ভবঘুরে কুদ্দুছের জীবনে ভালোবাসা এসেছিল খুব নিঃশব্দে—যেন ভোরের কুয়াশার মতো, ধীরে ধীরে চারপাশ ঢেকে ফেলে, অথচ কেউ টেরই পায় নি কখন যে তার ভেতরটা গ্রাস করে ফেলেছে মিনা। কুদ্দুছ ছোটবেলা থেকেই অন্যরকম ছিল। গ্রামের অন্য ছেলে মেয়েরা যখন স্কুলের বই হাতে নিয়ে হাঁটত, সে তখন কাঁধে কোদাল তুলে মাঠের দিকে যেত। পড়ালেখার প্রতি তার কোনো টান ছিল না—বরং মাটির গন্ধ, ভোরের শিশির, আর সবুজ ফসলের মাঝেই সে খুঁজে পেত নিজের জীবন। মা-বাবার সাথে কাজ করতেই সে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। সকালে সূর্য ওঠার আগেই সে মরিচ গাছে পানি দিত, পাতায় জমে থাকা শিশিরের ফোঁটা তার হাতে লেগে ঠান্ডা অনুভূতি ছিল প্রান। আর বিকেলে সে সেই মরিচ গাছ পাহারা দিত—পাখি কিংবা ছাগল যেন ফসল নষ্ট না করে।
মাঠের ঠিক পাশেই ছিল তার তরমুজের খেত। সেই খেতেই প্রথম দেখেছিল মিনাকে।
মিনা—নামের মতোই কোমল, আর রূপে যেন এক টুকরো চাঁদ। সে-ও মাঠে কাজ করত, তার বাবার সাথে। প্রথম দিকে শুধু চোখাচোখি হতো। কুদ্দুছ দূর থেকে তাকিয়ে থাকত, আর মিনা মাঝে মাঝে লাজুক হেসে চোখ নামিয়ে নিত। কথার শুরুটা খুব সাধারণ ছিল—
“তোমার তরমুজগুলো খুব বড় হয়েছে,” একদিন বলেছিল মিনা।
কুদ্দুছ একটু লজ্জা পেয়ে মাথা চুলকে বলেছিল, “হ্যাঁ… পানি ঠিকমতো দেই তো।”
এরপর ধীরে ধীরে কথার পরিধি বাড়তে থাকে। কখনো আবহাওয়া নিয়ে, কখনো ফসল নিয়ে, কখনো আবার একেবারে অকারণেই। সেই অকারণ কথাগুলোই একদিন কারণ হয়ে দাঁড়ায় তাদের সম্পর্কের গভীরতার।
সময় গড়াতে থাকে, আর তাদের ভালোবাসা শিকড় গাঁথে মাটির গভীরে। দুজনেই বুঝতে পারে—এটা শুধু ভালো লাগা নয়, এর চেয়েও অনেক বেশি কিছু। কুদ্দুছের চোখে মিনা ছিল তার পুরো পৃথিবী, আর মিনার হাসিতে সে খুঁজে পেত জীবনের সব সুখ।
গ্রামের মানুষজনও ধীরে ধীরে বিষয়টা বুঝতে শুরু করে। কেউ কেউ মজা করত, কেউ আবার আড়ালে সমালোচনা করত। কিন্তু কুদ্দুছ আর মিনার কাছে এসবের কোনো গুরুত্ব ছিল না। তারা নিজেদের মতো করেই একটা স্বপ্নের জগৎ গড়ে তুলেছিল।
তাদের ভালোবাসা যেন লাইলী-মজনুর গল্পের মতো—অটুট, নির্ভেজাল, আর অদম্য।
কিন্তু বাস্তবতা কখনোই গল্পের মতো সহজ হয় না।
মিনা দেখতে এতটাই সুন্দর ছিল যে, গ্রামের অনেক যুবকই তাকে পছন্দ করত। প্রস্তাবের অভাব ছিল না। মিনার বাবা-মাও চিন্তায় পড়ে যান—মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা দ্বিধায় ছিলেন। কুদ্দুছের কোনো স্থায়ী আয় নেই, পড়াশোনা নেই, ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা নেই। শুধু ভালোবাসা দিয়ে কি সংসার চলে?
