পর্ব ৩
ভালোবাসা কখন শেষ হয়ে যায়—তা কেউ ঠিক বুঝতে পারে না। কখনও তা ঝড়ের মতো ভেঙে পড়ে,
আবার কখনও ধীরে ধীরে নিভে যায় প্রদীপের শিখার মতো—নিঃশব্দে, অদৃশ্যভাবে।
কুদ্দুছের জীবনে ভালোবাসার শেষটাও ঠিক তেমনই ছিল।
সেদিন বিকেলে আকাশটা অদ্ভুত রকমের মলিন ছিল। সূর্যের আলো ছিল, কিন্তু তাতে উষ্ণতা ছিল না—যেন কুদ্দুছের জীবনের মতো।
সে অনেকদিন পর একটা সিদ্ধান্ত নেয়।
আজ সে ঐশির সাথে কথা বলবে।
সরাসরি।
সবকিছু পরিষ্কার করবে।
ঐশির বাসার সামনে দাঁড়িয়ে কুদ্দুছের বুক ধড়ফড় করছিল। এই বাড়িটা তার খুব পরিচিত—কতবার সে এখানে এসেছে, কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই দেয়ালগুলোর সাথে।
কিন্তু আজ মনে হচ্ছে, সে এখানে অপরিচিত।
গেটের সামনে দাঁড়িয়ে সে কিছুক্ষণ দ্বিধায় থাকে।
তারপর সাহস করে কলিংবেল চাপ দেয়।
একটু পর দরজা খোলে।
ঐশি।
কুদ্দুছ কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে থাকে।
এই মেয়েটাই একসময় তার পুরো পৃথিবী ছিল।
আজ সেই চোখে আর আগের মত সেই মায়া নেই।
ঐশি একটু অবাক হয়, কিন্তু সেটা লুকানোর চেষ্টা করে।
“তুমি?” — তার গলায় একটা ঠান্ডা ভাব।
কুদ্দুছ ধীরে বলে—
“কিছু কথা ছিল… একটু সময় দিবে?”
ঐশি কিছুক্ষণ চুপ থাকে।
তারপর বলে—
“বল, কি কথা?”
এই “বল” শব্দটা কুদ্দুছের বুকটা কেমন যেন করে তুলেছিল।
আগে এই মেয়েটাই বলত—
“এসো, ভেতরে আসো।”
আজ সে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।
কুদ্দুছের গলা শুকিয়ে আসে।
“তুমি… আমাকে এড়িয়ে চলছ কেন?”
ঐশি সরাসরি উত্তর দেয় না।
সে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে।
“তুমি কি সত্যিই আমাকে চিনো না এখন?” — কুদ্দুছের গলায় কষ্ট স্পষ্ট।
ঐশি এবার তাকায়।
তার চোখে বিরক্তি।
“দেখো কুদ্দুছ, এইসব ড্রামা করার সময় আমার নেই।”
এই কথাটা যেন ছুরি হয়ে কুদ্দুছের হৃদয়ে ঢুকে গেল।
সে আস্তে করে বলে—
“ড্রামা? আমি ড্রামা করছি?”
ঐশি এবার একটু জোরে বলে—
“তাহলে কি? হঠাৎ করে এসে এইসব প্রশ্ন করা—এটা কি?”
কুদ্দুছ কিছুক্ষণ চুপ থাকে।
তারপর ধীরে বলে—
“আমি শুধু জানতে চেয়েছি… আমাদের কি হয়েছে?”
ঐশি দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
“আমাদের কিছু হয়নি। সবকিছু ঠিকই আছে—শুধু আমরা আর একসাথে নেই।”
এই কথাটা খুব সহজভাবে বললেও, এর ভেতরের অর্থটা কুদ্দুছকে ভেঙে চুরমার করে দেয়।
“কেন?” — তার কণ্ঠ কাঁপে।
ঐশি কিছুক্ষণ চুপ থাকে।
তারপর খুব ঠান্ডা গলায় বলে—
“কারণ বাস্তবতা।”
“বাস্তবতা?” — কুদ্দুছ বুঝতে পারে না।
ঐশি এবার স্পষ্ট করে—
“তুমি কি দিতে পারো আমাকে? একটা ভবিষ্যৎ? নিরাপত্তা? একটা স্থির জীবন?”
