ঢাকা, শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২৬,
সময়: ০১:৫৯:১৫ AM

উপন্যাস: “বিয়ে”

মান্নান মারুফ
13-03-2026 12:20:52 PM
উপন্যাস: “বিয়ে”

পর্ব–

সময় কখন যে মানুষের জীবনের অনেক জট খুলে দেয়, তা মানুষ অনেক সময় বুঝতেই পারে না।

রাকিব আর ফাতিমার জীবনেও তেমনটাই ঘটছিল।

কয়েক মাস আগেও তাদের বিয়েটা ছিল অনেক প্রশ্ন আর অনিশ্চয়তায় ভরা। পরিবার, সমাজ, দূরত্ব—সবকিছু যেন তাদের ভালোবাসার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।

কিন্তু সময় ধীরে ধীরে সবকিছুকে নরম করে দেয়।

রিয়াদের সেই ছোট্ট বাড়িটা এখন যেন তাদের সুখের আশ্রয় হয়ে উঠেছে।

বাড়িটা বড় নয়। ছোট্ট একটা বসার ঘর, তার পাশে রান্নাঘর, আর একটি শোবার ঘর। জানালার বাইরে দূরে মরুভূমির বাতাস মাঝে মাঝে এসে পর্দা দুলিয়ে দেয়।

কিন্তু সেই ছোট্ট বাড়ির ভেতর আছে অদ্ভুত এক উষ্ণতা।

সকালে ফাতিমা ঘুম থেকে উঠে জানালাটা খুলে দেয়। দূরে ফজরের আজান ভেসে আসে। রাকিব তখনো আধো ঘুমে থাকে।

ফাতিমা ধীরে ধীরে রান্নাঘরে যায়। চা বসায়। কখনো ডিম ভুনা, কখনো পরোটা বানায়।

এই ছোট ছোট কাজগুলোই যেন তার জীবনের আনন্দ হয়ে গেছে।

একদিন দুপুরে হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো।

রাকিব দরজা খুলতেই অবাক হয়ে গেল।

দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন ফাতিমার বাবা আর মা।

ফাতিমা প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারছিল না।

বাবা…!”

তার কণ্ঠ কেঁপে উঠল।

সে দৌড়ে গিয়ে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরল। এতদিন পর নিজের মাকে বুকে পেয়ে তার চোখে জল চলে এলো।

মা আলতো করে তার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন—

কেমন আছো মা?”

ফাতিমা শুধু মাথা নাড়ল। কথাগুলো যেন গলায় আটকে যাচ্ছিল।

রাকিব কিছুটা সংকোচ নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।

সে ধীরে এগিয়ে এসে সম্মানের সাথে বলল—

আসুন… ভেতরে আসুন।”

তার কণ্ঠে ছিল বিনয়।

ফাতিমার বাবা চুপচাপ চারপাশে তাকাচ্ছিলেন। ছোট্ট বাড়ি, সাধারণ আসবাব, কিন্তু সবকিছু খুব পরিষ্কার আর সাজানো।

ফাতিমা নিজেই রান্নাঘরে গিয়ে চা বানাতে লাগল।

রাকিব তখন অতিথিদের সামনে বসে অস্বস্তি নিয়ে কথা বলছিল।

আপনাদের আসা আমার জন্য সত্যিই সম্মানের…”

তার কথায় কোনো অভিনয় ছিল না।

কিছুক্ষণ পর ফাতিমা চা নিয়ে এলো।

মা তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।

তুমি নিজেই বানিয়েছো?”

হ্যাঁ।”

চা খেতে খেতে ফাতিমার বাবা ধীরে বললেন—

তুমি এখানে সুখে আছো?”

এই প্রশ্নটা যেন ঘরের ভেতর একটু নীরবতা এনে দিল।

ফাতিমা একবার রাকিবের দিকে তাকাল।

তারপর শান্ত স্বরে বলল—

হ্যাঁ বাবা… আমি খুব সুখে আছি।”

এই কথা বলার সময় তার চোখে কোনো দ্বিধা ছিল না।

রাকিব চুপ করে বসে ছিল।

তার মনে হচ্ছিল—এই মুহূর্তটা তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।

কিছুক্ষণ পরে ফাতিমার বাবা ধীরে রাকিবের দিকে তাকালেন।

তুমি কি আমার মেয়েকে ভালো রাখবে?”

