পর্ব–২
বুকের চাপা কান্না দূর করবে কে? মায়া তো নেই। সে এখন অনেক দূরে চলে গেছে। তাকে স্মরণ করা যাবে—কিন্তু ছুঁয়ে দেখা যাবে না, ডেকে পাওয়া যাবে না।
রাত যত গভীর হয়, কুদ্দুছের ভেতরের শূন্যতাও তত বিস্তৃত হয়ে ওঠে। চারপাশে সবকিছু নিস্তব্ধ হয়ে গেলে তার বুকের ভেতর জমে থাকা কান্নাগুলো যেন শব্দ খুঁজে পায়। কিন্তু সেই শব্দ বাইরে বের হয় না—শুধু নিঃশ্বাস হয়ে ভেসে ওঠে।
মায়া নেই—এই সত্যটা কুদ্দুছ জানে। তবুও সে বিশ্বাস করতে পারে না। মাঝে মাঝে মনে হয়, এই তো একটু পরেই ফোনটা বেজে উঠবে, মায়ার কণ্ঠ ভেসে আসবে—
“কি করছো?”
কিন্তু ফোনটা আর বাজে না।
দিনের বেলা কুদ্দুছ নিজেকে ব্যস্ত রাখে। অফিস, কাজ, মানুষের সাথে কথা—সবকিছুতেই নিজেকে ডুবিয়ে রাখে। যেন ভুলে থাকতে পারে। কিন্তু রাত নামলেই সবকিছু আবার ফিরে আসে।
মায়ার স্মৃতিগুলো যেন তার ঘরের প্রতিটি কোণে লুকিয়ে আছে।
বিছানার পাশে রাখা বইটা—যেটা মায়া তাকে পড়তে বলেছিল।
জানালার ধারে বসার জায়গাটা—যেখানে তারা একসাথে অনেক সন্ধ্যা কাটিয়েছে।
চায়ের কাপ—যেটা মায়া একদিন মজা করে বলেছিল, “এটা শুধু আমার জন্য রাখবে।”
সবকিছুতেই মায়ার ছোঁয়া।
একদিন কুদ্দুছ সাহস করে সেই পুরোনো চায়ের দোকানে গেল। যেখানে তাদের প্রথম দেখা হয়েছিল। দোকানটা আগের মতোই আছে—কিন্তু সবকিছু যেন বদলে গেছে।
চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে সে চারপাশে তাকালো। সেই জায়গাটাতেই দাঁড়িয়ে ছিল মায়া—তার স্মৃতিতে। ভিজে চুল, মৃদু হাসি।
“আপনি এত ভিজে গেছেন! ঠান্ডা লাগবে কিন্তু।”
কুদ্দুছের ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটে উঠলো, কিন্তু চোখ ভিজে গেল।
“তুমি ঠিকই বলেছিলে মায়া… ঠান্ডা লেগেছে। খুব ঠান্ডা…”
তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ ভারী হয়ে উঠলো।
সেদিন বাসায় ফিরে সে প্রথমবারের মতো নিজেকে ভেঙে পড়তে দিল। এতদিন ধরে যে কান্নাটা চেপে রেখেছিল, সেটা আর থামানো গেল না। সে কাঁদলো—নিঃশব্দে, নিঃসঙ্গভাবে।
কেউ জানলো না।
সময় ধীরে ধীরে এগিয়ে চলে। কিন্তু কুদ্দুছের জীবনে সময় যেন থেমে আছে সেই জায়গায়, যেখানে মায়া তাকে ছেড়ে গিয়েছিল।
একদিন তার এক বন্ধু বললো,
“তুই এভাবে কতদিন থাকবি? জীবন তো থেমে থাকে না।”
কুদ্দুছ মৃদু হেসে বলেছিল,
“আমার জীবন তো থেমেই গেছে।”
বন্ধুটা কিছু বলতে পারেনি।
এরই মাঝে একদিন হঠাৎ কুদ্দুছ একটা চিঠি পেল।
চিঠিটা মায়ার।
হাত কাঁপছিল তার। বুকের ভেতরটা যেন ধকধক করছিল। অনেকদিন পর মায়ার লেখা শব্দগুলো তার সামনে।
চিঠিটা খুলে পড়তে শুরু করলো—
“কুদ্দুছ,
তুমি কেমন আছো, আমি জানি না। তবে এটা জানি, তুমি আমাকে ভুলে যাওনি। কারণ আমি নিজেও পারিনি।
আমি ভালো নেই। সবাই ভাবে আমি সুখে আছি, কিন্তু সত্যিটা কেউ জানে না। এই নতুন জীবনে সবকিছু আছে—কিন্তু শান্তি নেই।
আমি প্রায়ই তোমার কথা ভাবি। তোমার সেই নীরবতা, সেই ভালোবাসা—যেটা আমি বুঝেও বুঝতে চাইনি।
আমি জানি, আমি তোমার সাথে অন্যায় করেছি। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমি চাইনি এমনটা হোক।
তুমি কি আমাকে ক্ষমা করতে পারবে?
