পর্ব-৩
ভালবাসা মানুষকে যখন কাছে টেনে নেয়, তখন রূপ-গুণ নয়—আবেগই বেশি কাজ করে। মায়ার বন্ধন তখন এমন এক অদৃশ্য শিকলে পরিণত হয়, যা ছিন্ন করা যায় না সহজে। আর এই প্রেম যখন সামাজিক ও ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে যায়, তখন তার পরিণতি প্রায়ই ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
নাদিয়া সেই ভয়াবহতার দিকেই এগোচ্ছিল—জেনেশুনেই।
একদিন বিকেলে, বাগানের সেই পুরনো জায়গাটায় দাঁড়িয়ে নাদিয়া হঠাৎ বলল,
“আমি আর এখানে থাকব না।”
তার কণ্ঠে ছিল এক অদ্ভুত দৃঢ়তা, যেন অনেকদিন ধরে জমে থাকা একটা সিদ্ধান্ত আজ শব্দ হয়ে বেরিয়ে এসেছে।
কুদ্দুছ থমকে গেল। হাতে থাকা পানির পাইপটা নিঃশব্দে মাটিতে পড়ে গেল।
“কী বলতেছো?” তার গলায় স্পষ্ট আতঙ্ক।
নাদিয়া এগিয়ে এসে তার চোখের দিকে তাকাল।
“আমি তোমার সাথে যেতে চাই… তোমার দেশে।”
এই কথাটা যেন বজ্রপাতের মতো আঘাত করল কুদ্দুছের বুকে।
“তুমি বুঝতেছো কী বলতেছো?” কুদ্দুছ প্রায় ফিসফিস করে বলল,
“এটা সম্ভব না… এটা একপ্রকার আত্মহত্যা!”
তার চোখে তখন ভেসে উঠছিল হাজারো ভয়—আইন, সমাজ, প্রতিশোধ… আর নিজের অসহায় পরিবার।
নাদিয়া হালকা কেঁপে উঠল, কিন্তু পিছিয়ে গেল না।
“আমি প্রতিদিন একটু একটু করে মরছি,” সে বলল,
“এই প্রাসাদের ভেতরে আমি বেঁচে নেই, কুদ্দুছ… আমি শুধু একটা ছায়া।”
কুদ্দুছ চুপ করে গেল। তার ভেতরে তখন তুমুল ঝড়। একদিকে যুক্তি, ভয়, বাস্তবতা… আর অন্যদিকে দাঁড়িয়ে আছে নাদিয়ার চোখের জল।
“তুমি জানো না, এই সিদ্ধান্তের মানে কী,” কুদ্দুছ আবার বলল,
“তোমার স্বামী… এই দেশের আইন… তারা আমাদের ছেড়ে দিবে না।”
নাদিয়া হঠাৎ তার হাত চেপে ধরল।
“তাহলে কি আমি সারা জীবন এভাবেই কাটাব? একটা সোনার খাঁচায় বন্দি পাখির মতো?”
তার চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া অশ্রু যেন আগুন হয়ে লাগছিল কুদ্দুছের হৃদয়ে।
সেই মুহূর্তে কুদ্দুছ বুঝল—সে আর নিরপেক্ষ থাকতে পারবে না।
তার সমস্ত যুক্তি, সমস্ত ভয় ধীরে ধীরে ভেঙে পড়তে লাগল।
সেদিন রাতে কুদ্দুছ ঘুমাতে পারেনি। বিছানায় শুয়ে সে ভাবছিল—তার মা এখন হয়তো গ্রামের বাড়িতে বসে তার জন্য দোয়া করছে। ছোট বোনটা হয়তো নতুন জামার জন্য অপেক্ষা করছে, ভাইটা হয়তো তার মতোই একদিন বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে।
আর সে?
সে কি তাদের সব স্বপ্ন ভেঙে দিতে যাচ্ছে?
