পর্ব ৪
মানুষ একা জন্মায়, একা মরে—এই কথাটা কুদ্দুছ আগে অনেকবার শুনেছে।
কিন্তু একা বেঁচে থাকা যে কতটা কঠিন—তা সে এখন বুঝতে পারছে।
ঐশির সাথে শেষ দেখা হওয়ার পর যেন তার ভেতরের সবকিছু নিভে গেছে।
আগে তার কষ্ট ছিল, কিন্তু সেই কষ্টের মধ্যে একটা আশা ছিল।
এখন কষ্ট আছে—কিন্তু কোনো আশা নেই।
সকালে ঘুম ভাঙে, কিন্তু সে বিছানা ছাড়তে চায় না।
কারণ নতুন দিন মানেই নতুন কোনো সুযোগ নয়—
বরং একই রকম শূন্যতা, একই ব্যর্থতা, একই নিঃসঙ্গতা।
কুদ্দুছের ঘরটা এখন আরও অগোছালো হয়ে গেছে।
কোণায় পড়ে থাকা কাপড়, টেবিলে ধুলা, এক পাশে রাখা আধখাওয়া খাবার—সবকিছু যেন তার মনের অবস্থার প্রতিচ্ছবি।
সে আগের মতো নিজের যত্নও নেয় না।
চুল এলোমেলো, দাড়ি বড় হয়ে গেছে, চোখের নিচে গভীর কালো দাগ।
কয়েকদিন ধরে সে বাইরে বের হয় না।
ফোনটা প্রায় সবসময় বন্ধ থাকে।
কারণ এখন আর কেউ তাকে খোঁজে না।
একদিন বিকেলে তার ফোনে হঠাৎ একটা কল আসে।
পুরনো বন্ধু—রাশেদ।
কুদ্দুছ কিছুক্ষণ ফোনটার দিকে তাকিয়ে থাকে।
ধরবে? নাকি ধরবে না?
শেষ পর্যন্ত সে ধরে।
“হ্যালো, কুদ্দুছ! কেমন আছিস?” — রাশেদের কণ্ঠে আগের মতো উচ্ছ্বাস নেই।
কুদ্দুছ একটু থেমে বলে—
“ভালো…”
“শুন, আমরা সবাই আজকে একটা গেট-টুগেদার করছি। তুই আসবি?”
কুদ্দুছ কিছুক্ষণ চুপ থাকে।
একসময় সে এই ধরনের আড্ডার প্রাণ ছিল।
আজ সে নিজেকে সেখানে কল্পনা করতে পারে না।
“না… আজকে একটু কাজ আছে।” — মিথ্যা বলে সে।
রাশেদ বলে—
“আচ্ছা, যাই হোক… ভালো থাকিস।”
কলটা কেটে যায়।
কুদ্দুছ ফোনটা কিছুক্ষন বন্ধ রাখে।
তার মনে হয়—
সে নিজেই নিজেকে মানুষদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
কিন্তু আবার মনে হয়—
তাদের মাঝেও সে আর মানানসই না।
এই দ্বন্দ্ব তাকে আরও একা করে তোলে।
রাতে হঠাৎ করে তার শ্বাস নিতে কষ্ট হয়।
বুকের ভেতর চাপ অনুভব করে।
মনে হয়—
কিছু একটা তাকে চেপে ধরছে।
সে উঠে বসে।
চারপাশে তাকায়।
ঘরটা অন্ধকার।
নিঃশব্দ।
তার মনে হয়—
সে যেন একটা বন্ধ ঘরের মধ্যে আটকে গেছে, যেখানে বাতাসও ঢোকে না।
এই অনুভূতিটা নতুন না।
গত কয়েকদিন ধরে এটা প্রায়ই হচ্ছে।
সে বুঝতে পারে না—
এটা কি শুধু মানসিক কষ্ট, নাকি আরও কিছু?
