ঢাকা, শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২৬,
সময়: ০১:৫৬:১৮ AM

উপন্যাস: “তোমাকে ভালোবাসি”

মান্নান মারুফ
13-03-2026 02:54:09 PM
উপন্যাস: “তোমাকে ভালোবাসি”

পর্ব–

তোমাকে ভালোবাসি, ঐশি। অনেক ভালোবাসি…।”

কথাটা কুদ্দুছ বহুবার নিজের মনে বলেছে।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বলেছে, রাতের নীরবতায় বলেছে, এমনকি আকাশের দিকে তাকিয়েও বলেছে।

কিন্তু ঐশির সামনে দাঁড়িয়ে—একবারও বলতে পারেনি।

কুদ্দুছ জানে না কেন তার বুকের ভেতর এমন কাঁপন ওঠে। কেন কথাগুলো গলায় এসে আটকে যায়। কেন মনে হয়—ঐশির সামনে দাঁড়ালেই তার সমস্ত সাহস কোথায় যেন হারিয়ে যায়।

ঐশি খুব বেশি কথা বলে না।
চোখে একটা অদ্ভুত শান্তি, আর চলাফেরায় এক ধরনের গম্ভীরতা।

এই গম্ভীরতাই কুদ্দুছকে প্রথম দিন থেকেই অদ্ভুতভাবে টেনে নিয়েছিল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই পুরোনো ক্যাম্পাসে প্রথমবার সে ঐশিকে দেখেছিল।

সেদিন বিকেলের আলো ছিল নরম। ক্যাম্পাসের বড় কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে ঐশি ফোনে কারও সাথে কথা বলছিল।

তার চুলগুলো হালকা বাতাসে উড়ছিল। মুখে ছিল এক ধরনের গভীর ভাব।

সেদিন কুদ্দুছ অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে শুধু তাকিয়ে ছিল।

হয়তো তখনই তার হৃদয়ের ভেতর অজান্তে একটা গল্প শুরু হয়ে গিয়েছিল।

তারপর থেকে প্রতিদিনই সে ঐশিকে দেখত।

কখনো লাইব্রেরির সিঁড়িতে বসে বই পড়ছে, কখনো বন্ধুদের সাথে ধীর স্বরে কথা বলছে।

ঐশির হাসি খুব কম দেখা যায়।

কিন্তু যখন সে হাসে, তখন মনে হয়—চারপাশের পৃথিবীটা একটু উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

কুদ্দুছ সেই হাসিটা দেখার জন্য অজস্র অজুহাত খুঁজে বেড়ায়।

কিন্তু কথা বলতে গেলেই তার বুক ধড়ফড় করে।

বন্ধুরা অনেকবার বলেছে—

কুদ্দুছ, তুই গিয়ে বল না!”

কিন্তু সে শুধু হাসে।

কারণ সে জানে—কথাটা বলা এত সহজ না।

রাত হলে কুদ্দুছের ঘরটা খুব নিরব হয়ে যায়।

জানালার বাইরে দূরের আলো জ্বলে থাকে।

সে বিছানায় শুয়ে থাকে, আর ভাবতে থাকে ঐশির কথা।

তোমাকে ভালোবাসি ঐশি।

অনেক ভালোবাসি।

বলতে চেয়েও বলতে পারি নাই।

কুদ্দুছ কখনো কখনো ভাবে—এটা কি সত্যিই ভালোবাসা?

নাকি শুধু একতরফা কোনো অনুভূতি?

কিন্তু তারপরই সে বুঝতে পারে—ঐশিকে ছাড়া তার দিনগুলো যেন ঠিকমতো কাটে না।

ঐশির গম্ভীর চলাফেরা, তার নরম কণ্ঠ, তার গভীর চোখ—সবকিছু যেন কুদ্দুছের হৃদয়ে এক অদ্ভুত ছাপ রেখে গেছে।

তুমি যে ভুলতে পারে না কুদ্দুছ।

তুমি কুদ্দুছের ছায়া হয়ে থাকছো সারাক্ষণ।

একদিন বিকেলে কুদ্দুছ লাইব্রেরি থেকে বের হচ্ছিল।

হঠাৎ সে দেখল—ঐশি একা বসে আছে ক্যাম্পাসের বেঞ্চে।

তার হাতে একটা বই।

কিন্তু মনে হচ্ছিল সে বই পড়ছে না—কিছু একটা ভাবছে।

কুদ্দুছের বুকের ভেতর হঠাৎ ধুকপুক শুরু হলো।

আজ কি সে কথা বলবে?

