আজ ১ মে—মে দিবস। শহরের বড় বড় রাস্তায় ব্যানার ঝুলছে, মাইক বেজে উঠছে শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে নানা স্লোগানে। টেলিভিশনে চলছে আলোচনা, বক্তৃতা, প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি। কিন্তু এই সব কিছুর বাইরে, শহরের এক কোণের ভাঙাচোরা বস্তিতে বসে কুদ্দুছ আর মর্জিনার জীবনে আজকের দিনটি আর দশটা দিনের মতোই সাধারণ।
সকালটা শুরু হয়েছিল ভোরের আলো ফোটার আগেই।
মর্জিনা তখনো আধো ঘুমে। কিন্তু ঘুম তার বিলাসিতা নয়। পাশের খাটিয়ায় শুয়ে থাকা কুদ্দুছের মুখের দিকে একবার তাকিয়ে নিঃশব্দে উঠে পড়ে সে। ঘরের এক কোণে রাখা কলস থেকে পানি নিয়ে মুখ ধোয়, তারপর চুল বেঁধে নেয় তাড়াহুড়ো করে।
চুলার আগুন ধরাতে ধরাতে তার মনে পড়ে যায়—আজ নাকি মে দিবস।
গতকাল পাশের বাড়ির রোজিনা বলছিল, “এই দিনটা নাকি শ্রমিকদের জন্য পালন করা হয়।”
মর্জিনা একটু থেমে গিয়েছিল তখন। মনে মনে প্রশ্ন জেগেছিল—
“আমাদের জন্য যদি হয়, তাহলে আমরা কি একটু বিশ্রাম পাবো না?”
কিন্তু সে প্রশ্ন কার কাছে করবে?
চুলায় ভাত বসাতে বসাতে সে কুদ্দুছকে ডাকে,
“এই শোনো, উঠবা না? দেরি হয়ে যাবে।”
কুদ্দুছ কেমন যেন ক্লান্ত গলায় বলে,
“আর পাঁচ মিনিটৃ”
কিন্তু সেই পাঁচ মিনিট তাদের জীবনের বিলাসিতা। কাজ না করলে ভাত জুটবে না—এই বাস্তবতা তাদের ঘুমের চেয়েও বড়।
অবশেষে কুদ্দুছ উঠে পড়ে। চোখে মুখে ক্লান্তির ছাপ। গতকাল রাতেও সে দেরি করে ফিরেছে—ইটভাটার কাজ শেষ হতে সময় লেগেছে বেশি।
মর্জিনা তার সামনে গরম ভাত আর ডাল বাড়িয়ে দেয়।
“খাও, ঠান্ডা হয়ে যাবে।”
কুদ্দুছ খেতে খেতে চুপ করে থাকে। কথা বলার মতো শক্তি যেন নেই তার।
মর্জিনা একটু ইতস্তত করে বলে,
“শোনো, আজ নাকি মে দিবসৃ আমাদের জন্য নাকি এই দিবস।”
কুদ্দুছ থেমে তাকায় তার দিকে। চোখে কোনো বিস্ময় নেই, শুধু ক্লান্ত এক হাসি।
“হয়তো।”
“তাহলে আমাদের কাজ করতে হবে কেন?”
মর্জিনার কণ্ঠে সরল প্রশ্ন।
কুদ্দুছ কিছু বলে না। শুধু মাথা নিচু করে খেতে থাকে।
এই নীরবতাই যেন তার উত্তর।
সকাল গড়িয়ে দুপুর।
মর্জিনা এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে কাজ করে বেড়ায়। কারো বাসন মাজে, কারো ঘর ঝাড়ু দেয়, কারো কাপড় ধোয়। প্রতিটি বাড়িতে তার আলাদা আলাদা পরিচয়—কোথাও “মর্জিনা”, কোথাও “ওই মেয়ে”, কোথাও “ঝি” কোথাও ”ভুয়া”।
কিন্তু কোথাও সে মানুষ নয়।
এক বাড়িওয়ালার বউ বলে,
“এই মর্জিনা, ভালো করে ঘষে মাজো, দাগ রয়ে গেছে।”
আরেক বাড়িতে প্রশ্ন ,
“আজ দেরি করেছো কেন?”
মর্জিনা মাথা নিচু করে সব সহ্য করে। কারণ সে জানে—এই কাজটাই তার বেঁচে থাকার একমাত্র ভরসা।
কিন্তু তার মনের ভেতরে আজ একটা প্রশ্ন বারবার ঘুরছে—
“আমাদের জন্য যদি দিবস হয়, তাহলে আমরা এত কষ্ট করি কেন?”
অন্যদিকে কুদ্দুছ ইটভাটায় কাজ করছে।
রোদে পুড়ে তার শরীর কালো হয়ে গেছে। হাতের তালু শক্ত হয়ে গেছে ইট তুলতে তুলতে। ঘাম তার গায়ে শুকিয়ে সাদা দাগ ফেলেছে শরীরে।
পাশে কাজ করা এক শ্রমিক বলে,
“আজ নাকি আমাদের দিবস!”
