ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ ২০২৬,
সময়: ০৭:১৩:৩৪ PM

উপন্যাস:“মালি”

মান্নান মারুফ
19-03-2026 03:51:24 PM
উপন্যাস:“মালি”

পর্ব-২

কুদ্দুছ ছিল নাদিয়ার জন্য এক টুকরো খোলা আকাশ। যে আকাশে কোনো প্রাসাদের দেয়াল নেই, নেই কোনো সোনালি খাঁচা—শুধু আছে নিঃশ্বাস নেওয়ার স্বাধীনতা। বাগানের গাছপালার যত্ন নিতে নিতে, কিংবা ঘরের ছোটখাটো কাজ করতে করতে, তাদের মধ্যে অদ্ভুত এক নীরব বোঝাপড়া তৈরি হয়েছিল—যেখানে শব্দের চেয়ে চোখের ভাষাই ছিল বেশি শক্তিশালী।

নাদিয়া মাঝে মাঝেই চুপচাপ বসে থাকত বাগানের এক কোণে। তার দৃষ্টি হারিয়ে যেত দূরের আকাশে, অথচ সে জানত—এই আকাশও তার নিজের নয়। এমন সময় কুদ্দুছ এসে পাশে দাঁড়াত। কিছু না বলেও যেন অনেক কিছু বলে ফেলত।

“তুমি কী ভাবো এত?” একদিন জিজ্ঞেস করেছিল কুদ্দুছ।

নাদিয়া একটু হেসে বলেছিল,
“ভাবি, যদি আমি অন্য কোথাও জন্মাতাম… যদি আমার জীবনটা তোমার গ্রামের মতো হতো…”

কুদ্দুছ কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল। তারপর ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল তার গ্রামের গল্প—বাখেরগঞ্জের সাহেবগঞ্জ, নদীর পাড়ের বাতাস, সর্ষে খেতের হলুদ ফুল, ভোরের কুয়াশা আর মানুষের সরল জীবন।

“সকাল হলে নদীর ধারে হাঁটতে বের হইতাম,” কুদ্দুছ বলছিল,
“মা ডাক দিত—‘খাইতে আয়।’ এই ডাকটাই ছিল সবচেয়ে মিষ্টি।”

নাদিয়া চোখ বন্ধ করে শুনছিল। তার মনে হচ্ছিল, সে যেন সত্যিই সেই গ্রামে চলে গেছে—নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে বাতাসে চুল উড়ছে, চারপাশে শুধু শান্তি আর নির্ভেজাল জীবন।

“তোমার জীবনটা খুব সুন্দর,” নাদিয়া বলল মৃদু স্বরে।

কুদ্দুছ হেসে ফেলল—
“সুন্দর? কষ্ট ছাড়া কিছু নাই সেখানে।”

নাদিয়া মাথা নাড়ল—
“কষ্ট থাকলেও, সেখানে ভালোবাসা আছে।”

এই কথাটা শুনে কুদ্দুছের বুকটা হালকা কেঁপে উঠল।

দিন যেতে লাগল। তাদের সম্পর্কটা যেন ধীরে ধীরে অদৃশ্য কোনো সুতোয় বাঁধা পড়তে লাগল। কোনো প্রতিশ্রুতি নেই, কোনো নাম নেই—তবুও গভীর, নিঃশব্দ এক টান।

কুদ্দুছ খুব পরিশ্রমী ছিল। রোদে পুড়ে কালো হয়ে যাওয়া শরীর, কিন্তু তার হাত দুটো ছিল অদ্ভুত কোমল। গাছের ডাল ছাঁটাই করার সময়, ফুলে পানি দেওয়ার সময়—তার স্পর্শে যেন জীবনের ছোঁয়া ছিল।

নাদিয়া মাঝে মাঝে দূর থেকে তাকিয়ে থাকত তার দিকে। এই মানুষটা দেখতে হয়তো সাধারণ, কিন্তু তার চোখ দুটো—সেখানে ছিল এক ধরনের মায়া, এক ধরনের সত্যতা, যা নাদিয়াকে বারবার টেনে নিয়ে যেত তার কাছে।

একদিন বিকেলে, নাদিয়া হঠাৎ বলল—
“তুমি কখনও আয়নায় নিজেকে দেখো?”

কুদ্দুছ একটু লজ্জা পেয়ে বলল—
“দেখার মতো কী আছে আমার?”

