পর্ব – ৩
ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে সকালগুলো সবসময়ই একটু অন্যরকম। ভোরের কুয়াশা ধীরে ধীরে সরতে থাকে, সূর্যের আলো নদীর জলে পড়ে চিকচিক করে ওঠে। পাখির ডাক, দূরের আজানের সুর আর মানুষের ব্যস্ততা—সব মিলিয়ে একটা নতুন দিনের শুরু হয়। কিন্তু এই নতুন দিনের আলো সব মানুষের জীবনে সমান উজ্জ্বলতা নিয়ে আসে না।
রিমার জন্য প্রতিটা সকাল যেন এক নতুন লড়াই।
১৮ বছরের এই মেয়েটা এখন কলেজে পড়ে। বইয়ের পাতায় তার ভবিষ্যতের স্বপ্ন আঁকা থাকে, কিন্তু বাস্তবের পথটা কাঁটায় ভরা। তার ডাগর চোখের কোণে সবসময় একটা অদ্ভুত অপরাধবোধ জমে থাকে—যেন সে কোনো অদৃশ্য অপরাধের ভার বইছে।
সে জানে, তার পড়াশোনার পেছনে যে টাকা খরচ হয়, তা খুব সহজে আসে না।
মজিবুর রহমান, যাকে সে দাদু বলে ডাকে, নিজের প্রয়োজনের অনেক কিছু ছেড়ে দিয়েছে শুধু তার জন্য।
এই সত্যটা রিমার হৃদয়ে গভীরভাবে গেঁথে আছে।
সেদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে রিমা দেখল, মজিবুর রহমান উঠোনে বসে আছেন। হাতে একটা পুরোনো ওষুধের কৌটা। তিনি কৌটাটা খুলে আবার বন্ধ করছেন, যেন ভেতরে কিছু আছে কি নেই সেটা যাচাই করছেন।
“দাদু, কী করছো?”—রিমা এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল।
মজিবুর রহমান একটু চমকে উঠলেন, তারপর হাসলেন।
“কিছু না মা, পুরোনো ওষুধগুলো দেখছিলাম।”
“নতুন ওষুধ আনোনি?”
“আনবো,”—তিনি খুব সহজভাবে বললেন—“এই মাসটা যাক, তারপর।”
রিমা চুপ করে গেল।
সে জানে, এই “এই মাসটা যাক” কথাটার মানে কী। এই মাসেই তার কলেজের ফরম ফিলাপের টাকা দিতে হবে।
সে ধীরে ধীরে ঘরের ভেতরে চলে গেল। তার বুকটা হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দিকে তাকাল।
এই মুখটা কি এতটাই মূল্যবান, যার জন্য একজন মানুষ নিজের প্রয়োজন ত্যাগ করছে?
তার চোখে জল।
কলেজে যাওয়ার পথে আজ তার মনটা খুব খারাপ। রাস্তার ধুলো, মানুষের দৃষ্টি—সবকিছু যেন আজ আরও বেশি তীক্ষ্ণ লাগছে।
চায়ের দোকানের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় সে শুনতে পেল—
“ওই যে, পড়ুয়া মাইয়া! দাদার টাকায় পড়াশোনা!”
“হ, দাদা না অন্য কিছু—কেউ জানে?”
হাসির শব্দ ভেসে এলো।
রিমা থামেনি। কিন্তু তার ভেতরে যেন কিছু ভেঙে পড়ল।
কলেজে গিয়ে সে ক্লাসে মন বসাতে পারল না। শিক্ষক কিছু বোঝাচ্ছিলেন, কিন্তু তার কানে যেন কিছুই ঢুকছিল না।
তার মাথায় শুধু একটা কথাই ঘুরছিল—“আমি কি বোঝা?”
দুপুরে তার বান্ধবী নীলা পাশে এসে বসলো।
“কিরে, এত চুপচাপ কেন?”—নীলা জিজ্ঞেস করল।
রিমা একটু হাসার চেষ্টা করল।
“কিছু না।”
“আমাকে বলবি না?”
রিমা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর ধীরে ধীরে বলল—
“আমি যদি না পড়তাম, তাহলে দাদুর এত কষ্ট হতো না, তাই না?”
নীলা অবাক হয়ে তাকাল।
“এইসব কী বলছিস?”
“দাদু নিজের ওষুধ কেনে না। আমার ফরম ফিলাপের জন্য টাকা জমায়। আমি এটা জানি। তাহলে আমি কি তার ওপর বোঝা না?”
নীলা গভীরভাবে রিমার দিকে তাকাল।
“তুই কি জানিস, ভালোবাসা কী?”
