পর্ব – ৬
দীর্ঘদিনের স্মৃতি আজও বারবার মনে পড়ে। স্কুলের কথা, কলেজের কথা—পিকনিকে গিয়ে দুষ্টামি করতে গিয়ে হাত থেকে প্লেট পড়ে যাওয়ার ঘটনা। আজও জানতে ইচ্ছা—তুমি কি এসব সবই ভুলে গেছো? কোন স্মৃতিটা উস্কানি দেয়, ভাসতে বলে প্রেমের বানে? তুমি পত্র দিও। জানাইও ঠিকানা। নেহা, তুমি কেমন আছো।
কুদ্দুছ এই লাইনগুলো লিখে গভীরভাবে নিঃশ্বাস ফেলল। মনে হলো—তার জীবনের প্রতিটি দিনই যেন একেকটা স্মৃতির পুনর্জন্ম। সে যতই ভুলতে চায়, ততই স্মৃতিগুলো নতুন করে জেগে ওঠে—কখনো হাসি হয়ে, কখনো কষ্ট হয়ে।
তার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য এখন এই—সে অতীতে বাস করে।
স্কুল জীবনের সেই ছোট্ট উঠোন, যেখানে তারা প্রথম একসাথে দাঁড়িয়েছিল—আজও তার চোখে ভাসে। সকালের অ্যাসেম্বলিতে দাঁড়িয়ে থাকা নেহা, চুলে হালকা বেণী, চোখে সরলতা—সবকিছু এত পরিষ্কার মনে পড়ে, যেন গতকালের ঘটনা।
কুদ্দুছ মনে মনে হাসে—
“তুমি কি জানো, তখনই আমি তোমাকে আলাদা করে চিনেছিলাম?”
তারপর কলেজ।
কলেজ জীবনটা যেন ছিল তাদের সম্পর্কের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়। ক্লাস ফাঁকি দিয়ে ক্যান্টিনে বসা, পরীক্ষার আগের রাতে একসাথে পড়ার অজুহাতে গল্প করা—সবকিছু যেন একেকটা রঙিন দৃশ্য।
কিন্তু সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে সেই পিকনিকের দিনটা।
শীতের সকাল। কলেজ থেকে সবাই মিলে গিয়েছিল শহরের বাইরে একটা বড় বাগানে। চারদিকে গাছ, পাখির ডাক, আর বন্ধুদের উচ্ছ্বাস।
নেহা সেদিন খুব হাসিখুশি ছিল।
কুদ্দুছ ইচ্ছে করেই ওকে একটু বিরক্ত করছিল।
—“এই নেহা, তুমি রান্না করতে পারো?”
—“কেন, বিয়ে করবে নাকি?”
—“না, খেতে চাই…”
এই কথায় সবাই হেসে উঠেছিল।
নেহা একটু রাগ দেখিয়ে বলেছিল—
—“তুমি খুব বিরক্ত করো…”
কুদ্দুছ হেসে বলেছিল—
—“তাই তো তুমি আমার সাথে কথা বলো…”
এই কথায় নেহা কিছু বলেনি, শুধু হালকা হেসেছিল।
দুপুরে যখন সবাই মিলে খাচ্ছিল, তখন কুদ্দুছ হঠাৎ করে মজা করতে গিয়ে নেহার প্লেটটা টেনে ধরেছিল।
আর ঠিক তখনই—
প্লেটটা হাত থেকে পড়ে গেল।
ভাত, তরকারি সব মাটিতে ছড়িয়ে পড়ল।
এক মুহূর্তের জন্য সবাই চুপ।
তারপর হঠাৎ করে হাসির রোল উঠল।
নেহা প্রথমে একটু রেগে গিয়েছিল, কিন্তু পরে নিজেই হেসে ফেলেছিল।
—“তুমি না একদম বাচ্চা…”
—“তোমার জন্যই…”
সেদিনের সেই হাসি, সেই মুহূর্ত—আজও কুদ্দুছের হৃদয়ে অমলিন।
কুদ্দুছ চিঠিতে লিখতে শুরু করল—
“নেহা,
তুমি কি সেই পিকনিকের দিনটার কথা মনে রেখেছ?
যেদিন তোমার হাত থেকে প্লেটটা পড়ে গিয়েছিল…
জানো, আজও আমি সেই দৃশ্যটা ভুলতে পারিনি।
তুমি রাগ করেছিলে, আবার নিজেই হেসে ফেলেছিলে।
তোমার সেই হাসিটা—
আজও আমার সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতি।”
কুদ্দুছ একটু থামল।
তার মনে হলো—এই স্মৃতিগুলো কি শুধু তার কাছেই এত জীবন্ত?
নাকি নেহাও কখনো এগুলো মনে করে?