—মায়া”
চিঠিটা পড়ে কুদ্দুছ কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে বসে রইলো।
তার ভেতরে অদ্ভুত এক অনুভূতি কাজ করছিল—খুশি, দুঃখ, রাগ, ভালোবাসা—সবকিছু একসাথে।
সে জানে, এই চিঠির কোনো উত্তর নেই। কারণ কিছু সম্পর্কের শেষ হয়ে গেলেও, তাদের ব্যাখ্যা থাকে না।
তবুও সে কলম হাতে নিল।
লিখতে শুরু করলো—
“মায়া,
ক্ষমা করার মতো কিছুই নেই। তুমি যা করেছো, সেটা তোমার ইচ্ছা ছিল না—তোমার পরিস্থিতি ছিল।
আমি তোমাকে দোষ দেই না। কারণ ভালোবাসা কখনো দোষী হয় না।
আমি এখনও তোমাকে ভালোবাসি। কিন্তু সেই ভালোবাসা এখন আর কোনো দাবি করে না।
তুমি সুখে থাকো—এইটুকুই চাই।
—কুদ্দুছ”
চিঠিটা শেষ করে সে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলো।
তারপর ধীরে ধীরে সেটা ভাঁজ করে রেখে দিল।
পাঠালো না।
কারণ সে জানে—এই কথাগুলো মায়ার কাছে পৌঁছানো দরকার নেই। কিছু কথা শুধু নিজের ভেতরেই থাকলে ভালো।
সেই রাতটা ছিল অন্যরকম।
জানালার পাশে বসে কুদ্দুছ আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। অসংখ্য তারা জ্বলছে—ঠিক মায়ার চোখের মতো।
সে ফিসফিস করে বললো,
“তুমি কি আমাকে মনে করো?”
হালকা বাতাস বয়ে গেল।
মনে হলো, কেউ যেন উত্তর দিল—
“হ্যাঁ…”
কুদ্দুছ চোখ বন্ধ করলো। সেই বাতাসের মধ্যে সে মায়ার উপস্থিতি অনুভব করলো।
কিন্তু হঠাৎই তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলো। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। যেন কেউ তার বুকে চাপ দিয়ে ধরেছে।
সে উঠে দাঁড়াতে চাইল, কিন্তু পারলো না।
মেঝেতে পড়ে গেল।
চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসছিল।
তার মনে হচ্ছিল—এই কি শেষ?
এই কি তার গল্পের শেষ নিঃশ্বাস?
চোখ বন্ধ হওয়ার আগে সে শুধু একটা কথাই ভাবলো—
“মায়া…”
তার ঠোঁটে মৃদু একটা হাসি ফুটে উঠলো।
হয়তো সে জানে—এই জীবনে না হলেও, কোনো এক অনন্ত সময়ে তাদের দেখা হবে।
আর সেই দেখা হবে—শেষ নিঃশ্বাসের পরেও।
চলবে —