রিমা চুপ।
নীলা বলল, “ভালোবাসা মানে কাউকে বোঝা মনে না করা। বরং তার জন্য কিছু করতে পারাটাই আনন্দ মনে করা। তোর দাদু যদি তোকে বোঝা ভাবত, তাহলে তোকে পড়াতো না।”
এই কথাগুলো রিমার মনে একটু আলো ফেলল।
কিন্তু তার ভেতরের অপরাধবোধ পুরোপুরি মুছে গেল না।
বিকেলে বাড়ি ফিরে সে দেখল, মজিবুর রহমান খাটে বসে আছেন। তার মুখটা একটু ক্লান্ত দেখাচ্ছে।
“দাদু, শরীর খারাপ?”—রিমা দৌড়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল।
“না মা, একটু মাথা ধরেছে।”
“ওষুধ খাওনি?”
“আছে তো… খেয়ে নেবো।”
রিমা জানে—ওষুধ নেই।
সে কিছু না বলে ভেতরে চলে গেল। নিজের বইয়ের ভেতর থেকে কিছু টাকা বের করল। এগুলো সে টিউশনি করে জমিয়েছে।
সে এসে মজিবুর রহমানের সামনে টাকা এগিয়ে ধরল।
“এগুলো রাখো দাদু।”
“কিসের টাকা?”
“আমি টিউশনি করে পেয়েছি। তুমি ওষুধ কিনো।”
মজিবুর রহমান চুপ করে তাকিয়ে রইলেন।
তার চোখে জল চলে এলো।
“তুই বড় হয়ে গেছিস মা…”—তিনি ধীরে বললেন।
রিমা মৃদু হেসে বলল, “না দাদু, আমি এখনো ছোটই আছি। কিন্তু তোমার কষ্টটা বুঝতে শিখেছি।”
সেই মুহূর্তে তাদের মাঝে কোনো কথা ছিল না। কিন্তু নিঃশব্দে একটা গভীর অনুভূতি আদান-প্রদান হচ্ছিল।
এটাই কি ভালোবাসা না?
ওদিকে গ্রামের মানুষ তাদের মতোই আছে।
একদিন বিকেলে চায়ের দোকানে আবার আলোচনা।
“মেয়েটা এখন টাকা কামাইও করে নাকি!”
“হ, অনেক কিছুই পারে মনে হয়!”
এই কথাগুলো শুনে পাশের এক তরুণ, নাম আরিফ, চুপ করে থাকতে পারল না।
“আপনারা যা বলছেন, সবই কি সত্যি?”—সে প্রশ্ন করল।
লোকজন একটু থমকে গেল।
“তুমি কি ওদের পক্ষ নিচ্ছো?”—কেউ জিজ্ঞেস করল।
আরিফ শান্তভাবে বলল, “আমি শুধু বলছি—কেউ যদি কারো জন্য ত্যাগ স্বীকার করে, সেটা খারাপ কিছু না। বরং সেটা সম্মানের।”
চায়ের দোকানে কিছুক্ষণ নীরবতা নেমে এলো।
প্রথমবারের মতো কেউ প্রকাশ্যে তাদের পক্ষে কথা বলল।
সেই খবর ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ল।
রিমা যখন শুনল, তার মনে এক অদ্ভুত অনুভূতি হলো।
সবাই খারাপ না।
কেউ কেউ আছে, যারা বুঝতে পারে।
সেই রাতে রিমা আবার নদীর পাড়ে গেল।
আকাশে চাঁদ উঠেছে। নদীর জলে তার প্রতিফলন পড়েছে।
সে চুপচাপ বসে ভাবছিল—তার জীবনটা কি সত্যিই এত কঠিন?
হয়তো না।
কারণ তার জীবনে একজন মানুষ আছে, যে তাকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসে।
আর আজ সে বুঝেছে—ভালোবাসা শুধু গ্রহণ করার বিষয় না, বরং ফিরিয়ে দেওয়ারও।
তার অপরাধবোধ ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে দায়িত্ববোধে।
সে সিদ্ধান্ত নিল—সে পড়াশোনা করবে, নিজের পায়ে দাঁড়াবে। শুধু নিজের জন্য না, মজিবুর রহমানের জন্য।
যে মানুষটা তাকে সমাজের চোখ রাঙানিকে উপেক্ষা করে নিজের ঘরে জায়গা দিয়েছে, তার জন্য কিছু করা তার দায়িত্ব।
দূরে কোথাও আবার ফিসফাস চলছে।
বাঁকা চোখের দৃষ্টি এখনো থামেনি।
কিন্তু সেই দৃষ্টির মাঝেই জন্ম নিচ্ছে নতুন কিছু—সম্মান, সাহস, আর সত্যিকারের ভালোবাসা।
রিমার চোখে এখনো জল আসে, কিন্তু সেই জলের ভেতর আর শুধু কষ্ট নেই—আছে শক্তি।
কারণ সে জানে, ভালোবাসা কখনো অপরাধ না।
ভালোবাসা হলো—একজন মানুষকে নিজের সবটুকু দিয়ে আগলে রাখা।
আর সেই ভালোবাসাই একদিন সব বাঁকা চোখকে সোজা করে দেবে।
(চলবে…)