ঢাকা, শুক্রবার, ৩ এপ্রিল ২০২৬,
সময়: ০৫:৪২:১৭ PM

উপন্যাস:“সম্পর্ক”

মান্নান মারুফ
03-04-2026 03:57:15 PM
উপন্যাস:“সম্পর্ক”

পর্ব ৪

সময় কখনো থেমে থাকে না। মানুষের জীবনে যত বড় ঝড়ই আসুক না কেন, সময় তার নিজস্ব গতিতেই এগিয়ে চলে। কুদ্দুছ আর নীপার জীবনেও তেমনই হলো—ঝড় বয়ে গেছে, ভেঙে দিয়েছে অনেক কিছু, কিন্তু সময় তাদের দাঁড় করিয়ে দিয়েছে নতুন এক মোড়ে।

বিচ্ছেদের পর প্রথম কয়েকটা মাস নীপার জন্য ছিল সবচেয়ে কঠিন। প্রতিটি দিন যেন একেকটা দীর্ঘ রাতের মতো মনে হতো। চারপাশে মানুষ, বন্ধু, ক্লাস—সবকিছু ঠিকই ছিল, কিন্তু তার ভেতরে এক ধরনের শূন্যতা বাসা বেঁধেছিল।

তবুও সে নিজেকে ভাঙতে দেয়নি।

সে ধীরে ধীরে নিজের জীবনের দিকে মনোযোগ দিতে শুরু করল। পড়াশোনা, নিজের ক্যারিয়ার, নিজের স্বপ্ন—যেগুলো একসময় কুদ্দুছকে ঘিরে ছিল, সেগুলো আবার নিজের কাছে ফিরিয়ে আনতে লাগল।

একদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে বলেছিল,
“আমি কাউকে ছাড়া অসম্পূর্ণ না।”

এই কথাটা হয়তো পুরোপুরি সত্য ছিল না, কিন্তু নিজেকে শক্ত রাখার জন্য সে এই বিশ্বাসটাই ধরে রাখল।

অন্যদিকে, কুদ্দুছের জীবনেও পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। তানিয়ার সাথে তার সম্পর্ক এখন অনেকটাই গভীর হয়েছে। তারা একসাথে সময় কাটায়, পরিকল্পনা করে, ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলে।

কুদ্দুছ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ব্যস্ত—ক্লাস, বন্ধু, আর তানিয়া।

কিন্তু মাঝে মাঝে, একেবারে অপ্রত্যাশিত সময়ে, তার মনে পড়ে যায় নীপার কথা।

কোনো বৃষ্টির দিনে, বা কোনো পরিচিত গান শুনলে, হঠাৎ করে মনে পড়ে—কেউ একসময় তার পাশে ছিল, যে খুব সহজেই হাসতে পারত, খুব সহজেই কাঁদত।

কিন্তু সে সেই চিন্তাগুলোকে বেশি গুরুত্ব দেয় না।

কারণ সে বিশ্বাস করে—মানুষের জীবনে এগিয়ে যাওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

একদিন তানিয়া তাকে জিজ্ঞেস করেছিল,
“তোমার কি কখনো অতীতের কথা মনে পড়ে?”

কুদ্দুছ একটু ভেবে বলেছিল,
“মনে পড়ে… কিন্তু আমি অতীতে থাকতে চাই না।”

এই উত্তরটা শুনে তানিয়া হেসেছিল।
“ভালই তো। যারা অতীতে থাকে, তারা কখনো এগোতে পারে না।”

কিন্তু বাস্তবতা হলো—অতীত পুরোপুরি কখনোই ছেড়ে যায় না।

এদিকে নীপা নিজের জীবনে নতুন একটা ছন্দ খুঁজে পেয়েছে। সে এখন আগের মতো দুর্বল নয়। বন্ধুদের সাথে সময় কাটায়, নিজের লক্ষ্য নিয়ে ভাবে, এমনকি মাঝে মাঝে হাসতেও পারে।

তবে একটা জায়গা এখনও খালি রয়ে গেছে।

ভালবাসা—এই শব্দটার উপর তার বিশ্বাস অনেকটাই নষ্ট হয়ে গেছে।

সে এখন মনে করে, ভালবাসা আসলে সাময়িক আবেগ ছাড়া কিছুই না।

মানুষ একসাথে থাকতে থাকতে একটা সম্পর্ক তৈরি করে, তারপর কোনো এক সময় সেটা ভেঙে যায়।

এই ভাঙনটাই যেন বাস্তব, আর ভালবাসাটা শুধু একটা ভ্রম।

একদিন তার এক সহপাঠী, রাহাত, তাকে বলল,
“তুমি অনেক বদলে গেছ।”

নীপা হেসে বলল, “মানুষ বদলায়, তাই না?”