নাদিয়া ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এল।
“তুমি নিজেকে যেভাবে দেখো, তুমি তার চেয়ে অনেক বেশি।”

এই কথাটা শুনে কুদ্দুছের ভেতরে কিছু একটা বদলে গেল। সে প্রথমবারের মতো নিজেকে অন্যভাবে দেখতে শুরু করল।

কিন্তু এই সম্পর্ক যত গভীর হচ্ছিল, ততই তার মধ্যে ভয় ঢুকে পড়ছিল। এই পথটা যে কোথায় গিয়ে শেষ হবে, কেউ জানত না।

এক রাতে, নাদিয়া কুদ্দুছকে ডেকে বলল—
“আমি আর পারছি না।”

তার চোখ লাল, কণ্ঠ কাঁপছে।

“এই জীবন… এই একাকিত্ব… আমি দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছি।”

কুদ্দুছ চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল। তার মনে হচ্ছিল, সে যেন একটা গভীর খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে।

“তুমি বলেছিলে, তোমার গ্রামে শান্তি আছে,” নাদিয়া বলল,
“আমি কি সেখানে যেতে পারি?”

এই প্রশ্নটা কুদ্দুছকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিল। সে জানত, এটা শুধু একটা ইচ্ছা নয়—এটা একটা সিদ্ধান্তের শুরু।

“তুমি বুঝতেছ না, এটা কত বড় ঝুঁকি,” কুদ্দুছ বলল কষ্টভরা গলায়।

নাদিয়া হঠাৎ তার হাত ধরে ফেলল।
“ঝুঁকি না নিলে কি বাঁচা যায়?”

এই স্পর্শে কুদ্দুছ কেঁপে উঠল। এই প্রথমবার তারা এতটা কাছাকাছি।

তারপর থেকে সবকিছু দ্রুত বদলে যেতে লাগল।

তারা গোপনে কথা বলতে শুরু করল, পরিকল্পনা করতে লাগল। কোথায় যাবে, কীভাবে যাবে—সবকিছুই ছিল অনিশ্চিত, তবুও তাদের মনে ছিল এক অদ্ভুত সাহস।

একদিন গভীর রাতে, প্রাসাদের সব আলো নিভে যাওয়ার পর, তারা শেষবারের মতো বাগানে দেখা করল।

চারপাশে নীরবতা, শুধু হালকা বাতাসে ফুলের গন্ধ।

“তুমি নিশ্চিত?” কুদ্দুছ জিজ্ঞেস করল।

নাদিয়া মাথা নাড়ল—
“হ্যাঁ। আমি আর এখানে থাকতে চাই না।”

কুদ্দুছ কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে বলল—
“তাহলে কাল রাতেই…”

সেই রাতটা ছিল তাদের জীবনের মোড় ঘোরানোর রাত।

পরদিন সারাদিন কুদ্দুছ কাজ করল স্বাভাবিকভাবে, যেন কিছুই হয়নি। কিন্তু তার ভেতরে চলছিল ঝড়। একদিকে তার পরিবারের কথা—মা, ভাই-বোন… আরেকদিকে নাদিয়া।

অন্যদিকে নাদিয়া তার ঘরে বসে ছিল। চারপাশে দামি আসবাব, অলংকার—সবকিছুই যেন আজ তার কাছে অর্থহীন।

রাত গভীর হলে, সে একটা ছোট ব্যাগ গুছিয়ে নিল। কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস, আর কিছু টাকা।

তারপর নিঃশব্দে বেরিয়ে এল।

প্রাসাদের গেটের কাছে দাঁড়িয়ে ছিল কুদ্দুছ। তার চোখে ভয়, কিন্তু সেই ভয়কে ছাপিয়ে ছিল এক অদ্ভুত দৃঢ়তা।

“চলো,” সে বলল।

নাদিয়া একবার পেছনে তাকাল। এই প্রাসাদ—যেখানে তার এতদিনের জীবন, এত স্মৃতি… তবুও সে ফিরে গেল না।

তারা অন্ধকারে হারিয়ে গেল।

কিন্তু তারা জানত না—এই পথটা শুধু ভালোবাসার নয়, এই পথটা পরীক্ষার। এই পথের প্রতিটা মোড়ে লুকিয়ে আছে বিপদ, অনিশ্চয়তা, আর হয়তো এক ভয়ংকর পরিণতি।

তবুও তারা এগিয়ে গেল।

কারণ কখনও কখনও মানুষ সবকিছু হারানোর ঝুঁকি নিয়েও ভালোবাসাকে বেছে নেয়।

আর সেই ভালোবাসাই হয়তো তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হয়ে উঠতে চলেছে।

(চলবে…)