ঢাকা, শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২৬,
সময়: ০১:৫৯:১৮ AM

উপন্যাস: “বিয়ে”

মান্নান মারুফ
13-03-2026 12:25:42 PM
উপন্যাস: “বিয়ে”

শেষ পর্ব

রিয়াদের রাতগুলোতে এক ধরনের নীরব সৌন্দর্য আছে। দিনের প্রখর রোদ আর ব্যস্ততার পর রাত নামলে শহরটা যেন একটু শান্ত হয়ে যায়। দূরের মিনার থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে আসে, আর আকাশজুড়ে অসংখ্য তারা জ্বলে ওঠে।

সেই রাতের আকাশের নিচেই দাঁড়িয়ে ছিল রাকিব।

ছোট্ট বাড়িটার ছাদে সে একা দাঁড়িয়ে ছিল অনেকক্ষণ ধরে। বাতাস ধীরে ধীরে বইছিল। তার মনে আজ অনেক কথা জমে আছে।

আজ সে ফাতিমাকে কিছু কথা বলবে।

এমন কিছু কথা—যা সে অনেকদিন ধরে বুকের ভেতর লুকিয়ে রেখেছে।

এই কয়েক বছরের পথচলায় তারা কত কিছু পার করেছে!

একটা সময় ছিল, যখন তাদের বিয়েটা ছিল শুধু সাহস আর বিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়ে থাকা এক সিদ্ধান্ত। পরিবার ছিল না পাশে, সমাজও ছিল সন্দিহান।

কিন্তু ধীরে ধীরে সব বদলে গেছে।

এখন তাদের পরিবার তাদের পাশে।
তাদের ছোট্ট সংসারটাও ধীরে ধীরে ভালোবাসায় ভরে উঠেছে।

রাকিব আকাশের দিকে তাকাল।

তার মনে পড়ে গেল সেই প্রথম দিনটার কথা—যেদিন সে ফাতিমাকে দেখেছিল।

একজন সৌদি মেয়ে।

ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন সংস্কৃতি।

তখন কে জানত—একদিন সেই মেয়েই তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হয়ে উঠবে?

পেছন থেকে হালকা পায়ের শব্দ এলো।

রাকিব ঘুরে তাকাল।

ফাতিমা।

সে ধীরে ধীরে ছাদে এসে দাঁড়াল। তার চুলগুলো বাতাসে হালকা উড়ছে।

তুমি এখানে একা দাঁড়িয়ে আছো কেন?” ফাতিমা নরম স্বরে জিজ্ঞেস করল।

রাকিব মৃদু হাসল।

ভাবছিলাম।”

কি ভাবছিলে?”

রাকিব কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর ধীরে ধীরে বলল—

আমাদের গল্পটা।”

ফাতিমা অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।

আমাদের গল্প?”

হ্যাঁ। ভাবছিলাম—আমরা কতটা পথ পেরিয়ে এসেছি।”

ফাতিমা কাছে এসে তার পাশে দাঁড়াল।

ছাদের কিনারায় দুজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রিয়াদের আলো ঝলমলে শহরের দিকে তাকিয়ে রইল।

নিচে গাড়ির আলো চলাচল করছে, দূরের বাড়িগুলোতে আলো জ্বলছে।

রাকিব গভীর নিঃশ্বাস নিল।

তুমি জানো ফাতিমা… অনেক সময় আমি ভাবি—তুমি যদি সেদিন সাহস না করতে, তাহলে হয়তো আমরা আজ এখানে দাঁড়িয়ে থাকতাম না।”

ফাতিমা মৃদু হেসে বলল—

তুমিও তো সাহস করেছিলে।”

রাকিব মাথা নাড়ল।

কিন্তু তুমি আমার জন্য তোমার পুরো জীবন বদলে ফেলেছো।”

ফাতিমা কিছু বলল না।

সে শুধু শান্তভাবে রাকিবের দিকে তাকিয়ে রইল।

তার চোখে ছিল অদ্ভুত কোমলতা।

রাকিব ধীরে তার হাতটা ধরল।

আমি জানি না আমি সবসময় তোমাকে কতটা সুখ দিতে পারি… কিন্তু আমি প্রতিদিন চেষ্টা করি।”

ফাতিমা হালকা হাসল।

তুমি ইতিমধ্যেই দিয়েছো।”

কি দিয়েছি?”