আজ কি সে বলতে পারবে—তোমাকে ভালোবাসি?

সে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল।

প্রতিটা পদক্ষেপ যেন তার জন্য যুদ্ধের মতো।

ঐশির সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই তার গলা শুকিয়ে গেল।

ঐশি মাথা তুলে তাকাল।

তার চোখে ছিল শান্ত বিস্ময়।

কিছু বলবেন?”

কুদ্দুছ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তার বুকের ভেতর হাজারটা শব্দ ঘুরছে।

কিন্তু ঠোঁট দিয়ে বের হলো মাত্র একটা বাক্য—

আপনি… কেমন আছেন?”

ঐশি হালকা হাসল।

ভালো।”

এই ছোট্ট কথোপকথনটা কয়েক মিনিটের মধ্যেই শেষ হয়ে গেল।

কিন্তু কুদ্দুছের মনে হলো—তার জীবনের সবচেয়ে বড় সুযোগটা হয়তো আবার হারিয়ে গেল।

সেদিন রাতে সে নিজেকে খুব অসহায় মনে করছিল।

কুদ্দুছ এখন বাঁচতে চায়—কিন্তু কি করবে ভেবে কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছে না।

ভালোবাসা কখনো কখনো মানুষকে এমন জায়গায় এনে দাঁড় করায়, যেখানে সে নিজের হৃদয়ের সাথেই লড়াই করে।

কুদ্দুছের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই হচ্ছে।

সে চায় ঐশির কাছে নিজের মনের কথা বলতে।

কিন্তু ভয়ও পায়।

যদি ঐশি তাকে প্রত্যাখ্যান করে?

যদি এই নীরব দূরত্বটুকুও হারিয়ে যায়?

তবুও কুদ্দুছ প্রতিদিন অপেক্ষা করে।

ক্যাম্পাসে গেলে তার চোখ প্রথমেই ঐশিকে খুঁজে।

লাইব্রেরিতে গেলে ভাবে—আজ হয়তো দেখা হবে।

বিকেলের বাতাসে দাঁড়িয়ে থাকে—হয়তো ঐশি পাশ দিয়ে যাবে।

এই অপেক্ষাটাই যেন তার জীবনের অংশ হয়ে গেছে।

একদিন সন্ধ্যায় বৃষ্টি পড়ছিল।

ক্যাম্পাস প্রায় ফাঁকা।

কুদ্দুছ ছাতা ছাড়া দাঁড়িয়ে ছিল গাছের নিচে।

ঠিক তখনই সে দেখল—ঐশি ধীরে ধীরে হাঁটছে বৃষ্টির মধ্যে।

তার হাতে একটা ছোট ছাতা।

কুদ্দুছের বুকটা কেমন করে উঠল।

ঐশি কাছে এসে দাঁড়াল।

আপনি ভিজে যাচ্ছেন।”

কুদ্দুছ একটু হাসল।

হ্যাঁ… বৃষ্টি ভালো লাগে।”

ঐশি কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তার চোখে যেন এক অদ্ভুত প্রশ্ন।

কিন্তু সে কিছু বলল না।

কুদ্দুছের মনে হলো—এই নীরবতার মধ্যেও হাজারটা কথা লুকিয়ে আছে।

কিন্তু সে এখনো সেই কথাটা বলতে পারেনি।

তবুও সে অপেক্ষা করে।

হয়তো একদিন সাহস পাবে।

হয়তো একদিন সে সত্যিই বলবে—

ঐশি… আমি তোমাকে ভালোবাসি।”

আর হয়তো সেই দিন…

ঐশি মৃদু হেসে বলবে—

কুদ্দুছ… তোমাকে আমিও ভালোবাসি।”

এই আশাটুকুই কুদ্দুছকে বাঁচিয়ে রাখে।

তার জীবন এখন এই অপেক্ষার মধ্যেই বন্দী।

বৃষ্টিভেজা সেই সন্ধ্যায় দাঁড়িয়ে কুদ্দুছ মনে মনে আবার বলল—

তোমাকে ভালোবাসি ঐশি।

অনেক ভালোবাসি।

কিন্তু সেই কথাটা এখনো বাতাসেই ভেসে থাকে।

ঐশির কাছে পৌঁছায় না।

আর কুদ্দুছের হৃদয়ের ভেতর—
একটা অদৃশ্য গল্প ধীরে ধীরে আরও গভীর হয়ে উঠতে থাকে।

চলবে…