পর্ব – ১
“অচেনা থেকে অনেক আপন নেহা”
হঠাৎ একদিন তুমি এলে নীরব বিকেলের মতো,
কোনো শব্দ না করেই ছুঁয়ে গেলে হৃদয়ের যত ক্ষত।
নেহা ছিল অচেনা, চেনা ছিলে না, তবুও কেন যেন মনে হলো—
এই অচেনাতেই লুকিয়ে আছে চেনা কোনো অনুভূতির গভীর ছায়া।
শহরের বিকেলগুলো সবসময়ই অদ্ভুত রকমের নিঃসঙ্গ হয়। রোদটা তখন আর তেমন তীব্র থাকে না, আবার পুরোপুরি নরমও নয়। ঠিক তেমনই ছিল আরিয়ানের জীবন—অর্ধেক আলো, অর্ধেক অন্ধকারে মোড়া।
আরিয়ান ছিল একা থাকতে অভ্যস্ত মানুষ। ছোটবেলা থেকেই জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাত তাকে শিখিয়ে দিয়েছিল, কারও ওপর ভরসা করা মানেই একদিন না একদিন ভেঙে পড়া। তাই সে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিল নিজের মধ্যেই। বই, এক কাপ কফি, আর বারান্দার কোণে বসে আকাশ দেখা—এই ছিল তার একমাত্র সঙ্গী।
সেদিনও ঠিক তেমনই এক বিকেল ছিল।
আকাশে হালকা মেঘ, বাতাসে অদ্ভুত এক শীতলতা। আরিয়ান তার পুরোনো কাঠের চেয়ারটায় বসে ছিল, হাতে একটা বই, কিন্তু মনটা কোথাও যেন আটকে ছিল। বইয়ের পাতাগুলো উল্টাচ্ছিল, কিন্তু শব্দগুলো তার মনে ঢুকছিল না।
ঠিক তখনই দরজায় একটা হালকা টোকা।
প্রথমে সে ভাবল, হয়তো ভুল শুনেছে। আবার টোকা পড়ল—এবার একটু স্পষ্ট।
“কে?”—কিছুটা বিরক্তি নিয়ে জিজ্ঞেস করল সে।
বাইর থেকে নরম একটা কণ্ঠ ভেসে এল—
“আমি… নেহা। পাশের বাসায় নতুন এসেছি।”
নামটা শুনেই কেন জানি না, আরিয়ানের বুকের ভেতরটা কেমন যেন দুলে উঠল। অচেনা নাম, অচেনা মানুষ—তবুও কেমন একটা পরিচিতির অনুভূতি।
দরজা খুলতেই সে প্রথমবার দেখল নেহাকে।
সাদা একটা সালোয়ার কামিজ, চুলগুলো হালকা বাতাসে উড়ছে, আর চোখে এমন এক শান্ত গভীরতা—যেন অনেক গল্প লুকিয়ে আছে সেখানে। নেহা হালকা একটা হাসি দিল।
“বিরক্ত করলাম না তো?”—সে বলল।
আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইল। উত্তর দিতে একটু দেরি হয়ে গেল। তারপর বলল—
“না… বলুন, কী দরকার?”
নেহা একটু ইতস্তত করে বলল—
“আসলে, আমাদের বাসার পানির লাইনটা একটু সমস্যা করছে… যদি একটু সাহায্য করতেন…”
এত সাধারণ একটা অনুরোধ, তবুও কেন যেন আরিয়ানের মনে হচ্ছিল, এই মুহূর্তটা তার জীবনে খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।
সে মাথা নেড়ে বলল—
“চলুন।”
নেহার বাসাটা ছিল একদম পাশেই। ছোট, কিন্তু খুব সুন্দর করে সাজানো। দেয়ালে কিছু ছবি, টেবিলের ওপর একটা ছোট্ট গাছ, আর জানালার পাশে একটা নীল পর্দা—সবকিছুতেই একটা মায়া ছিল।
আরিয়ান পাইপের সমস্যাটা ঠিক করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। নেহা পাশে দাঁড়িয়ে দেখছিল।
“আপনি এখানে একা থাকেন?”—নেহা জিজ্ঞেস করল।
“হ্যাঁ।”
“একদম একা?”
“হুম।”
“খারাপ লাগে না?”
এই প্রশ্নটার উত্তর দিতে গিয়ে আরিয়ান একটু থমকে গেল। সে অনেকদিন কাউকে তার অনুভূতির কথা বলেনি।
“অভ্যাস হয়ে গেছে”—সে সংক্ষিপ্তভাবে বলল।
নেহা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে বলল—
“সব অভ্যাসই কি ভালো হয়?”
এই প্রশ্নটা যেন সরাসরি গিয়ে আঘাত করল আরিয়ানের ভেতরে। সে কিছু বলল না। শুধু কাজটা শেষ করে উঠে দাঁড়াল।
“ঠিক হয়ে গেছে।”
“ধন্যবাদ”—নেহা হাসল—“আপনি না থাকলে কী যে করতাম!”