প্রতিটা শব্দ যেন কুদ্দুছকে আঘাত করে।
“আমি চেষ্টা করছি…” — সে বলতে চায়।
কিন্তু ঐশি তাকে থামিয়ে দেয়—
“চেষ্টা দিয়ে জীবন চলে না, কুদ্দুছ।”
এই একটা বাক্য কুদ্দুছের সব স্বপ্ন ভেঙে দেয়।
সে অনেক কিছু বলতে চায়—
কত ভালোবাসে, কত স্বপ্ন দেখেছে, কত রাত জেগে ভেবেছে তাদের ভবিষ্যৎ—
কিন্তু কোনো শব্দ বের হয় না।
ঐশি আবার বলে—
“আমি ক্লান্ত হয়ে গেছি। আমি আর পারছি না এই অনিশ্চয়তায় থাকতে।”
কুদ্দুছ ধীরে বলে—
“তাহলে… তুমি আমাকে ভালোবাসো না আর?”
ঐশি সরাসরি উত্তর দেয় না।
এই না-দেয়াটাই আসলে উত্তর।
ঠিক তখনই ভেতর থেকে সেই ভদ্রলোক বের হয়ে আসে।
পরিপাটি পোশাক, আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গি।
সে ঐশির পাশে এসে দাঁড়ায়।
“Everything okay?” — সে জিজ্ঞেস করে।
ঐশি হালকা হাসে—
“Yes, just an old acquaintance.”
“Old acquaintance…”
এই দুইটা শব্দ কুদ্দুছের কানে বারবার বাজতে থাকে।
একসময় যে ছিল “সবকিছু”—
আজ সে শুধু “পুরনো পরিচিত”।
কুদ্দুছ মাথা নিচু করে।
তার মনে হয়—
সে আর এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে না।
সে আস্তে করে বলে—
“ভালো থাকো…”
ঐশি কিছু বলে না।
শুধু দরজাটা আস্তে করে বন্ধ করে দেয়।
দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দটা কুদ্দুছের কাছে যেন একটা অধ্যায়ের শেষ মনে হলো।
সে ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করে।
রাস্তা ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে।
সে বুঝতে পারে—
তার চোখে পানি।
কিন্তু সে থামে না।
আজ তার ভেতরের শেষ আশাটাও ভেঙে গেছে।
সে বুঝতে পারে—
ভালোবাসা শুধু অনুভূতি না—
এটা একটা “অবস্থা”।
যেখানে অর্থ, নিরাপত্তা, স্থিরতা—সবকিছু জরুরি।
আর সে…
সে এইসব কিছুই দিতে পারেনি।
রাতে সে নিজের ঘরে ফিরে আসে।
ঘরটা আগের মতোই অন্ধকার।
কিন্তু আজ সেই অন্ধকারটা আরও গভীর মনে হচ্ছে।
সে বিছানার দিকে তাকিয়ে অনেকক্ষন দারিয়ে থাকে।
একেবারে চুপ ।
তার মাথায় শুধু একটা কথাই ঘুরছে—
“Old acquaintance…”
সে হঠাৎ করে হাসে।
একটা অদ্ভুত, ভাঙা হাসি।
“আমি এত সহজে শেষ হয়ে গেলাম?”
তার মনে হয়—
সে যেন নিজের জীবনের গল্পে আর গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র না।
সে এখন শুধু এক্সট্রা।
সেদিন রাতে কুদ্দুছ একটা জিনিস বুঝতে পারে—
সবচেয়ে বড় কষ্ট হলো—
যখন তুমি কাউকে এখনও ভালোবাসো,
কিন্তু সে আর তোমাকে চায় না।
তার চোখ দিয়ে পানি পড়ে।
কিন্তু সে কাঁদে না।
কারণ কিছু কষ্ট এত গভীর হয়—
যা চোখের পানি দিয়েও প্রকাশ করা যায় না।
ততক্ষনে ভোর হয়ে আসে।
আবার নতুন একটা দিন শুরু হয়।
কিন্তু কুদ্দুছের জীবনে—
একটা অধ্যায় চিরতরে শেষ হয়ে গেছে।
এবং সেই শূন্যতা তাকে কোথায় নিয়ে যাবে—
সে তখনও জানে না…