সে আবার লিখল—
“তুমি কি সব ভুলে গেছো, নেহা?
নাকি আমার মতোই মাঝে মাঝে স্মৃতির ভেতর হারিয়ে যাও?
কোন স্মৃতিটা তোমাকে সবচেয়ে বেশি টানে?
আমার নামটা কি কখনো হঠাৎ করে মনে পড়ে?”
এই প্রশ্নগুলো যেন তার নিজের কাছেই ফিরে আসে।
কুদ্দুছ জানে—সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না।
তবুও সে লিখে যায়।
কারণ, এই লেখা ছাড়া তার আর কোনো পথ নেই।
সেই রাতে কুদ্দুছ ঘুমাতে পারছিল না।
ডায়েরিটা খুলে বসে ছিল।
হঠাৎ একটা পুরনো ছবি চোখে পড়ল।
পিকনিকের ছবি।
সবাই একসাথে দাঁড়িয়ে, মাঝখানে নেহা।
তার মুখে সেই একই হাসি।
কুদ্দুছ ছবিটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল।
তার মনে হলো—এই ছবিটাই যেন সময়কে আটকে রেখেছে।
হঠাৎ ফোনে একটা নোটিফিকেশন।
নেহা।
“আজ হঠাৎ করে একটা পুরনো ছবি দেখলাম…”
কুদ্দুছের বুক কেঁপে উঠল।
সে লিখল—
“পিকনিকের?”
নেহা কিছুক্ষণ পর উত্তর দিল—
“হ্যাঁ… তুমি প্লেটটা ফেলে দিয়েছিলে…”
কুদ্দুছ অবাক হয়ে গেল।
তার চোখ ভিজে উঠল।
—“তুমি মনে রেখেছ?”
নেহা লিখল—
“সব ভুলে যাওয়া যায় না…”
এই কথাটা পড়ার পর কুদ্দুছের মনে হলো—সে একা নয়।
নেহাও একই স্মৃতির ভেতর বেঁচে আছে।
নেহা আবার লিখল—
“জানো, সেই দিনটার কথা ভাবলে এখনো হাসি পায়…”
কুদ্দুছ ধীরে লিখল—
“আমারও…”
তারপর কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ।
কিন্তু এই নীরবতার ভেতরেই যেন হাজার কথা।
নেহা আবার লিখল—
“কুদ্দুছ… আমরা কি সত্যিই এত দূরে চলে গেছি?”
এই প্রশ্নটা কুদ্দুছের ভেতরটা নাড়িয়ে দিল।
সে লিখল—
“দূরত্বটা জায়গার না… সময়ের…”
নেহা লিখল—
“তাহলে কি সময়টা ফিরিয়ে আনা যায়?”
কুদ্দুছ কিছুক্ষণ ভেবে লিখল—
“না… কিন্তু মনে রাখা যায়…”
নেহা উত্তর দিল—
“তাহলে আমরা মনে রেখেই বাঁচবো…”
এই কথাটায় এক অদ্ভুত শান্তি ছিল, আবার এক গভীর কষ্টও।
কুদ্দুছ বুঝতে পারল—তারা দুজনই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে।
অতীতের ভেতর।
কিন্তু ভবিষ্যতের দিকে এগোনোর সাহস কারোরই নেই।
কুদ্দুছ আবার চিঠিটা শেষ করতে বসল।
“নেহা,
আজ বুঝলাম—তুমি কিছুই ভুলে যাওনি।
তুমি যেমন মনে রেখেছো, আমিও তেমনই রেখেছি।
হয়তো এই স্মৃতিগুলোই আমাদের সবচেয়ে বড় বন্ধন।
আমরা একসাথে নেই—
তবুও একে অপরের ভেতর আছি।
যদি কখনো মনে হয়—
সবকিছু খুব কঠিন হয়ে যাচ্ছে,
তাহলে সেই পিকনিকের দিনটার কথা ভাবো।
দেখবে—হাসি ফিরে আসবে।”
শেষে সে লিখল—
“তুমি ভালো থেকো।
আর যদি সম্ভব হয়—
তোমার ঠিকানাটা জানিও।
হয়তো কোনো একদিন,
আমি চিঠিটা নিজ হাতে পৌঁছে দিতে চাই…
ততদিন—
পত্র দিও…”
চিঠিটা ভাঁজ করে কুদ্দুছ জানালার দিকে তাকাল।
রাত গভীর হয়েছে।
আকাশে চাঁদ উঠেছে।
সে মনে মনে বলল—
“নেহা… তুমি ভালো থেকো…”
তার কণ্ঠে ছিল এক অদ্ভুত মায়া।
আর তার হৃদয়ে—অমলিন স্মৃতির এক অন্তহীন নদী বয়ে চলেছে।
(চলবে…)