কুদ্দুছ হেসে বলে,
“তাই নাকি? তাহলে আজ কাজ বন্ধ থাকার কথা।”
সবাই একটু হেসে নেয়। সেই হাসিতে ব্যঙ্গ আছে, ক্লান্তি আছে, আর আছে বাস্তবতার নির্মমতা।
কাজ থামে না।
দুপুরের খাবার বলতে শুকনো রুটি আর একটু লবণ। তবু তারা খায়—কারণ খেতে হবে বাঁচার জন্য।
সন্ধ্যার পর।
মর্জিনা ক্লান্ত শরীরে ঘরে ফেরে। পা যেন আর চলে না। কিন্তু ঘরে ঢুকেই আবার কাজ—রান্না করতে হবে।
কুদ্দুছ তখনো ফেরেনি।
চুলায় আগুন ধরাতে ধরাতে তার মনে পড়ে যায় সকালে করা প্রশ্নটা।
হঠাৎ তার চোখে পানি চলে আসে।
সে নিজেই বুঝতে পারে না কেন কাঁদছে।
হয়তো ক্লান্তিতে।
হয়তো অপমানে।
হয়তো অজানা কোনো বেদনায়।
কুদ্দুছ ফিরে আসে রাত একটু বাড়লে।
তার মুখে আজ আরও বেশি ক্লান্তি।
মর্জিনা তাড়াতাড়ি পানি দেয়,
“হাত-মুখ ধুয়ে নাও।”
তারপর খাবার সামনে দেয়।
কুদ্দুছ খেতে বসে। কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পর মর্জিনা আবার বলে—
“শোনো, আজকের দিনটা যদি আমাদের জন্য হয়, তাহলে আমাদের জীবন বদলায় না কেন?”
কুদ্দুছ এবার খাওয়া থামিয়ে তাকায় তার দিকে।
অনেকক্ষণ চুপ করে থাকে।
তারপর ধীরে ধীরে বলে,
“আমাদের জন্য দিবস হয়ৃ কিন্তু আমাদের বাচাঁর জন্য কিছু হয় না।”
মর্জিনা চুপ করে যায়।
কথাটা খুব সহজ, কিন্তু তার ভেতরে কত গভীর কষ্ট লুকিয়ে আছে!
রাত গভীর হয়।
কাজ শেষ করে মর্জিনা কুদ্দুছের পাশে বসে।
তার ক্লান্ত হাত দিয়ে কুদ্দুছের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।
“খুব কষ্ট হয় না তোমার?”
কুদ্দুছ চোখ বন্ধ করে বলে,
“হয়ৃ কিন্তু তোমার কথা ভাবলে মনে হয় সব ঠিক হয়ে যাবে।”
মর্জিনা একটু হেসে বলে,
“আমার কথা ভাবলে?”
“হ্যাৃঁ তুমি আছো বলেই তো বেঁচে আছি।”
এই কথাটা শুনে মর্জিনার চোখে আবার পানি আসে।
কিন্তু এবার সেই পানি দুঃখের নয়—ভালোবাসার।
মর্জিনা সারাদিন অন্যের বাড়িতে কাজ করে, অপমান সহ্য করে, ক্লান্ত শরীরে ঘরে ফিরে আবার রান্না করে, তারপর কুদ্দুছের যত্ন নেয়।
কিন্তু কেউ তার পাশে দাঁড়ায় না।
কেউ তাকে “শ্রমিক দিবসের নায়িকা” বলে না।
কেউ তার কষ্ট দেখে না।
কিন্তু কুদ্দুছ দেখে।
আর সেই দেখাটাই তার কাছে সবচেয়ে বড় পাওয়া।
রাতের নিস্তব্ধতায় কুদ্দুছ ভাবে—
এই মেয়েটা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করে, তবুও মুখে কোনো অভিযোগ নেই। তার নিজের কষ্ট ভুলে সে অন্যের জন্য বাঁচে।
এটাই কি ভালোবাসা?
হ্যাঁ, এটাই।
নিঃস্বার্থ, নির্ভেজাল, নিঃশব্দ ভালোবাসা।
মর্জিনা হঠাৎ বলে,
“শোনো, একদিন কি আমরা একটু ভালো থাকবো?”
কুদ্দুছ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে,
“জানি নাৃ কিন্তু চেষ্টা করবো।”
“আমাদেরও কি একটা ছোট ঘর হবে? যেখানে কেউ বকবে না?”
কুদ্দুছ মৃদু হেসে বলে,
“হবেৃ একদিন হবে।”
সে জানে—এই স্বপ্নটা খুব বড়।
কিন্তু স্বপ্ন ছাড়া মানুষ বাঁচে কিভাবে?
বাইরে তখনো কোথাও কোথাও মাইক বাজছে—
“শ্রমিকের অধিকার চাই!”
কিন্তু সেই শব্দ এই ছোট্ট ঘরে পৌঁছায় না।
এখানে শুধু দুজন মানুষের নিঃশব্দ ভালোবাসা।
মর্জিনা কুদ্দুছের কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ে।
তার মুখে ক্লান্তির ছাপ, কিন্তু তবুও শান্তি আছে।
কুদ্দুছ তাকিয়ে থাকে তার দিকে।
ভাবতে থাকে—
“এই মেয়েটার জন্য কিছু করতে পারলাম নাৃ”
তার চোখে পানি আসে।
কিন্তু সে তা মুছে ফেলে।
কারণ কান্নার সময় নেই।
আগামীকাল আবার কাজ আছে।
১ মে—মে দিবস।
সারা পৃথিবী শ্রমিকদের সম্মান জানায়।
কিন্তু মর্জিনা আর কুদ্দুছের জীবনে এই দিনটা শুধু আরেকটা দিন।
তবুও—
এই দিনের মাঝেই জন্ম নেয় এক নিঃস্বার্থ ভালোবাসার গল্প।
যেখানে কোনো দাবি নেই, কোনো অভিযোগ নেই—
শুধু আছে একে অপরকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার চেষ্টা।
শেষ।