ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬,
সময়: ০১:১৯:৩৪ AM

”অজ পাড়াগাঁ"

মান্নান মারুফ
15-04-2026 08:25:23 PM
”অজ পাড়াগাঁ"

প্রথম পর্ব: 

দু:খ যদি বিক্রি হইতো, আমি হইতাম ধনী, আমার কাছে আছে শুধু দু:খেরই খনি। ভাই, দু:খেরই খনি… ভাই, দু:খেরই খনি। এই কথাগুলো প্রায়ই মনে মনে বলত রাশেদ। শব্দগুলো যেন তার বুকের ভেতরে জমে থাকা এক অদৃশ্য আগুন—যা বাইরে বেরোতে পারে না, কিন্তু ভেতরটা ধীরে ধীরে পুড়িয়ে দেয়। সে কখনো কাউকে এসব বলেনি। কারণ সে জানত, এই কথার গভীরতা বোঝার মতো মানুষ এই পৃথিবীতে নেই।

রাশেদের জীবনটা যেন শুরু থেকেই অসম ছিল। ছোটবেলা থেকেই সে বুঝে গিয়েছিল—তার পৃথিবী অন্যদের মতো নয়।

তার জন্ম হয়েছিল এক অজপাড়াগাঁয়ের ছোট্ট গ্রামে, যেখানে কাঁচা রাস্তা, ভাঙা ঘর আর অভাব ছিল প্রতিদিনের বাস্তবতা। বাবা ছিলেন দিনমজুর—সকালে বের হলে সন্ধ্যায় ফিরতেন ক্লান্ত শরীর নিয়ে। মা সারাদিন সংসার সামলাতেন, কিন্তু মুখে কখনো অভিযোগ ছিল না। বরং অদ্ভুত এক শান্তি ছিল তার চোখে। সারাদিন পর সবাই মিলে একবেলা পেটভরে খাবার যেন তাদের খুবই আনন্দ আর উৎসবের । 

সন্ধ্যা নামলেই রিমি দৌড়ে উঠোনে চলে আসত। দূরের কাঁচা পথটার দিকে তাকিয়ে থাকত—কখন বাবা ফিরবে। মা তখন হাঁড়িতে ভাত চড়াতেন, আর মাঝেমধ্যে আকাশের দিকে তাকিয়ে মৃদু দোয়া করতেন—“আজকের দিনটা যেন শান্তিতে কাটে।”

বাবা ফিরলে রিমি ছুটে গিয়ে তার গলায় ঝাঁপিয়ে পড়ত।
“কি এনেছো?”—তার চোখে থাকত একরাশ কৌতূহল।

বাবা ক্লান্ত মুখে হাসতেন, পকেট থেকে হয়তো একমুঠো বাদাম বা গুড় বের করতেন। সেই সামান্য জিনিসটুকুই রিমির কাছে ছিল অমূল্য।

রাশেদ একটু দূরে দাঁড়িয়ে এসব দেখত। তার মনে হতো—এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোর মধ্যেই যেন তাদের পুরো পৃথিবী লুকিয়ে আছে।

রিমি ছিল তাদের বাড়ির একমাত্র আলো। তার হাসি, তার ছোট ছোট কথা—সবকিছু যেন অন্ধকার ঘরের ভেতর একটা প্রদীপের মতো জ্বলত।

“ভাইয়া, তুমি বড় হয়ে কি হবে?” একদিন জিজ্ঞেস করেছিল রিমি।

রাশেদ হেসে বলেছিল, “বড় মানুষ হবো।”

“বড় মানুষ মানে?”

“যে অনেক টাকা রোজগার করে, তোমাকে অনেক কিছু কিনে দেয়া।”

রিমি খুশিতে হাততালি দিয়েছিল।

সেই মুহূর্তগুলো এখন রাশেদের মনে পড়লে বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে।

কারণ সে জানে—সে কখনো সেই ‘বড় মানুষ’ হতে পারেনি।

একদিন দুপুরে খবর এল—রাশেদের বাবা কাজ করতে গিয়ে দুর্ঘটনায় পড়েছেন।

লোকজন দৌড়ে গেল। রাশেদও গেল। কিন্তু সেখানে গিয়ে সে যা দেখল, তা তার জীবনের প্রথম বড় ধাক্কা।

তার বাবা মাটিতে পড়ে আছেন, নিথর।

কেউ বলল, “হাসপাতালে নেওয়ার সময়ও পাননি।”

সেদিন রাশেদের পৃথিবী প্রথমবারের মতো থেমে গিয়েছিল।

সে বুঝতে পারছিল না—এটা কি সত্যি? তার বাবা, যে মানুষটা প্রতিদিন লড়াই করে বেঁচে থাকত, সে কি এত সহজে হার মানল?

