ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬,
সময়: ০৪:৫৩:৫৪ PM

উপন্যাস: বিয়ে

মান্নান মারুফ
12-03-2026 11:46:46 AM
উপন্যাস: বিয়ে

পর্ব–

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদমরুভূমির মাঝখানে আধুনিকতার ঝলমলে এক শহর। দিনের বেলায় তপ্ত রোদে ঝিলমিল করে কাঁচের উঁচু ভবনগুলো, আর রাত নামলে আলোয় ভেসে ওঠে শহরের প্রতিটি রাস্তা। এই ব্যস্ত শহরের এক কোণে, মাঝারি আকারের একটি অ্যাপার্টমেন্টে একা থাকত ফাতিমা।

ফাতিমার বয়স ছাব্বিশ। সে জন্মেছে এবং বড় হয়েছে এই শহরেই। তার বাবা একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী, আর মা গৃহিণী। বাবা–মা চেয়েছিলেন মেয়েটি তাদের সঙ্গেই থাকুক, কিন্তু ফাতিমা ছোটবেলা থেকেই স্বাধীনচেতা। সে চেয়েছিল নিজের মতো করে জীবন গড়তে—নিজের সিদ্ধান্তে, নিজের দায়িত্বে।

তাই বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করার পরই সে একটি ছোট বেসরকারি কোম্পানিতে অ্যাকাউন্টেন্ট হিসেবে চাকরি নেয়। অফিসটা খুব বড় নয়, কিন্তু কর্মীদের মধ্যে আন্তরিকতা ছিল। প্রতিদিন সকাল নয়টার আগেই ফাতিমা অফিসে পৌঁছে যেত। ডেস্কে বসে হিসাবের ফাইল খুলে কাজ শুরু করত।

সেই অফিসেই কাজ করত রাকিব।

রাকিব এসেছে বাংলাদেশ থেকে। বয়স বত্রিশ। পাঁচ বছর আগে জীবিকার খোঁজে সে সৌদি আরবে পা রেখেছিল। প্রথম দিকে জীবনটা সহজ ছিল না—ভাষা, সংস্কৃতি, পরিবেশ সবই আলাদা। কিন্তু ধীরে ধীরে সে মানিয়ে নিতে শিখে যায়।

কোম্পানির আইটি সাপোর্টে কাজ করে রাকিব। কম্পিউটার, সার্ভার, নেটওয়ার্ক—এসবই তার দায়িত্ব। অফিসে যখনই কারও কম্পিউটারে সমস্যা হতো, তখনই সবাই ডাকত রাকিবকে।

প্রথম দিকে ফাতিমা আর রাকিবের পরিচয় ছিল শুধুই কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ।

একদিন সকালে ফাতিমার কম্পিউটার হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল। যতই চেষ্টা করুক, আর চালু হচ্ছে না। বিরক্ত হয়ে সে অফিসের ফোনটা তুলে আইটি বিভাগে কল দিল।

হ্যালো, আইটি সাপোর্ট?”
ওপাশ থেকে শান্ত কণ্ঠে উত্তর এল, “জি, বলুন।”

আমার কম্পিউটারটা কাজ করছে না।”

কিছুক্ষণের মধ্যেই রাকিব এসে দাঁড়াল তার ডেস্কের সামনে। লম্বা, শান্ত স্বভাবের একজন মানুষ। চোখে হালকা চশমা, মুখে সবসময় এক ধরনের লাজুক হাসি।

সে চুপচাপ কম্পিউটারটা খুলে দেখতে লাগল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই সমস্যাটা ঠিক হয়ে গেল।

ফাতিমা অবাক হয়ে বলল,
ওয়াও! এত দ্রুত ঠিক করে ফেললে?”

রাকিব হেসে বলল,
এটা খুব ছোট সমস্যা ছিল।”

সেদিনের কথোপকথন ছিল খুব সাধারণ। কিন্তু এরপর থেকে মাঝে মাঝেই ফাতিমার কম্পিউটারে ছোটখাটো সমস্যা দেখা দিত—অন্তত সে তাই ভাবত।

আর প্রতিবারই রাকিব এসে তা ঠিক করে দিত।

দিন যেতে লাগল। কাজের ফাঁকে ফাঁকে তাদের মধ্যে ছোট ছোট কথা হতে লাগল। কখনও কাজ নিয়ে, কখনও শহরের আবহাওয়া নিয়ে।

একদিন দুপুরের দিকে ফাতিমা বলল,
তুমি কি সবসময় এত চুপচাপ থাকো?”

