ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬,
সময়: ০৯:৫০:৩৭ PM

গল্প:অপেক্ষার আলো

মান্নান মারুফ
30-04-2026 08:25:10 PM
গল্প:অপেক্ষার আলো

কুদ্দুস মিয়ার বয়স পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই। ছোটবেলা থেকে সে এই গ্রামের মাটিতেই বড় হয়েছে। গ্রামের নাম রঘুনাথপুর, ধানের খেত আর সরু কাঁচা রাস্তার ভেতর দিয়ে হারিয়ে যাওয়া এক শান্ত জনপদ। কিন্তু মানুষের মন আর আগের মতো শান্ত নেই—কুদ্দুস সেটা টের পায় প্রতিদিন। সন্ধ্যার পর চায়ের দোকানে বসে থাকা তার পুরোনো অভ্যাস। এক কাপ লাল চা, সঙ্গে দুটো বিস্কুট—এই সামান্যতেই তার সুখ ছিল একসময়। কিন্তু এখন সেই চায়ের দোকানই যেন হয়ে উঠেছে উত্তপ্ত কথার মঞ্চ। রাজনীতি ছাড়া আর কোনো কথা নেই। কেউ কাউকে ছাড় দেয় না, যেন কথার আঘাতে জিতে গেলেই দেশের মঙ্গল হবে।

কুদ্দুস চুপচাপ বসে থাকে। তার পাশে বসে থাকা রহিম বলে ওঠে,
—“দেখছো কুদ্দুস ভাই, আবার শুরু হইছে। এই দল ওই দলরে রাজাকার কয়, ওই দল এই দলরে জঙ্গি কয়। কবে শেষ হইবো এইসব?”

কুদ্দুস দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
—“শেষ হইবো যখন মানুষ বুঝবো—দেশ আগে, দল পরে।”

কথাটা বললেও সে জানে, বাস্তবটা এত সহজ নয়।

কুদ্দুসের বাবা ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। তিনি প্রায়ই বলতেন, “দেশটা আমরা স্বাধীন করছি মানুষের জন্য, কোনো দলের জন্য না।” সেই কথাগুলো এখনো কুদ্দুসের কানে বাজে।

ছোটবেলায় সে দেখেছে, মানুষ একে অপরের পাশে দাঁড়াতো। নির্বাচন মানে উৎসব ছিল। ভোট দিতে গিয়ে মানুষ নতুন কাপড় পরতো, মুখে হাসি থাকতো। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই দৃশ্য বদলে গেছে।

গত অনেক বছর ধরে কুদ্দুস দেখেছে—ভোটের আগেই ফল ঠিক হয়ে যায়। মানুষ ভোট দিতে যায়, কিন্তু মনে বিশ্বাস থাকে না। রাজনীতি হয়ে গেছে দোষারোপের খেলা। সংসদে যারা কথা বলবে দেশের উন্নয়ন নিয়ে, তারা ব্যস্ত থাকে একে অপরকে ছোট করতে।

কুদ্দুসের ছেলে রাশেদ একদিন বলেছিল,
—“আব্বা, এই দেশে কিছু হবে না। আমি বিদেশ চলে যাবো।”

কুদ্দুস চুপ করে ছিল। সে জানে, এই কথার পেছনে আছে হতাশা, ক্ষোভ, আর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয়।

একসময় হঠাৎ করেই দেশে এক বড় পরিবর্তন আসে। মানুষ আবার কথা বলতে শুরু করে, ভোটের অধিকার ফিরে পাওয়ার কথা ওঠে। চারদিকে নতুন আশার বাতাস।

কুদ্দুসের চোখে তখন নতুন আলো। সে ভাবে—“হয়তো এবার কিছু বদলাবে।”

গ্রামের স্কুল শিক্ষক মিজান সাহেব একদিন বললেন,
—“দেখেন কুদ্দুস ভাই, পরিবর্তন আসছে ঠিকই, কিন্তু আমাদের মানসিকতা না বদলালে কিছুই বদলাবে না।”

কুদ্দুস মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। সে বুঝতে পারে, শুধু সরকার বদলালে হবে না—মানুষের চিন্তাও বদলাতে হবে।

কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই আবার সেই পুরোনো চিত্র ফিরে আসে। এবার শুধু সভা-সমাবেশ বা সংসদে নয়—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শুরু হয় কাদা ছোড়াছুড়ি।

ফেসবুকে প্রতিদিন নতুন নতুন পোস্ট—অশ্লীল কার্টুন, কটু কথা, অপমানজনক মন্তব্য। কেউ কাউকে সম্মান করে না।

রাশেদ একদিন ফোনে দেখাচ্ছিল,
—“দেখেন আব্বা, এরা কি লিখতেছে! এরা কি দেশের ভালো চায়?”