এই সাধারণ কথাটার মধ্যেও কেমন যেন এক আন্তরিকতা ছিল। আরিয়ান বুঝতে পারছিল, এই মেয়েটা অন্যরকম।
সেদিনের পর থেকে সবকিছু যেন একটু একটু করে বদলাতে শুরু করল।
প্রতিদিন বিকেলে নেহা বারান্দায় দাঁড়াত। আরিয়ানও অজান্তেই তার সময়টা মিলিয়ে নিত। প্রথমে শুধু চোখাচোখি হতো, তারপর হালকা হাসি, তারপর একদিন কথা।
“আপনি সবসময় বই পড়েন?”—নেহা জিজ্ঞেস করল।
“হ্যাঁ, ভালো লাগে।”
“মানুষের সাথে কথা বলতে ভালো লাগে না?”
“সব মানুষের সাথে না।”
“তাহলে কাদের সাথে?”
আরিয়ান একটু হেসে বলল—
“যাদের সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করে।”
নেহা চুপ করে তাকিয়ে রইল তার দিকে। তারপর বলল—
“আমার সাথে কি ইচ্ছে করে?”
প্রশ্নটা এত সরাসরি ছিল যে, আরিয়ান কিছুক্ষণ উত্তর খুঁজে পেল না। তারপর ধীরে বলল—
“হয়তো… করে।”
নেহার ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল।
দিনগুলো যেতে লাগল।
নেহা আর আরিয়ানের মধ্যে দূরত্বটা ধীরে ধীরে কমতে লাগল। তারা একসাথে চা খেত, গল্প করত, কখনো কখনো চুপ করে বসে থাকত।
নেহা ছিল খুব প্রাণবন্ত। সে ছোট ছোট বিষয়েও আনন্দ খুঁজে পেত। আরিয়ান অবাক হয়ে দেখত, কীভাবে এই মেয়েটা এত সহজে হাসতে পারে।
একদিন নেহা বলল—
“আপনি এত চুপচাপ কেন?”
“সব কথা বলা যায় না।”
“কেন?”
“সবাই বুঝতে পারে না।”
নেহা একটু এগিয়ে এসে বলল—
“আমি বুঝতে চেষ্টা করতে পারি।”
এই কথাটার মধ্যে এমন এক আন্তরিকতা ছিল, যা আরিয়ান আগে কখনো অনুভব করেনি।
সে প্রথমবারের মতো নিজের ভেতরের কিছু কথা খুলে বলতে শুরু করল।
তার একাকীত্ব, তার ভাঙা সম্পর্ক, তার বিশ্বাস হারানো—সবকিছু।
নেহা মন দিয়ে শুনল। একটাও কথা না কেটে, শুধু পাশে বসে রইল।
সব কথা শেষ হলে সে ধীরে বলল—
“সব মানুষ একরকম না, আরিয়ান।”
“জানি।”
“তাহলে আবার বিশ্বাস করতে ভয় লাগে কেন?”
আরিয়ান জানালার বাইরে তাকাল।
“কারণ আবার হারানোর ভয় আছে।”
নেহা তার দিকে তাকিয়ে বলল—
“কিন্তু না পেলে হারানোর প্রশ্নই আসে না।”
সেই রাতটা আরিয়ান ঘুমাতে পারল না।
নেহার কথাগুলো বারবার মাথায় ঘুরছিল। সে ভাবছিল—এই মেয়েটা কি সত্যিই তার জীবনে একটা নতুন অধ্যায় নিয়ে আসছে?
নাকি এটাও একটা ক্ষণস্থায়ী অনুভূতি?
সে জানত না।
কিন্তু একটা জিনিস সে বুঝতে পারছিল—নেহা তার একাকী জীবনে একটা আলোর রেখা হয়ে উঠছে।
পরদিন সকালে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল।
নেহার দরজার সামনে একটা স্যুটকেস রাখা।
আরিয়ান অবাক হয়ে গেল। দরজায় নক করল—কোনো উত্তর নেই।
আরেকবার করল—তবুও না।
তার মনে হঠাৎ একটা অজানা ভয় ঢুকে গেল।
ঠিক তখনই নিচতলার এক মহিলা বললেন—
“ওই মেয়েটা তো সকালে কোথাও চলে গেল মনে হয়।”
“কোথায়?”—আতঙ্কিত হয়ে জিজ্ঞেস করল আরিয়ান।
“জানি না… তাড়াহুড়ো করেই বের হয়ে গেল।”
আরিয়ানের বুকের ভেতরটা হঠাৎ ফাঁকা হয়ে গেল।
এত তাড়াতাড়ি?
কোনো কথা না বলে?
কেন?
সে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইল অনেকক্ষণ। মনে হচ্ছিল, এই নীরবতা যেন তার পুরোনো একাকীত্বকে আবার ফিরিয়ে আনছে।
ঠিক তখনই সে খেয়াল করল—দরজার নিচে একটা কাগজ গুঁজে রাখা।
সে সেটা তুলে নিল।
কাগজে লেখা—
“অচেনা থেকেও কেউ কেউ খুব আপন হয়ে যায়।
আপন হয়েও কেউ কেউ আবার হারিয়ে যায়।
আমি যাচ্ছি, কিন্তু গল্পটা এখানেই শেষ না…
— নেহা”
আরিয়ান কাগজটা শক্ত করে ধরে রাখল।
তার চোখে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল।
সে বুঝতে পারছিল—এই গল্পটা এখনই শুরু হয়েছে।
আর নেহা…
সে শুধু অচেনা কেউ না,
সে হয়ে উঠছে তার জীবনের সবচেয়ে গভীর অনুভূতির নাম।
(চলবে…)