ঢাকা, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬,
সময়: ০২:১৭:৪০ AM

উপন্যাস:“কষ্ট”

মান্নান মারুফ
12-04-2026 01:32:01 PM
উপন্যাস:“কষ্ট”

পর্ব ৬

মানুষ যখন একেবারে নিচে পড়ে যায়, তখন তার সামনে দুইটা পথ থাকে—
একটা, সেখানেই পড়ে থাকা।
আরেকটা, ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ানো।

কুদ্দুছ দ্বিতীয় পথটাই বেছে নিয়েছে।

ডেলিভারির কাজটা শুরু করার পর প্রথম কয়েকটা সপ্তাহ ছিল খুব কঠিন।

শরীর মানিয়ে নিতে পারছিল না।
রোদে সাইকেল চালাতে চালাতে মাথা ঘুরাতো, হাতে ব্যথা, পায়ে টান।

অনেকদিন রাতে সে এত ক্লান্ত হয়ে পড়ত যে ঠিকমতো খেতেও পারত না।

কিন্তু একটা জিনিস বদলে গিয়েছিল—

সে আর আগের মতো ভেঙে পড়ত না।

প্রতিদিন সকালে সে নিজেকে একটা কথা বলত—

“আজকেও টিকে থাকতে হবে।”

এই “টিকে থাকা”টাই ধীরে ধীরে তার শক্তি হয়ে উঠল।

কয়েকদিন পর তার মালিক তাকে ডেকে বলল—

“আপনি খারাপ না, ভালই কাজ করছেন।”

এই ছোট্ট প্রশংসাটা কুদ্দুছের কাছে অনেক বড় কিছু মনে হলো।

কারণ অনেকদিন পর কেউ তাকে “খারাপ না” বলল।

ধীরে ধীরে সে নিজের কাজের প্রতি মনোযোগী হয়ে ওঠে।

ঠিকানা মনে রাখে, সময় ম্যানেজ করতে শেখে, মানুষের সাথে কথা বলার ভঙ্গি বদলায়।

একদিন এক গ্রাহক তাকে বলে—

“ভাই, আপনি খুব ভদ্রভাবে কথা বলেন।”

এই কথাটা শুনে কুদ্দুছ কিছুক্ষণ চুপ থাকে।

তারপর হালকা করে হাসে।

এটাই ছিল তার নতুন শুরু।

রাতে সে এখন আগের মতো অন্ধকারে ডুবে থাকে না।

সে একটা খাতা বের করে।

খাতার প্রথম পাতায় লিখে—

“আমি কি হতে চাই?”

এই প্রশ্নটা সে অনেকদিন নিজেকে করেনি।

সে লিখতে শুরু করে—

  • একটা স্থির জীবন
  • নিজের একটা ঘর
  • মায়ের মুখে হাসি
  • আর… নিজের সম্মান

ঐশির কথা সে লিখতে যায়…

কিন্তু থেমে যায়।

কারণ এখন সে বুঝেছে—

ভালোবাসা পাওয়ার আগে নিজেকে দাঁড় করানো দরকার।

দিন যায়।

মাস ঘুরতে থাকে।

কুদ্দুছ এখন আগের চেয়ে অনেক বদলে গেছে।

তার চেহারায় এখনও ক্লান্তি আছে, কিন্তু সাথে একটা দৃঢ়তাও আছে।

সে নিয়মিত কাজ করে, সময়মতো পৌঁছায়, ভুল কম করে।

একদিন তার মালিক তাকে ডেকে বলে—

“শুনেন, আমি ভাবছি আপনাকে স্থায়ীভাবে রাখবো। আর বেতনও একটু বাড়ানো যাবে।”

এই কথাটা শুনে কুদ্দুছের চোখ ভিজে ওঠে।

সে মাথা নিচু করে বলে—

“ধন্যবাদ, স্যার…”

এই প্রথম সে মনে করে—

সে আবার ফিরে আসছে।

কিন্তু তার যাত্রা এখানেই থামে না।

একদিন ডেলিভারি দিতে গিয়ে সে একটা অফিসে যায়।

সেখানে একজন ভদ্রলোক তার সাথে কথা বলে।

“আপনি আগে কি করতেন?”

কুদ্দুছ কিছুক্ষণ চুপ থাকে।

তারপর বলে—

“চেষ্টা করতাম… কিন্তু পারিনি।”

লোকটা হাসে—

“এখন তো পারছেন।”

এই কথাটা কুদ্দুছের মনে দাগ কাটে।

লোকটা তাকে বলে—

“আপনি চাইলে এখানে পার্ট-টাইম কাজ করতে পারেন। ডাটা এন্ট্রি টাইপ কিছু।”

কুদ্দুছ অবাক হয়ে যায়।

সে ভাবতেই পারেনি—
তার জন্য আবার কোনো “অফিস” দরজা খুলতে পারে।

সে সুযোগটা নেয়।

এখন তার দিন আরও ব্যস্ত হয়ে যায়।

সকালে ডেলিভারি, রাতে পার্ট-টাইম কাজ।

ক্লান্তি বেড়ে যায়।

কিন্তু সাথে সাথে তার আত্মবিশ্বাসও বাড়তে থাকে।

সে এখন বুঝতে পারে—

সে অযোগ্য না।

শুধু সময়টা তার বিরুদ্ধে ছিল।

ধীরে ধীরে সে কিছু টাকা জমাতে শুরু করে।

একদিন সে মাকে টাকা পাঠায়।

মা ফোন করে কাঁদতে থাকে—

“তুই পারছিস বাবা…”

এই কথাটা কুদ্দুছের জীবনের সবচেয়ে বড় পুরস্কার মনে হয়।

সে রাতে আকাশের দিকে তাকায়।

অনেকদিন পর তার মনে হয়—

তার জীবনটা আবার অর্থপূর্ণ হয়ে উঠছে।

একদিন সেই পুরনো চায়ের দোকানে যায়।

রহিম চাচা এবার তাকে দেখে বলে—

“এই কুদ্দুছ! কেমন আছিস?”

এই “কেমন আছিস” প্রশ্নটা আজ অনেকদিন পর সত্যিকারের মনে হয়।

কুদ্দুছ হেসে বলে—

“ভালো আছি, চাচা…”

সে চা খায়।

আগের মতো।

কিন্তু এবার তার মনে হয়—

সে আর আগের সেই হারিয়ে যাওয়া মানুষটা না।

সে ফিরে আসছে।

ধীরে ধীরে।

নিজের মতো করে।

ঐশির কথা এখনো মাঝে মাঝে মনে পড়ে।

কিন্তু সেই কষ্টটা আর তাকে ভেঙে দেয় না।

বরং সে মনে মনে বলে—

“ধন্যবাদ…”

কারণ এই ভাঙনই তাকে বদলাতে শিখিয়েছে।

রাত গভীর হয়।

কুদ্দুছ তার খাতাটা খুলে।

প্রথম পাতার নিচে নতুন করে লিখে—

“আমি শুরু করেছি।”

এটা শেষ না—

এটা নতুন শুরু।

এবং এবার—

সে থামবে না।

কারণ সে শিখে গেছে—

পড়ে যাওয়া লজ্জার না,
পড়ে থেকে যাওয়াটাই আসল হার।

কুদ্দুছ আর হারতে চায় না।

সে ফিরে দাঁড়িয়েছে।

এবং এবার—

সে নিজের পরিচয় নিজেই তৈরি করবে…

চলবে.....