রাকিব এক মুহূর্তও দেরি করল না।

আমি আমার জীবনের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করব।”

কথাটা খুব বড় কোনো প্রতিশ্রুতির মতো শোনাল না।

কিন্তু তার চোখের ভেতর সত্যিকারের দৃঢ়তা ছিল।

ফাতিমার মা তখন মেয়ের দিকে তাকিয়ে বুঝে ফেলেছিলেন—এই বাড়িতে তার মেয়ে সত্যিই সুখে আছে।

তিনি ধীরে স্বামীর দিকে তাকালেন।

ফাতিমার বাবা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন।

তারপর নরম গলায় বললেন—

আমরা তোমাদের ক্ষমা করে দিলাম।”

এই কথাটা শুনে ফাতিমার চোখে আবার জল চলে এলো।

সে দৌড়ে গিয়ে বাবার হাত ধরে ফেলল।

বাবা…”

বাবা আলতো করে তার মাথায় হাত রাখলেন।

তুমি যদি সুখে থাকো… তাহলে আমাদের আর কোনো অভিযোগ নেই।”

সেই দিনটা যেন তাদের জীবনের এক নতুন শুরু হয়ে গেল।

কয়েক সপ্তাহ পর রাকিবের পরিবারও ফাতিমাকে দেখতে এল।

প্রথমদিকে তাদের কিছুটা দ্বিধা ছিল।

ভিনদেশি মেয়ে, অন্য সংস্কৃতি—সবকিছু তাদের কাছে নতুন।

কিন্তু ফাতিমা খুব সহজভাবেই তাদের সাথে মিশে গেল।

সে সবার জন্য রান্না করল, গল্প করল, হাসল।

রাকিবের মা একসময় মৃদু হেসে বললেন—

মেয়েটা তো খুব ভালো।”

সেদিন থেকেই ফাতিমা যেন পুরোপুরি এই পরিবারের অংশ হয়ে গেল।

সময় আরও একটু এগিয়ে গেল।

রিয়াদের সেই ছোট বাড়িটা এখন আরও বেশি জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

সন্ধ্যায় কাজ থেকে ফিরে রাকিব দরজা খুলতেই দেখে—ফাতিমা রান্নাঘরে ব্যস্ত।

ঘরে ভেসে আসছে মসলার গন্ধ।

রাকিব চুপচাপ পেছন থেকে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে।

ফাতিমা হেসে বলে—

তুমি না একদম বাচ্চাদের মতো।”

কারণ আমি সুখী।”

রাত হলে তারা দুজন ছাদে উঠে বসে।

রিয়াদের আকাশে তখন অসংখ্য তারা জ্বলতে থাকে।

এক রাতে ফাতিমা রাকিবের কাঁধে মাথা রেখে ধীরে বলল—

জানো… আমি কখনো ভাবিনি আমার জীবন এমন হবে।”

কেমন?”

এত শান্ত… এত পূর্ণ।”

রাকিব তার হাতটা ধরে বলল—

আমি তো ভাবতেও পারিনি তোমার মতো একজন মানুষ আমার জীবনে আসবে।”

ফাতিমা মৃদু হেসে তার দিকে তাকাল।

তার চোখে তখন অদ্ভুত এক কোমলতা।

সে ধীরে বলল—

আমি তোমাকে বিয়ে করেছি বলে আমার জীবন পূর্ণ হয়েছে।”

এই কথাটা শুনে রাকিব কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তার বুকের ভেতর যেন এক অদ্ভুত উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ল।

সে আলতো করে ফাতিমাকে নিজের কাছে টেনে নিল।

রিয়াদের রাত তখন শান্ত।

দূরে মরুভূমির বাতাস ধীরে বয়ে যাচ্ছে।

ছোট্ট বাড়িটার ভেতর দুজন মানুষের জীবনে জমে উঠেছে ছোট ছোট সুখ।

কোনো বড় আয়োজন নেই।

কিন্তু আছে এমন এক ভালোবাসা—যা ধীরে ধীরে জীবনের প্রতিটি শূন্যতা পূর্ণ করে দেয়।

ফাতিমা চোখ বন্ধ করে রাকিবের কাঁধে মাথা রাখল।

তার মনে হলো—পৃথিবীর যেখানেই থাকুক, এই মানুষটার পাশে থাকলেই সেটাই তার ঘর।

আর রাকিব জানে—

ভালোবাসা যদি সত্যি হয়, তাহলে দুই ভিন্ন পৃথিবীর মানুষও একসাথে একটা নতুন পৃথিবী তৈরি করতে পারে।

রাতের আকাশে তারা জ্বলতে থাকে।

আর সেই তারাভরা আকাশের নিচে, রিয়াদের সেই ছোট বাড়িতে—
একটি ভালোবাসার গল্প ধীরে ধীরে আরও গভীর হয়ে উঠতে থাকে।

চলবে…