ঢাকা, সোমবার, ২৩ মার্চ ২০২৬,
সময়: ০১:৫০:৩২ PM

উপন্যাস: সেই মেয়েটি

মান্নান মারুফ
23-03-2026 12:20:05 PM
উপন্যাস: সেই মেয়েটি

পর্ব-৫

মেয়েটি আবার হাঁটা শুরু করলো। কুদ্দুছও যেন অদৃশ্য এক টানে তার পিছু পিছু চলতে লাগলো। রাস্তাটা তখন অনেকটাই ফাঁকা, সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে গিয়ে চারপাশে এক ধরনের হালকা অন্ধকার নেমে এসেছে। দূরের ল্যাম্পপোস্টের আলোয় মেয়েটির ছায়া লম্বা হয়ে পড়ে আছে রাস্তায়—ঠিক যেন কোনো অজানা গল্পের নায়িকা, যাকে অনুসরণ করেই কুদ্দুছ নিজের জীবনের নতুন অধ্যায়ে ঢুকে পড়েছে।

কুদ্দুছের মনে তখন অদ্ভুত এক অনুভূতি। ভয়, লজ্জা, কৌতূহল আর অকারণ এক টান—সব মিলিয়ে সে যেন নিজেকেই আর চিনতে পারছিল না। সে জানে, এভাবে কারও পিছু নেওয়া ঠিক নয়। কিন্তু মেয়েটির চোখের সেই অদ্ভুত গভীরতা, তার কণ্ঠের দৃঢ়তা—সবকিছু যেন তাকে বশ করে ফেলেছে।

অনেকটা পথ হেঁটে তারা একটা নিরিবিলি এলাকায় এসে পৌঁছালো। চারপাশে পুরনো ধাঁচের বাড়ি, কিছুটা নির্জনতা, আর বাতাসে এক ধরনের বিষণ্ণতা। ঠিক তখনই একটি বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক বয়স্ক লোক এগিয়ে এলেন। তার চোখে মায়া, কিন্তু মুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট।

লোকটি মেয়েটির কাছে এসে বললেন,
—কি রে মা, এতক্ষণ লাগলো?

কুদ্দুছ তখন মেয়েটির খুব কাছেই দাঁড়িয়ে। হঠাৎ লোকটির চোখ পড়ে তার ওপর। কুদ্দুছের বুক ধড়ফড় করে উঠলো। সে বুঝতে পারছিল না কি বলবে, কি করবে।

লোকটি একটু কড়া গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
—এই ছেলেটা কে?

এক মুহূর্তের জন্য সময় যেন থমকে গেল। কুদ্দুছের মাথা ঝিমঝিম করতে লাগলো। সে ভেবেছিল, এবার বুঝি সব শেষ—এখানেই অপমানিত হতে হবে তাকে।

কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে মেয়েটি কুদ্দুছের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
—ও আমার একটা ফ্রেন্ড। আজকে আমাদের এখানে নতুন এসেছে। ও খুব মেধাবী, তাই ওকে নিয়ে আসলাম পড়াশোনা নিয়ে কিছু বিষয়ে কথা বলবো।

কুদ্দুছ যেন স্বপ্ন দেখছে। এমনটা সে কল্পনাও করেনি। তার বুকের ভেতর জমে থাকা ভয়টা হঠাৎ করেই গলে গিয়ে অন্য এক অনুভূতিতে রূপ নিল—এক ধরনের কৃতজ্ঞতা, আর অজানা এক টান।

লোকটি একটু নরম হয়ে বললেন,
—আচ্ছা, তাহলে ভিতরে আসো।

বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই কুদ্দুছের মনে হলো, এই বাড়িটা যেন অনেক গল্প লুকিয়ে রেখেছে। দেয়ালের রং ফ্যাকাশে, কিছু জায়গায় প্লাস্টার উঠে গেছে। একটা পুরনো ঘড়ি টিকটিক শব্দ করছে—যেন সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বেঁচে আছে।

মেয়েটি কুদ্দুছকে একটা ঘরে নিয়ে গেল। ঘরটা খুবই সাদামাটা—একটা টেবিল, দুটো চেয়ার, আর একপাশে বইয়ের তাক। তাকভর্তি বই—কিছু নতুন, কিছু পুরনো, কিছু হয়তো অনেকদিন কেউ ছুঁয়েও দেখেনি।

মেয়েটি ধীরে ধীরে বলল,
—আপনি ভয় পেয়েছিলেন, তাই না?

কুদ্দুছ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মাথা নিচু করে বলল,
—হ্যাঁ… আমি ভাবছিলাম, আপনি হয়তো আমাকে অপমান করবেন।

মেয়েটি হালকা হেসে বলল,
—সবাইকে অপমান করার জন্য আমি জন্মাইনি।

তার কথার মধ্যে এক ধরনের কষ্ট মিশে ছিল। কুদ্দুছ সেটা বুঝতে পারলো। সে সাহস করে জিজ্ঞেস করল,
—আপনার নামটা কি?