কুদ্দুসের মন খারাপ হয়ে যায়।
—“মুক্ত মত প্রকাশ ভালো, কিন্তু যদি সেটা মানুষের মধ্যে ঘৃণা বাড়ায়, হিংসা বাড়ায়,গন্ডগোল উচকে দেয়। তাহলে সেটা স্বাধীনতা না, সেটা ধ্বংস।”

এই উত্তপ্ত পরিবেশ আস্তে আস্তে গ্রামের মানুষদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। আগে যারা একসঙ্গে ঈদ করতো, বিয়ে-শাদিতে যেতো, এখন তারা দুই দলে ভাগ হয়ে গেছে।

একদিন কুদ্দুস দেখলো, তার দুই প্রতিবেশী—করিম আর সালাম—মারামারিতে জড়িয়ে গেছে। কারণ? তারা দুই ভিন্ন রাজনৈতিক মতের সমর্থক।

কুদ্দুস ছুটে গিয়ে তাদের থামায়।
—“তোমরা কি পাগল হইছো? এতদিনের সম্পর্ক নষ্ট করতেছো কিসের জন্য?”

করিম রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলে,
—“ওরা দেশের শত্রু!”

সালামও চিৎকার করে,
—“তোমরাই শত্রু!”

কুদ্দুস বুঝতে পারে—এটা শুধু মতের বিরোধ না, এটা এক গভীর বিভাজন।

সেই রাতটা ছিল অদ্ভুত। ঝুম বৃষ্টি হচ্ছিল। কুদ্দুস ঘরে বসে ছিল, হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ।

দরজা খুলে দেখে, করিম দাঁড়িয়ে আছে। ভেজা শরীর, চোখে ভয়।

—“ভাই, সালামের ছেলে অসুস্থ। হাসপাতালে নিতে হবে। কিন্তু কেউ গাড়ি দিতেছে না...”

কুদ্দুস এক মুহূর্ত দেরি করলো না।
—“চল, আমি যাই।”

তারা দুজন মিলে সালামের ছেলেকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেই মুহূর্তে কোনো রাজনীতি ছিল না, কোনো বিভাজন ছিল না—ছিল শুধু মানুষ আর মানুষের পাশে দাঁড়ানোর দায়িত্ব।

হাসপাতালের বারান্দায় দাঁড়িয়ে সালাম কুদ্দুসের দিকে তাকিয়ে বলে,
—“ভাই, আমরা ভুল করছি না?”

কুদ্দুস ধীরে বলে,
—“আমরা সবাই ভুল করছি, যখন আমরা মানুষকে ভুলে যাই।”

সেই ঘটনার পর গ্রামে একটা পরিবর্তন আসে। মানুষ বুঝতে শুরু করে—রাজনীতি যদি মানুষকে ভাঙে, তাহলে সেটা কোনো ভালো রাজনীতি না।

কুদ্দুস চায়ের দোকানে বসে একদিন বললো,
—“আমরা যদি নিজেরাই নিজেদের শত্রু বানাই, তাহলে দেশের আর কোন শত্রু লাগবে কেন?” নিজেরা নিজেরাই মারামারি করবো।

সবাই চুপ করে শুনছিল।

মিজান সাহেব বললেন,
—“আমাদের উচিত প্রশ্ন করা—আমরা কি দেশের জন্য কাজ করছি, না শুধু দলের জন্য?”

ধীরে ধীরে গ্রামে একটা উদ্যোগ নেয়া হয়। সবাই মিলে ঠিক করে—রাজনীতি থাকবে, মতভেদ থাকবে, কিন্তু সেটা যেন সম্পর্ক নষ্ট না করে।

স্কুলে আলোচনা সভা হয়—দেশপ্রেম, দায়িত্ব, নাগরিক সচেতনতা নিয়ে। তরুণরা এগিয়ে আসে।

রাশেদও বদলাতে শুরু করে। সে বলে,
—“আমি বিদেশে যামু না। আমি এই দেশেই কিছু করতে চাই।”

কুদ্দুসের চোখ ভিজে ওঠে।

একদিন ভোরে কুদ্দুস মাঠে হাঁটতে বের হয়। সূর্য উঠছে, চারদিকে সোনালি আলো।

সে মনে মনে ভাবে—“দেশটা এখনো বাঁচে আছে, কারণ মানুষের ভেতরে এখনো ভালোবাসা আছে।”

সে জানে, সমস্যাগুলো একদিনে শেষ হবে না। কিন্তু যদি মানুষ চায়, তাহলে পরিবর্তন সম্ভব।

দেশটা কোনো এক দলের না, কোনো এক ব্যক্তির না—এই দেশ সবার। এই দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে মানুষের ওপর, তাদের চিন্তা, তাদের আচরণ, তাদের ঐক্যের ওপর।

কুদ্দুস মিয়া এখনো প্রতিদিন চায়ের দোকানে যায়। কিন্তু এখন সেখানে শুধু রাজনীতি না—আলোচনা হয় কৃষি নিয়ে, শিক্ষা নিয়ে, ভবিষ্যৎ নিয়ে।

আর মাঝে মাঝে সে চুপ করে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে—
“এই দেশ ভালো হবেই… যদি আমরা চাই।” আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকি। অন্যজনকে সম্মান দিতে পারি।

সমাপ্ত।।