কুদ্দুছ ধীরে ধীরে বাইরে বের হয়।
রাত তখন গভীর।
রাস্তা প্রায় ফাঁকা।
সে হাঁটতে থাকে।
কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য নেই।
হাঁটতে হাঁটতে সে একটা ব্রিজের উপর এসে দাঁড়ায়।
নিচে নদীর পানি অন্ধকারে মিলিয়ে গেছে।
সে রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে থাকে।
অনেকক্ষণ।
তার মাথায় অদ্ভুত কিছু চিন্তা আসে।
“যদি সবকিছু এখানেই শেষ হয়ে যায়?”
এই চিন্তাটা তাকে ভয় পাইয়ে দেয়।
সে দ্রুত পিছিয়ে আসে।
“না… আমি এত দুর্বল না…”
সে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করে।
কিন্তু সত্যিটা হলো—
সে ভেঙে পড়ছে।
ধীরে ধীরে, গভীরভাবে।
পরের দিন সে আবার কাজ খুঁজতে বের হয়।
কিন্তু আজ তার মধ্যে কোনো আগ্রহ নেই।
একটা দোকানে গিয়ে সে দাঁড়ায়।
মালিক তাকে দেখে বলে—
“কি চান?”
কুদ্দুছ কিছুক্ষণ চুপ থাকে।
তারপর বলে—
“কাজ…”
মালিক মাথা থেকে পা পর্যন্ত তাকে দেখে।
তার চোখে অবহেলা স্পষ্ট।
“আপনার মতো লোক দিয়ে হবে না। অন্য কোথাও যান।”
এই কথাটা শুনে কুদ্দুছের কোনো প্রতিক্রিয়া হয় না।
সে শুধু চলে আসে।
আগে এই কথাগুলো তাকে কষ্ট দিত।
এখন আর দেয় না।
কারণ সে যেন অভ্যস্ত হয়ে গেছে।
এই অভ্যস্ত হওয়াটাই সবচেয়ে ভয়ংকর।
সন্ধ্যায় সে আবার সেই চায়ের দোকানে যায়।
আজও কেউ তাকে লক্ষ্য করে না।
এক কোণে বসে সে চা খায়।
তার সামনে দিয়ে মানুষ যায়, আসে।
কেউ হাসে, কেউ কথা বলে, কেউ ব্যস্ত—
কিন্তু কেউ তাকে দেখে না।
সে মনে মনে ভাবে—
“আমি কি সত্যিই আছি?”
তার মনে হয়—
সে যেন ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে।
রাতে ঘরে ফিরে সে আয়নার সামনে দাঁড়ায়।
নিজের দিকে তাকায়।
“এই আমি?”
সে নিজেকে চিনতে পারে না।
একসময় সে ছিল স্বপ্নে ভরা, প্রাণবন্ত।
আজ সে নিঃশব্দ, শূন্য, ভাঙা।
তার চোখ দিয়ে পানি পড়ে।
কিন্তু সে মুছে না।
কারণ এখন আর কান্নারও শক্তি নেই তার।
সে বিছানায় শুয়ে পড়ে।
আস্তে আস্তে চোখ বন্ধ করে।
কিন্তু ঘুম আসে না।
তার মাথায় একের পর এক চিন্তা—
অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ—
সবকিছু মিলেমিশে এক ধরনের অন্ধকার তৈরি করেছে।
সে বুঝতে পারে—
এই অন্ধকার বাইরে কোথও না—
তার বুকের ভিতরে।
এবং এই অন্ধকার থেকে বের হওয়া এত সহজ না।
কুদ্দুছ ধীরে ধীরে ফিসফিস করে—
“আমি কি কখনও আবার আগের মতো হতে পারবো?”
কোনো উত্তর আসে না।
শুধু নিঃশব্দ রাত…
আর একাকিত্বের ভারী অন্ধকার।
এবং সেই অন্ধকারের মধ্যে কুদ্দুছ ডুবে যেতে থাকে—
ধীরে ধীরে…
নিঃশব্দে…
অদৃশ্যভাবে…
চলবে..........