ঢাকা, শুক্রবার, ৩ এপ্রিল ২০২৬,
সময়: ০৫:৪৩:৫১ PM

উপন্যাস:“সম্পর্ক”

মান্নান মারুফ
03-04-2026 03:46:50 PM
উপন্যাস:“সম্পর্ক”

পর্ব ১: 

ভালবাসা বলতে কিছু নেই—এই কথাটা প্রথম শুনে নীপা হেসে উঠেছিল। তার কাছে তখন ভালবাসা মানে ছিল একরাশ রঙিন স্বপ্ন, বৃষ্টিভেজা দুপুর, আর কারও হাত শক্ত করে ধরে থাকা। কিন্তু কুদ্দুছ যখন খুব নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলেছিল, “মানুষ আসলে সামাজিক জীব। একসঙ্গে থাকতে থাকতে একটা সম্পর্ক তৈরি হয়, এটাকেই আমরা ভালবাসা বলি,”—তখন কথাটা নীপা খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি।

নীপা তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। প্রাণবন্ত, চঞ্চল আর স্বপ্নবিলাসী। আর কুদ্দুছ? সে ছিল একটু অন্যরকম—চুপচাপ, পর্যবেক্ষণপ্রবণ, আর বাস্তববাদী। তাদের পরিচয়টা হয়েছিল একেবারে সাধারণভাবে—একই ক্লাস, একই লাইব্রেরি, আর ধীরে ধীরে একই বন্ধুমহল।

প্রথম দিকে নীপা কুদ্দুছকে তেমন পাত্তা দিত না। কারণ ছেলেটা খুব একটা কথা বলত না। কিন্তু একদিন লাইব্রেরিতে বই খুঁজতে গিয়ে যখন সে বিপাকে পড়েছিল, তখনই প্রথম কুদ্দুছ এগিয়ে এসেছিল।

“তুমি কি ‘সমাজবিজ্ঞান তত্ত্ব’ বইটা খুঁজছ?”
নীপা একটু অবাক হয়ে তাকিয়েছিল। “হ্যাঁ, কিন্তু পাচ্ছি না।”
কুদ্দুছ হালকা হাসল। “ওটা দ্বিতীয় শেলফের বাম পাশে। আমি নিয়ে দিচ্ছি।”

সেই ছোট্ট সাহায্যটাই যেন একটা সূচনা হয়ে দাঁড়াল। এরপর থেকে প্রায়ই তাদের দেখা হতে লাগল। ক্লাস শেষে একসঙ্গে হাঁটা, ক্যাম্পাসের চায়ের দোকানে আড্ডা—সবকিছুই যেন খুব স্বাভাবিকভাবে ঘটতে লাগল।

দিন যেতে লাগল, আর তাদের মধ্যে অদৃশ্য একটা বন্ধন তৈরি হতে লাগল। কেউ কাউকে কিছু বলেনি, তবুও দুজনেই বুঝতে পারছিল—কিছু একটা বদলাচ্ছে।

একদিন বৃষ্টির দুপুরে, ক্যাম্পাস প্রায় ফাঁকা। নীপা ছাতা আনেনি। কুদ্দুছ তার পাশে এসে দাঁড়াল।

“চলো, আমার ছাতার নিচে আসো।”

নীপা একটু ইতস্তত করলেও শেষে এগিয়ে এল। দুজন পাশাপাশি হাঁটতে লাগল। হঠাৎ করেই নীপা বলল, “তুমি কি ভালবাসায় বিশ্বাস করো?”

কুদ্দুছ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “না।”

নীপা অবাক। “কেন?”

“কারণ ভালবাসা বলে কিছু নেই। মানুষ একসঙ্গে থাকতে থাকতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। সেই অভ্যাসটাই আমরা ভালবাসা বলে মনে করি।”

নীপা একটু চুপ করে রইল। তার মনে হল, ছেলেটা খুব ঠান্ডা মনের। কিন্তু সেই ঠান্ডা মনেই যেন একটা অদ্ভুত আকর্ষণ ছিল।

এরপর থেকেই তাদের সম্পর্কটা আরও গভীর হতে লাগল। তারা একে অপরকে ছাড়া যেন থাকতে পারত না। সকালে ক্লাসে দেখা না হলে দিনটাই অসম্পূর্ণ লাগত। রাতে ফোনে কথা না বললে ঘুম আসত না।

একদিন নীপা মজা করে বলেছিল, “আমরা কি প্রেম করছি?”