রাহাত একটু থেমে বলল,
“সবাই বদলায় না। কেউ কেউ নিজেকে লুকিয়ে ফেলে।”

এই কথাটা নীপাকে কিছুটা ভাবিয়ে তুলল।

সে কি সত্যিই বদলেছে, নাকি শুধু নিজের ভেতরের অনুভূতিগুলোকে লুকিয়ে ফেলেছে?

এই প্রশ্নের উত্তর সে খুঁজে পায় না।

এদিকে সময়ের সাথে সাথে তাদের জীবন আরও আলাদা হয়ে যেতে থাকে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষে এসে সবাই নিজের নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কেউ চাকরি খোঁজে, কেউ উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি নেয়।

নীপাও সিদ্ধান্ত নেয়—সে দেশের বাইরে পড়তে যাবে।

কানাডা—এই দেশটার নাম সে অনেকবার শুনেছে। নতুন জীবন শুরু করার জন্য হয়তো এটিই তার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গা।

সে আবেদন করে, প্রস্তুতি নেয়, আর অবশেষে একদিন সে সুযোগ পায়।

এই খবরটা শুনে তার পরিবার খুব খুশি হয়। বন্ধুরাও তাকে অভিনন্দন জানায়।

কিন্তু এই আনন্দের মাঝেও তার মনে এক ধরনের অদ্ভুত অনুভূতি কাজ করে—সে কি সত্যিই সবকিছু ছেড়ে চলে যেতে পারবে?

এই শহর, এই ক্যাম্পাস, এই স্মৃতিগুলো?

একদিন সে শেষবারের মতো ক্যাম্পাসে ঘুরতে যায়।

সবকিছু আগের মতোই আছে—কিন্তু তার কাছে সবকিছুই এখন অন্যরকম লাগে।

সে সেই বেঞ্চটার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়, যেখানে একসময় সে আর কুদ্দুছ ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকত।

একটু দূরে তাকিয়ে সে দেখতে পায়—কুদ্দুছ আর তানিয়া একসাথে হাঁটছে।

এই দৃশ্যটা দেখে তার বুকটা হালকা কেঁপে ওঠে।

কিন্তু এবার সে কাঁদে না।

শুধু মৃদু একটা হাসি দেয়।

কারণ সে বুঝে গেছে—কিছু সম্পর্ক শুধু একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্যই থাকে।

তারপর সেগুলো স্মৃতি হয়ে যায়।

আর সেই স্মৃতি নিয়েই মানুষ এগিয়ে যায়।

কয়েকদিন পর নীপা দেশ ছেড়ে চলে যায়—এক নতুন জীবনের পথে।

অন্যদিকে, কুদ্দুছও নিজের জীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

সময় তাদের আরও দূরে নিয়ে যায়—দুইজন দুই প্রান্তে।

একজন নতুন দেশে, নতুন জীবনে।

আরেকজন নিজের পুরোনো শহরে, নতুন সম্পর্ক নিয়ে।

একদিন যারা একে অপরকে ছাড়া থাকতে পারত না, আজ তারা একে অপরের জীবনের বাইরে।

এটাই কি বাস্তব?

হয়তো তাই।

ভালবাসা, সম্পর্ক—সবকিছুই হয়তো সময়ের সাথে বদলে যায়।

কেউ নতুন মানুষ খুঁজে পায়, কেউ নতুন স্বপ্ন।

কেউ অতীত ভুলে যায়, কেউ অতীত নিয়ে বেঁচে থাকে।

কিন্তু জীবন থেমে থাকে না।

এবং সেই জীবনই একদিন প্রমাণ করে—
সম্পর্ক যত গভীরই হোক না কেন,
তার শেষটা সবসময় এক নয়।

চলবে.....