মা চিৎকার করে কাঁদছিলেন। রিমি কিছু বুঝতে না পেরে মায়ের আঁচল ধরে কাঁদছিল।

আর রাশেদ দাঁড়িয়ে ছিল নিশ্চুপ।

তার চোখে জল ছিল না, কিন্তু বুকের ভেতরটা ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল।

সেদিন থেকেই তার শৈশব শেষ হয়ে যায়।

বাবার মৃত্যুর পর সংসারের সব দায়িত্ব এসে পড়ে রাশেদের কাঁধে।

সে তখন মাত্র ষোলো বছরের ছেলে।

স্কুলে যাওয়ার খাতা-কলমগুলো একদিন চুপচাপ গুছিয়ে রেখে দেয়। শিক্ষক এসে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু সে শুধু মাথা নিচু করে বলেছিল—

“স্যার, এখন আমার পড়ার সময় নাই।”

তারপর শুরু হয় অন্য এক জীবন।

সকালবেলা কাজের খোঁজে বের হওয়া, দিনভর পরিশ্রম, আর রাতে ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘরে ফেরা।

কখনো ইটভাটায় কাজ, কখনো দোকানে, কখনো মাঠে—যেখানে কাজ পাওয়া যায়, সেখানেই যেত সে।

কিন্তু যতই কাজ করুক, অভাব যেন কিছুতেই পিছু ছাড়ত না।

মাঝে মাঝে রাতে খাওয়ার সময় মা বলতেন, “তুই এত কষ্ট করিস না বাবা।”

রাশেদ হেসে বলত, “কষ্ট না করলে চলবে কিভাবে?”

মা কিছু বলতেন না, শুধু চোখ মুছতেন।

রিমি তখন পাশে বসে বলত, “ভাইয়া, তুমি একদিন অনেক বড় হবে, তাই না?”

রাশেদ বলত, “হ্যাঁ, হবো।”

কিন্তু সে নিজেও জানত—এই ‘হওয়া’টা কত দূরের স্বপ্ন।

কিছুদিন পর নতুন এক বিপদ নেমে এল।

রাশেদের মা অসুস্থ হয়ে পড়লেন।

প্রথমে জ্বর, তারপর দুর্বলতা, তারপর এমন অবস্থা—যে বিছানা থেকে উঠতেই পারেন না।

ডাক্তার দেখানো হলো।

ডাক্তার বললেন, “চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি। নিয়মিত ওষুধ লাগবে।”

রাশেদের মাথা ঘুরে উঠল।

সে জিজ্ঞেস করল, “খরচ কত?”

ডাক্তার যে পরিমাণ টাকার কথা বললেন, তা রাশেদের কাছে অসম্ভব।

তবুও সে হাল ছাড়েনি।

সে আরও বেশি কাজ করতে শুরু করল। দিনের পর দিন না খেয়ে থেকেছে, তবুও টাকা জমিয়েছে। পরিচিতদের কাছে হাত পেতেছে, ঋণ নিয়েছে।

একসময় সে নিজের ঘরের একমাত্র মূল্যবান জিনিসটাও বিক্রি করে দেয়।

কিন্তু তবুও সে পারল না।

মায়ের অবস্থা দিন দিন খারাপ হতে লাগল।

এক রাতে মা তাকে ডেকে বললেন, “রাশেদ…”

“কি মা?”

“আমি হয়তো বেশি দিন বাঁচব না।”

“এভাবে বলো না!”

“শোন… রিমির খেয়াল রাখিস।”

রাশেদের চোখ দিয়ে তখন ঝরঝর করে পানি পড়ছিল।

সে বলল, “তুমি কিছু হবে না মা। আমি আছি না?”

