ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬,
সময়: ০৪:৪৮:১৬ PM

উপন্যাস: বিয়ে

মান্নান মারুফ
12-03-2026 12:22:08 PM
উপন্যাস: বিয়ে

পর্ব–

ভালোবাসা কখনও সহজ পথে আসে না। কখনও কখনও তা আগুনের মতো—যে আগুনে মানুষকে নিজের সাহস, ধৈর্য আর বিশ্বাস দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।

ফাতিমা আর রাকিবও ঠিক সেই আগুনের ভেতর দিয়ে হাঁটছিল।

পরিবারের আপত্তি, সমাজের কথা, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা—সবকিছু যেন তাদের চারপাশে দেয়াল তুলে দিয়েছিল। কিন্তু সেই দেয়াল ভেঙে যাওয়ার মতো শক্ত ছিল তাদের ভালোবাসা।

একদিন সন্ধ্যায় অফিস ছুটির পর তারা দুজন হাঁটছিল শহরের ব্যস্ত রাস্তা ধরে। চারদিকে আলো ঝলমল করছে। গাড়ির হর্ন, মানুষের কোলাহল—সবকিছু মিলিয়ে শহরটা যেন এক অস্থির সুরে বাজছে।

ফাতিমা চুপচাপ ছিল।

রাকিব বুঝতে পারছিল—তার মনে ঝড় চলছে।

তুমি এত চুপ কেন?” সে ধীরে জিজ্ঞেস করল।

ফাতিমা কিছুক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর বলল—

কখনও কখনও মনে হয় আমরা খুব কঠিন পথে হাঁটছি।”

রাকিব একটু থামল।

তারপর শান্ত গলায় বলল—

হ্যাঁ, পথটা কঠিন। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, শেষটা সুন্দর হবে।”

কিন্তু বাস্তবতা শুধু বিশ্বাসে বদলে যায় না।

রাকিব জানত—যদি সত্যিই তারা একসাথে থাকতে চায়, তাহলে তাকে নিজের জীবনটা আরও শক্ত করে দাঁড় করাতে হবে।

সেই সিদ্ধান্তটাই সে নিল।

পরের কয়েক মাসে রাকিব নিজের জীবনটাকে বদলে দিল।

সে আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিশ্রম করতে লাগল। অফিসে অতিরিক্ত সময় কাজ করত। নতুন নতুন প্রজেক্ট নিত।

তার একটাই লক্ষ্য—নিজের একটা ছোট সংসার গড়া।

অবশেষে একদিন সে সিদ্ধান্ত নিল।

তার পাঁচ বছরের সঞ্চয়—প্রায় সবটাই সে খরচ করল একটি ছোট বাড়ি কিনতে।

বাড়িটা ছিল Riyadh শহরের বাইরের দিকে, একটু নিরিবিলি এলাকায়।

বড় কিছু নয়।

ছোট একটা একতলা বাড়ি। সামনে সামান্য বাগান, পাশে একটা খেজুর গাছ।

কিন্তু রাকিব যখন প্রথমবার সেই বাড়ির দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল, তখন তার মনে হলো—এটাই তার স্বপ্নের শুরু।

সেদিন সন্ধ্যায় সে ফাতিমাকে ফোন করল।

তুমি কি একটু বাইরে আসতে পারবে?” সে বলল।

ফাতিমা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল—

কোথায়?”

চলো, একটা জায়গা দেখাব।”

কিছুক্ষণ পরে তারা গাড়িতে করে শহরের বাইরে চলে এল।

রাস্তার দুই পাশে মরুভূমি। দূরে দূরে খেজুর গাছ।

অবশেষে গাড়িটা একটা ছোট বাড়ির সামনে এসে থামল।

ফাতিমা অবাক হয়ে বলল—

এখানে কেন?”

রাকিব পকেট থেকে একটা চাবি বের করল।

কারণ… এটা এখন আমার বাড়ি।”

ফাতিমা প্রথমে বুঝতেই পারল না।

তোমার বাড়ি?”

রাকিব মাথা নাড়ল।

হ্যাঁ। আমি কিনেছি।”

ফাতিমার চোখ বড় হয়ে গেল।

তুমি এত বড় সিদ্ধান্ত নিলে… আমাকে না বলেই?”