কুদ্দুছ একটু হেসে বলেছিল, “তুমি যদি মনে করো, তাহলে করছি।”

“তুমি কি মনে করো না?”
“আমি মনে করি আমরা একে অপরের সাথে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছি।”

এই উত্তরটা শুনে নীপা একটু কষ্ট পেলেও সে সেটা প্রকাশ করেনি। কারণ সে জানত, কুদ্দুছ এমনই।

সময়ের সাথে সাথে তাদের সম্পর্কটা আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠল। বন্ধুদের চোখেও তারা ‘কাপল’ হিসেবে পরিচিত হয়ে গেল। কেউ তাদের আলাদা করে ভাবতেই পারত না।

কিন্তু এই সম্পর্কের ভেতরে একটা অদৃশ্য ফাঁক ছিল—নীপার অনুভূতি আর কুদ্দুছের বাস্তবতার মধ্যে।

নীপা স্বপ্ন দেখত—একদিন তারা বিয়ে করবে, একসঙ্গে সংসার করবে। আর কুদ্দুছ? সে কখনও এসব নিয়ে কথা বলত না।

একদিন নীপা সরাসরি জিজ্ঞেস করল, “আমাদের ভবিষ্যৎ কি?”

কুদ্দুছ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “ভবিষ্যৎ নিয়ে এত ভাবার কি আছে? এখন আমরা একসাথে আছি, এটাই তো যথেষ্ট।”

“কিন্তু সবকিছুর একটা শেষ আছে, তাই না?”
“হ্যাঁ, সবকিছুরই শেষ আছে।”

এই কথাটা শুনে নীপা হঠাৎ করেই অস্বস্তি বোধ করল। তার মনে হল, কুদ্দুছ যেন শুরু থেকেই শেষের কথা ভেবে রেখেছে।

তবুও সম্পর্কটা চলতে থাকল।

কেউ কাউকে ছাড়া থাকতে পারত না। নীপা মাঝে মাঝে ভাবত, “এটাই কি ভালবাসা?”—আর নিজেই উত্তর দিত, “হ্যাঁ, এটাই তো ভালবাসা।”

কিন্তু কুদ্দুছের মনে সেই একই প্রশ্নের উত্তর ছিল ভিন্ন।

একদিন তাদের মধ্যে ছোট্ট একটা ঝগড়া হল। তুচ্ছ একটা বিষয় নিয়ে। কিন্তু সেই ঝগড়াটা যেন তাদের সম্পর্কের ভেতরের অস্থিরতাকে সামনে নিয়ে এল।

নীপা রেগে বলল, “তুমি কখনও আমাকে গুরুত্ব দাও না!”

কুদ্দুছ শান্তভাবে বলল, “আমি বাস্তববাদী। অত আবেগ দেখাতে পারি না।”

“তাহলে তুমি কি আমাকে ভালবাসো না?”
কুদ্দুছ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “আমি তোমার সাথে থাকতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি।”

এই উত্তরটা যেন ছুরির মতো বিঁধল নীপার মনে।

সেদিন রাতে নীপা অনেক কেঁদেছিল। কিন্তু পরের দিন আবার সব স্বাভাবিক হয়ে গেল। কারণ তারা কেউই একে অপরকে ছাড়া থাকতে পারছিল না।

এইভাবেই চলতে লাগল তাদের ‘প্রেম’—অথবা ‘সম্পর্ক’।

সময়ের সাথে সাথে তারা আরও বেশি কাছাকাছি এল। একে অপরের জীবনের অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠল।

কিন্তু কোথাও একটা অদৃশ্য সত্য লুকিয়ে ছিল—এই সম্পর্কটা কি সত্যিই ভালবাসা, নাকি শুধুই অভ্যাস?

একদিন ক্যাম্পাসে বসে নীপা বলল, “যদি একদিন আমরা আলাদা হয়ে যাই?”

কুদ্দুছ নির্লিপ্তভাবে বলল, “মানুষ সবকিছুতেই অভ্যস্ত হয়ে যায়। আলাদা হয়েও অভ্যস্ত হয়ে যাবে।”

নীপা আর কিছু বলতে পারল না।

তার মনে হল, সে যেন এমন একজনকে ভালবাসছে, যে ভালবাসায় বিশ্বাসই করে না।

তবুও সে কুদ্দুছকে ছেড়ে যেতে পারল না।

কারণ সম্পর্কটা তখন আর শুধু সম্পর্ক ছিল না—এটা ছিল এক ধরনের নির্ভরতা, এক ধরনের আসক্তি।

এবং ঠিক সেখান থেকেই শুরু হল তাদের ‘প্রেম-প্রেম খেলা’—যার শেষ কোথায়, তা তখনও কেউ জানত না।

চলবে......