অন্যদিকে নাদিয়াও নিজের ঘরে বসে ছিল নিঃশব্দে। চারপাশে ঝলমলে আলো, দামি আসবাব—সবকিছুই আজ তার কাছে শূন্য মনে হচ্ছিল।
তার মনে হচ্ছিল, এই জীবনটা তার নয়।
“আমি কি ভুল করছি?” সে নিজেকেই প্রশ্ন করল।
কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়ল কুদ্দুছের চোখ—সেই সরলতা, সেই মায়া… যেটা সে কখনও তার স্বামীর চোখে দেখেনি।
পরদিন তারা আবার দেখা করল।
আজ দুজনেই চুপ। কথার বদলে চোখেই যেন সব কথা হয়ে যাচ্ছে।
অনেকক্ষণ নীরবতার পর কুদ্দুছ ধীরে বলল,
“তুমি যদি যাও, ফিরে আসার পথ থাকব না।”
নাদিয়া শান্ত গলায় বলল,
“আমি ফিরে আসতে চাই না।”
এই একটা বাক্য যেন সব দ্বিধা ভেঙে দিল।
কুদ্দুছ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“ঠিক আছে,” সে বলল,
“আমরা যাব।”
নাদিয়ার চোখে তখন একসাথে জল আর আলো—ভয় আর স্বস্তির অদ্ভুত মিশ্রণ।
কিন্তু এই সিদ্ধান্ত ছিল সহজ নয়।
তারা বুঝতে পারছিল, এটা শুধু পালিয়ে যাওয়া নয়—এটা একটা যুদ্ধের শুরু।
পরবর্তী কয়েকদিন তারা খুব সাবধানে সবকিছু পরিকল্পনা করতে লাগল। কখন বের হবে, কীভাবে যাবে, কোথায় লুকাবে—সবকিছুই অনিশ্চিত, তবুও একটা পথ খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা।
কুদ্দুছ তার সামান্য জমানো টাকা গুছিয়ে রাখল। নাদিয়া নিজের কিছু গয়না আর নগদ টাকা লুকিয়ে রাখল।
প্রতিটা মুহূর্তে ভয় কাজ করছিল—কেউ যদি জেনে যায়?
একদিন রাতে, হঠাৎ প্রাসাদে অস্বাভাবিক কড়াকড়ি শুরু হলো। নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে, নতুন কিছু লোক এসেছে।
কুদ্দুছের বুক ধড়ফড় করে উঠল।
“তারা কি কিছু বুঝে ফেলেছে?” তার মনে প্রশ্ন জাগল।
নাদিয়াও আতঙ্কিত হয়ে পড়ল।
“আমাদের তাড়াতাড়ি করতে হবে,” সে বলল।
অবশেষে সেই রাত এল।
চাঁদহীন অন্ধকার রাত। চারপাশে অদ্ভুত নীরবতা।
কুদ্দুছ আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিল সবকিছু। প্রাসাদের পেছনের এক পুরনো গেট—যেটা খুব কম ব্যবহার করা হয়—সেখান দিয়েই বের হবে তারা।
নাদিয়া নিঃশব্দে তার ঘর থেকে বের হলো। আজ তার গায়ে কোনো দামি পোশাক নেই—একটা সাধারণ পোশাক, যেন সে নিজেকে নতুন করে খুঁজে পেতে চায়।
গেটের কাছে এসে দাঁড়াতেই কুদ্দুছ তাকে দেখল।
কয়েক সেকেন্ড তারা শুধু একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল।
এই দৃষ্টিতে ছিল হাজারো প্রশ্ন, হাজারো ভয়, আর এক গভীর ভালোবাসা।
“চলো,” কুদ্দুছ ফিসফিস করে বলল।
তারা ধীরে ধীরে অন্ধকারে পা বাড়াল।
ঠিক সেই মুহূর্তে, দূরে কোথাও একটা শব্দ হলো—কেউ যেন হাঁটছে।
দুজনেই থেমে গেল।
কুদ্দুছের হাত শক্ত হয়ে উঠল।
“দ্রুত,” সে বলল।
তারা দৌড়াতে শুরু করল।
পেছনে ফেলে এল এক বিশাল প্রাসাদ, এক বিলাসবহুল জীবন… আর সামনে অপেক্ষা করছে এক অজানা ভবিষ্যৎ।
কিন্তু তারা জানত না—এই পথ শুধু ভালোবাসার নয়, এই পথ রক্ত, অশ্রু আর ত্যাগের।
হয়তো এই সিদ্ধান্ত তাদের এক করবে,
অথবা চিরদিনের জন্য আলাদা করে দেবে।
কারণ কিছু ভালোবাসা এমন হয়—
যেখানে একসাথে থাকার চেয়েও বড় হয়ে ওঠে তার মূল্য।
আর সেই মূল্য অনেক সময় জীবন দিয়েও শোধ করতে হয়।
(চলবে…)