রাকিব একটু লাজুক হাসি দিল।

আমি চেয়েছিলাম তোমাকে সারপ্রাইজ দিতে।”

তারপর ধীরে বলল—

আমি চাই এখানে আমাদের একটা ছোট সংসার হোক।”

কথাটা শুনে ফাতিমার চোখ ভিজে উঠল।

সে চারপাশে তাকাল।

ছোট ঘর, সাদা দেয়াল, খালি মেঝে।

কিন্তু তার মনে হচ্ছিল—এই খালি ঘরগুলোতেই হয়তো একদিন হাসি, ভালোবাসা আর স্বপ্নে ভরে উঠবে।

সে ধীরে বলল—

তুমি আমার জন্য এত কিছু করলে?”

রাকিব শান্ত গলায় বলল—

ভালোবাসা মানে শুধু কথা না। কখনও কখনও কিছু প্রমাণও করতে হয়।”

সেই রাতটা ফাতিমার জীবনের সবচেয়ে অদ্ভুত রাতগুলোর একটি ছিল।

বাড়িতে ফিরে সে অনেকক্ষণ ঘুমাতে পারল না।

শেষ পর্যন্ত সে একটা সিদ্ধান্ত নিল।

পরদিন সে বাবা–মার বাড়িতে গেল।

ড্রইংরুমে তার বাবা পত্রিকা পড়ছিলেন, মা রান্নাঘর থেকে বের হচ্ছিলেন।

ফাতিমা ধীরে তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

আমার একটা কথা আছে।”

তার বাবা তাকালেন।

কি কথা?”

ফাতিমা গভীর শ্বাস নিল।

তারপর দৃঢ় কণ্ঠে বলল—

আমি রাকিবকে বিয়ে করতে চাই।”

ঘরটা মুহূর্তে নীরব হয়ে গেল।

তার বাবা ধীরে পত্রিকা নামিয়ে বললেন—

আমরা তো আগেই বলেছি, এটা সম্ভব নয়।”

কিন্তু এবার ফাতিমার চোখে ভয় ছিল না।

সে শান্ত গলায় বলল—

আমি ওকে ছাড়া বাঁচব না। আমার জন্য সবকিছু ছেড়েছে। আমি ওকে ছেড়ে দিতে পারব না।”

তার মা চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

তার বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

তুমি কি বুঝতে পারছ তুমি কী বলছ?”

ফাতিমা মাথা নাড়ল।

হ্যাঁ। আমি ভালো করেই বুঝছি।”

তার চোখে তখন অদ্ভুত এক দৃঢ়তা।

শুধু একজন বিদেশি ছেলে না। একজন ভালো মানুষ।”

ঘরের বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠল।

কিছুক্ষণ কেউ কথা বলল না।

শেষ পর্যন্ত তার মা ধীরে বললেন—

ভালোবাসা যদি সত্যি হয়… তাহলে হয়তো আমরা ভুলও হতে পারি।”

তার বাবা চুপ করে জানালার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

আর সেই মুহূর্তে ফাতিমা বুঝতে পারল—

হয়তো লড়াইটা এখনও শেষ হয়নি।

কিন্তু প্রথম দরজাটা একটু হলেও খুলতে শুরু করেছে।

সেদিন রাতে সে রাকিবকে ফোন করল।

আমি বাবা–মাকে সব বলেছি।”

রাকিব উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করল—

তারা কী বলেছে?”

ফাতিমা একটু হেসে বলল—

যুদ্ধটা এখনও চলছে।”

আর তুমি?”

ফাতিমা জানালার বাইরে তাকাল।

দূরে শহরের আলো জ্বলছে।

তার চোখে তখন নতুন এক স্বপ্ন।

আমি হারব না,” সে বলল।

ফোনের ওপাশে রাকিব নীরবে হাসল।

কারণ সে জানত—

যে ভালোবাসা এতটা সাহসী, তাকে থামানো খুব সহজ নয়।

আর হয়তো খুব শিগগিরই—

এই গল্পের নাম শুধু ভালোবাসা থাকবে না।

তার নাম হবে বিয়ে

চলবে.........