ঠিক সেই সময়েই বিদেশ ফেরত মালেকের আগমন।
মালেক শহরে থাকত, বিদেশে কাজ করত, ভালো টাকা উপার্জন করত। তার পরিবার ছিল অবস্থাসম্পন্ন। মিনার বাবার কাছে সে যেন এক স্বপ্নের পাত্র।
একদিন হঠাৎ করেই খবর ছড়িয়ে পড়ে—মিনার বিয়ে ঠিক হয়েছে।
কুদ্দুছ প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারেনি। সে দৌড়ে যায় মিনার বাড়ির দিকে, কিন্তু দূর থেকে দেখে বাড়িতে উৎসবের প্রস্তুতি চলছে। তার বুকের ভেতরটা যেন হঠাৎ করে ফাঁকা হয়ে যায়।
পরের দিন বিকেলে, শেষবারের মতো দেখা হয় তাদের।
মিনা কাঁদছিল।
“আমি কিছু করতে পারলাম না,” সে বলেছিল, কাঁপা গলায়।
কুদ্দুছ কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল। তারপর খুব আস্তে বলেছিল—
“তোমাকে পাওয়া হবে না জেনেও ভালবেসেছি
তবুও একটু খানি আশায়
নীরবে পথ চেয়ে বসে আছি…”
মিনা চোখ তুলে তাকিয়েছিল। সেই চোখে ছিল হাজারটা অপ্রকাশিত কথা, অগণিত কান্না, আর এক অদ্ভুত অসহায়ত্ব।
“আমাকে ভুলে যেও,” বলেছিল মিনা।
কুদ্দুছ মাথা নাড়ে।
“ভুলতে পারব না,” সে বলেছিল, “কারণ তুমি শুধু আমার ভালোবাসা না… তুমি আমার জীবন।”
বিয়ের দিন কুদ্দুছ দূর থেকে সব দেখেছিল। লাল শাড়িতে সজ্জিত মিনা, তার পাশে দাঁড়ানো মালেক—সবকিছু যেন এক দুঃস্বপ্নের মতো লাগছিল।
সেই রাতেই কুদ্দুছের ভেতর কিছু একটা ভেঙে যায়।
তারপর থেকে সে আর আগের মতো নেই।
মানুষ তাকে এখন ভবঘুরে বলে ডাকে। সে আর ঠিকমতো কাজ করে না, তরমুজের খেত শুকিয়ে গেছে, মরিচ গাছগুলোও আর আগের মতো সবুজ নয়। তার দিন কাটে গ্রামের পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে, কখনো নদীর পাড়ে বসে, কখনো মাঠের মাঝে দাঁড়িয়ে।
কিন্তু একটা জিনিস বদলায়নি—তার অপেক্ষা।
সে এখনও বিয়ে করেনি। গ্রামের লোকজন অনেকবার চেষ্টা করেছে তাকে বোঝাতে, কিন্তু সে শুধু হাসে।
“সে একদিন আসবে,” কুদ্দুছ বলে।
“কে?” কেউ জিজ্ঞেস করলে সে উত্তর দেয়—
“মিনা।”
বছর কেটে যায়।
ঋতু বদলায়, মানুষ বদলায়, গ্রামের চেহারাও বদলে যায়। কিন্তু কুদ্দুছের অপেক্ষা বদলায় না।
প্রতিদিন সকালে সে এখনও মরিচ গাছের কাছে যায়—যদিও এখন সেখানে আর তেমন কিছু নেই। বিকেলে সে তরমুজের খেতের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে, যেন কোনো এক মুহূর্তে মিনা হেঁটে আসবে।
রাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে সে ফিসফিস করে—
“তুমি কি আমাকে মনে করো, মিনা?”
তার চোখে তখন জল জমে, কিন্তু সে কাঁদে না। কান্না যেন তার ভেতরেই জমে থাকে, জমাট বেঁধে।
একদিন গ্রামের একজন তাকে বলেছিল, “মিনা তো সুখেই আছে, তুমি কেন নিজেকে কষ্ট দিচ্ছ?”
কুদ্দুছ মৃদু হেসে বলেছিল—
“ভালোবাসা মানে পাওয়া না… ভালোবাসা মানে অপেক্ষা করা।”
কখনো কখনো সে সেই পুরোনো লাইনগুলো আবার বলে—
“তোমাকে পাওয়া হবে না জেনেও ভালবেসেছি
তবুও একটু খানি আশায়
নীরবে পথ চেয়ে বসে আছি…”
এই লাইনগুলোই যেন তার জীবনের সারাংশ হয়ে গেছে।
কুদ্দুছ জানে—হয়তো মিনা আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। হয়তো সে এখন অন্য কারো সংসারে, অন্য জীবনে অভ্যস্ত হয়ে গেছে।
তবুও তার বিশ্বাস, ভালোবাসা কখনো মরে না।
কোনো একদিন, কোনো এক বিকেলে, হয়তো হঠাৎ করেই মিনা এসে দাঁড়াবে তার সামনে। হয়তো বলবে—“আমি ফিরে এসেছি।”
এই আশাতেই বেঁচে আছে কুদ্দুছ।
এই আশাতেই তার প্রতিটি দিন শুরু হয়, আর শেষ হয়।
ভালোবাসার এই নীরব যন্ত্রণা, এই না-পাওয়ার কষ্ট—এটাই এখন তার সঙ্গী।
কেউ দেখে না, কেউ বোঝে না—কিন্তু তার ভেতরে প্রতিদিন এক নতুন গল্প লেখা হয়, এক নতুন কষ্ট জন্ম নেয়।
তবুও সে অপেক্ষা করে।
কারণ সে ভালোবাসে।
আর ভালোবাসা কখনো হারায় না—শুধু রয়ে যায়, গভীরে, নিঃশব্দে, এক অন্তহীন অপেক্ষার মতো।
সমাপ্ত।।