মেয়েটি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো। যেন নামটা বলার মধ্যেও তার কোনো দ্বিধা আছে। তারপর আস্তে করে বলল,
—আমার নাম ঐশি।

কুদ্দুছ নামটা মনে মনে কয়েকবার উচ্চারণ করলো—“ঐশি”… নামটার মধ্যেই যেন এক ধরনের কোমলতা আছে, আবার কোথাও যেন লুকিয়ে আছে গভীর বেদনা।

—আপনি কেন আমার পিছু নিয়েছিলেন?—ঐশি আবার প্রশ্ন করলো।

কুদ্দুছ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—আমি নিজেও জানি না… মনে হচ্ছিল, আপনাকে না জানলে আমার কিছু একটা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

ঐশি চুপ করে রইলো। তার চোখে হালকা পানি চিকচিক করছে। সে দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে নিলো, যেন নিজের দুর্বলতা কাউকে দেখাতে চায় না।

—আপনি জানেন না, আমি কেমন মানুষ,—ঐশি ধীরে ধীরে বলল।

—মানুষ খারাপ বা ভালো হয় না… পরিস্থিতি তাকে বদলে দেয়,—কুদ্দুছ উত্তর দিলো।

ঐশি এবার তার দিকে তাকালো। এই প্রথম সে কুদ্দুছকে একটু গভীরভাবে দেখলো। তার চোখে কোনো লোভ নেই, কোনো কপটতা নেই—শুধু একটা সরলতা।

কিন্তু সেই সরলতাই হয়তো সবচেয়ে ভয়ংকর।

—আপনি এখানে আসবেন না আর,—ঐশি হঠাৎ বলল।

কুদ্দুছ অবাক হয়ে গেলো।
—কেন?

ঐশি একটু থেমে বলল,
—কারণ আমার জীবনে কেউ আসলে তার শেষটা ভালো হয় না।

এই কথাটা শুনে কুদ্দুছের বুক কেঁপে উঠলো।
—আপনি এমন কথা বলছেন কেন?

ঐশি উত্তর দিলো না। সে জানালার দিকে তাকিয়ে রইলো। বাইরে অন্ধকার আরও ঘন হয়ে এসেছে।

—আপনি জানেন, আমার মা নেই,—ঐশি হঠাৎ বলল।
—অনেক বছর আগে মারা গেছেন। তারপর থেকে এই বাড়িটা শুধু একটা বাড়ি… ঘর না।

কুদ্দুছ চুপ করে শুনছিল। তার মনে হচ্ছিল, এই মেয়েটার জীবনে অনেক না বলা গল্প জমে আছে।

—আর আমার বাবা…—ঐশি থেমে গেলো,—তিনি আমাকে খুব ভালোবাসেন, কিন্তু সেই ভালোবাসার মধ্যেও একটা ভয় আছে।

—কিসের ভয়?

ঐশি ধীরে বলল,
—আমাকে হারানোর ভয়।

কুদ্দুছ বুঝতে পারছিল না, কেন ঐশির কথা শুনে তার নিজেরও বুক ভারী হয়ে যাচ্ছে।

হঠাৎ বাইরে থেকে ঐশির বাবা ডাক দিলেন,
—ঐশি, চা নিয়ে আয়।

ঐশি উঠে গেলো। কুদ্দুছ একা বসে রইলো। ঘড়ির টিকটিক শব্দ যেন আরও জোরে শোনা যাচ্ছে।

কিছুক্ষণ পর ঐশি চা নিয়ে ফিরে এলো। দুজন চুপচাপ বসে চা খেতে লাগলো। সেই নীরবতার মধ্যেই যেন অনেক কথা লুকিয়ে ছিল।

—আপনি কি আবার আসবেন?—কুদ্দুছকে আস্তে করে জিজ্ঞেস করল।

ঐশি একটু হেসে বলল,
—আপনি যদি আসেন, আমি আপনাকে ফেরাতে পারবো না।

এই উত্তরটা যেন কুদ্দুছের মনে এক অদ্ভুত আলো জ্বেলে দিলো।

কিন্তু সেই আলোয়ও কোথাও একটা ছায়া ছিল।

রাত অনেক হয়ে গেছে। কুদ্দুছ উঠে দাঁড়ালো।
—আমি এখন যাই।

ঐশি দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিলো তাকে।
—সাবধানে যাবেন।

কুদ্দুছ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো। তারপর বলল,
—আপনি হাসলে অনেক সুন্দর লাগে।

ঐশি কিছু বললো না। শুধু মৃদু একটা হাসি দিলো—যার মধ্যে ছিল আনন্দের চেয়ে বেশি কষ্ট।

কুদ্দুছ চলে গেলো। অন্ধকার রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে সে বুঝতে পারছিল, তার জীবনটা আর আগের মতো থাকবে না।

আর ঐশি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইলো অনেকক্ষণ।

তার চোখ থেকে নীরবে জল গড়িয়ে পড়ছিল।

সে আস্তে করে বলল,
—তুমি কেন এলে আমার জীবনে, কুদ্দুছ…?

কারণ সে জানে—এই গল্পের শেষটা সুখের নয়।

আর তবুও, মানুষ কেন যেন বারবার সেই অসমাপ্ত, বেদনাময় ভালোবাসার দিকেই এগিয়ে যায়…।