ফাতিমা একটু চুপ করে থাকল।

তারপর ধীরে বলল—

একটা বাড়ি।
একটা শান্তি।
আর এমন একটা ভালোবাসা… যা আমি আগে কখনো অনুভব করিনি।”

রাকিবের চোখে তখন অদ্ভুত এক আলো।

সে হেসে বলল—

আর আমি তোমাকে পেয়ে বুঝেছি—ভালোবাসা কোনো দেশ মানে না। ভালোবাসা শুধু দুটো হৃদয়ের কথা।”

কথাটা শুনে ফাতিমার চোখ ভিজে উঠল।

সে ধীরে ধীরে রাকিবের কাঁধে মাথা রাখল।

রাতের বাতাসে যেন তাদের নিঃশ্বাসের উষ্ণতা মিশে যাচ্ছিল।

ফাতিমা ফিসফিস করে বলল—

জানো, ছোটবেলায় আমি ভাবতাম আমার জীবন খুব আলাদা হবে। বড় বাড়ি, অনেক আড়ম্বর…”

সে একটু থামল।

কিন্তু এখন বুঝি—সুখ এত বড় কিছু না। সুখ হলো এমন একজন মানুষ, যার পাশে দাঁড়ালে মনে হয় পৃথিবীটা ঠিক জায়গায় আছে।”

রাকিব তার মাথায় হাত রাখল।

তাহলে কি তুমি সুখী?”

ফাতিমা চোখ বন্ধ করে মাথা নাড়ল।

খুব।”

রিয়াদের আকাশ তখন আরও গভীর হয়ে উঠেছে।

তারাগুলো যেন আরও উজ্জ্বল।

এই শহর তাদের গল্পের সাক্ষী।

এক সৌদি মেয়ে আর এক বাংলাদেশি ছেলে—যাদের জীবন দুই ভিন্ন দিক থেকে এসে এক জায়গায় মিলেছে।

কখনো তারা কেঁদেছে।

কখনো ভয় পেয়েছে।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা ভালোবাসাকে ছেড়ে দেয়নি।

ফাতিমা ধীরে বলল—

জানো, আমার বাবা একদিন বলছিলেন—ভালোবাসা যদি সত্যি হয়, তাহলে মানুষ পৃথিবীর যেকোনো জায়গায় ঘর খুঁজে পায়।”

রাকিব মৃদু হেসে বলল—

তাহলে কি রিয়াদ তোমার ঘর হয়ে গেছে?”

ফাতিমা তার দিকে তাকিয়ে বলল—

রিয়াদ না… তুমি।”

এই কথাটা শুনে রাকিব কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ উষ্ণ হয়ে উঠল।

সে ফাতিমাকে কাছে টেনে নিল।

রিয়াদের আকাশের নিচে দুজনের প্রেমের গল্প চলতে থাকে—এক সৌদি মেয়ে আর এক বাংলাদেশি ছেলের।

যারা একসাথে প্রমাণ করেছে—ভালোবাসা যদি সত্যি হয়, তাহলে সীমান্ত, ধর্ম, ভাষা—কোনো কিছুই বাধা হয় না।

কারণ ভালোবাসা কোনো মানচিত্রের মধ্যে আটকে থাকে না।

ভালোবাসা থাকে মানুষের হৃদয়ে।

আর সেই হৃদয়ের পথেই একদিন দুজন অচেনা মানুষ একে অপরের জীবনে এসে হয়ে ওঠে সবচেয়ে আপন।

রাতের নরম বাতাসে ফাতিমা আবার ধীরে বলল—

রাকিব…”

হুম?”

যদি আবার জীবন শুরু করতে পারতাম…”

তাহলে?”

ফাতিমা হাসল।

তাহলেও তোমাকেই বিয়ে করতাম।”

রাকিব হেসে উঠল।

তারপর সে আকাশের দিকে তাকাল।

অসংখ্য তারা জ্বলছে।

সেই তারাভরা আকাশের নিচে দুজন মানুষের ভালোবাসা যেন আরও গভীর হয়ে উঠল।

একটা গল্প শেষ হলো।

কিন্তু তাদের জীবন—
তাদের ভালোবাসা—
এখনও চলতে থাকবে।

সমাপ্ত