও থামেনি।

প্রতিদিন, প্রতিরাতে—সে এই কান্না বয়ে বেড়াচ্ছে।

কিন্তু তবুও, সে ভেঙে পড়ে না।

কারণ, তার ভেতরে এখনও একটা আলো আছে—

ভালোবাসার আলো।

আর সেই আলোই তাকে অন্ধকারের মধ্যেও বাঁচিয়ে রাখছে।

(চলবে…)