মা শুধু মৃদু হাসলেন।

সেই হাসিটাই ছিল তার শেষ হাসি।

পরের দিন ভোরে মা চলে গেলেন না ফেরার দেশে।

রাশেদ এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেনি।

সে ভেঙে পড়েছিল। খুবই ভেঙ্গে পড়ে।

সে বুঝতে পারছিল না—একজন মানুষ কতটা কষ্ট সহ্য করতে পারে?

তার জীবনে তখন শুধুই ছোট বোন রিমি।

রিমিই ছিল তার বেঁচে থাকার একমাত্র প্রেরনা।

সে নিজেকে বলত, “আমার কিছু হলে হবে না, কিন্তু রিমিকে আমি বাঁচাবো।”

সে আরও বেশি পরিশ্রম করতে শুরু করল।

রিমিকে স্কুলে পাঠাত, নিজে না খেয়ে থাকলেও তাকে খাওয়াত।

রিমি মাঝে মাঝে বলত, “ভাইয়া, তুমি এত চুপচাপ কেন?”

সে বলত, “কিছু না।”

কিন্তু তার ভেতরে তখন এক গভীর শূন্যতা।

তারপর এল সেই দিন—যে দিনটা তার জীবনের সব আলো নিভিয়ে দিল।

রিমি সেদিন স্কুলে গিয়েছিল।

কিন্তু আর ফিরে আসেনি।

প্রথমে সবাই ভাবল, হয়তো কোনো বন্ধুর বাড়ি গেছে। কিন্তু সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হয়ে গেল, তবুও সে এল না।

রাশেদের বুক কেঁপে উঠল।

সে পাগলের মতো খুঁজতে শুরু করল।

স্কুল, রাস্তা, পরিচিত সব জায়গা—কোথাও নেই।

শেষে থানায় গিয়ে জিডি করল।

পোস্টার লাগানো হলো।

লোকজন খোঁজ করল।

কিন্তু রিমি আর ফিরে এল না।

দিন যায়।

রাত যায়।

মাস কেটে যায়।

কিন্তু রিমির কোনো খবর নেই।

রাশেদ প্রতিদিন রাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। অঝোঁরে কাদেঁ।

তার মনে হয়, আকাশটা হয়তো সব জানে।

সে ফিসফিস করে বলে, “কোথায় আছিস তুই, রিমি? একবার ফিরে আয়… আমি আর কিছু চাই না…”

কিন্তু আকাশ কোনো উত্তর দেয় না।

শুধু নীরবতা।

একসময় রাশেদ বুঝতে পারে—তার জীবনটা এখন শুধু একটা দীর্ঘ যন্ত্রণা।

না কোনো স্বপ্ন আছে, না কোনো আশা।

সে মানুষের ভিড়েও নিজেকে একা মনে করে।

কারও সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করে না।

কেউ যদি জিজ্ঞেস করে, “কেমন আছো?” সে শুধু বলে, “ভালো।”

কিন্তু সে জানে—এই ‘ভালো’ শব্দটার ভেতরে কতটা মিথ্যা লুকিয়ে আছে।

একদিন রাতে সে নিজেকেই বলল—

“দু:খ যদি বিক্রি হইতো… আমি হইতাম ধনী…”

তার ঠোঁট কাঁপছিল।

“আমার কাছে আছে শুধু দু:খেরই খনি…”

তার চোখ দিয়ে নীরবে জল গড়িয়ে পড়ছিল।

সেদিন সে প্রথমবার অনুভব করল—মানুষের জীবনে এমন এক পর্যায় আসে, যখন আর কাঁদার শক্তিও থাকে না।

শুধু ভেতরে ভেতরে ভাঙতে থাকে।

এইভাবেই শুরু হয় রাশেদের জীবনের  অধ্যায়—যেখানে কষ্ট শুধু অনুভূতি নয়, বরং অস্তিত্ব হয়ে দাঁড়ায়।

যেখানে প্রতিটি শ্বাসে থাকে যন্ত্রণা।

যেখানে বেঁচে থাকাটাই এক ধরনের বোঝা।

কিন্তু সে তখনো জানত না—এই অন্ধকারের পরেও আরও গভীর অন্ধকার অপেক্ষা করছে।

(চলবে —