রাকিব একটু লজ্জা পেয়ে বলল,
আমি আসলে খুব বেশি কথা বলতে পারি না।”

কিন্তু তুমি তো অনেক কিছু জানো,” ফাতিমা বলল।

রাকিব হালকা হেসে উত্তর দিল,
জানা আর বলা এক জিনিস না।”

এই কথোপকথনের পর থেকেই তাদের মধ্যে অদ্ভুত এক বন্ধুত্ব তৈরি হতে লাগল।

একদিন বিকেলে অফিসের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ফাতিমা আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। মরুভূমির আকাশটা সেদিন অদ্ভুত সুন্দর লাগছিল। সূর্যের আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসছিল।

রাকিব পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ ফাতিমা তাকে ডেকে বলল—

শোনো, একটা কথা বলি?”

জি?”

ফাতিমা হেসে বলল,
তুমি তো বাংলায় কথা বলো, আমি আরবিতে। কিন্তু কেন যেন মনে হয় তুমি আমার কথা বুঝতে পারো।”

রাকিব একটু থেমে তার দিকে তাকাল। তারপর লাজুক হাসি দিয়ে বলল—

আমি আরবি শিখে নিয়েছি তোমার জন্য।”

কথাটা শুনে ফাতিমা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।

তারপর হেসে উঠল।

সত্যি?”

হুম,” রাকিব বলল, “অন্তত চেষ্টা করছি।”

সেদিনের সেই ছোট্ট কথোপকথনের পর থেকে তাদের সম্পর্কটা যেন একটু অন্যরকম হয়ে গেল।

তারা মাঝে মাঝে একসাথে কফি খেতে যেত অফিসের কাছের ছোট ক্যাফেতে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে গল্প করত।

ফাতিমা জানতে পারল—রাকিবের মা এখনও ঢাকায় থাকেন। ছোট একটা বাড়ি আছে। রাকিব প্রতি মাসে টাকা পাঠায়।

রাকিবও জানতে পারল—ফাতিমা ছোটবেলা থেকেই নিজের মতো করে জীবন কাটাতে চেয়েছে। সে স্বপ্ন দেখে একদিন নিজের একটা ছোট ব্যবসা শুরু করবে।

ধীরে ধীরে তাদের বন্ধুত্বের মধ্যে নীরব এক অনুভূতি জন্ম নিতে লাগল।

কিন্তু কেউই সেটা মুখে বলত না।

একদিন সন্ধ্যায় অফিস ছুটির পর তারা দুজন হাঁটছিল শহরের ফুটপাথ ধরে। চারপাশে আলো জ্বলছে, গাড়ির শব্দ, মানুষের ব্যস্ততা—সব মিলিয়ে শহরটা যেন জীবন্ত।

হঠাৎ ফাতিমা বলল,
তুমি কি কখনও নিজের দেশে ফিরে যেতে চাও?”

রাকিব একটু ভেবে বলল,
চাই… কিন্তু জানি না কখন।”

কেন?”

কারণ এখানে কিছু জিনিস রেখে যেতে ইচ্ছে করে না।”

ফাতিমা তাকিয়ে বলল,
কী জিনিস?”

রাকিব একটু হাসল।
কিছু মানুষ।”

ফাতিমার বুকের ভেতরটা কেমন যেন কেঁপে উঠল।

সেদিন রাতে নিজের অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে এসে সে অনেকক্ষণ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।

শহরের আলো দূরে ঝলমল করছিল।

আর তার মনে বারবার ভেসে উঠছিল সেই লাজুক হাসি—রাকিবের।

ফাতিমা বুঝতে পারছিল, তার জীবনের গল্পটা হয়তো নতুন এক পথে এগোতে শুরু করেছে।

কিন্তু সে তখনও জানত না—

এই বন্ধুত্ব একদিন এমন এক সিদ্ধান্তের দিকে নিয়ে যাবে, যার নাম বিয়ে

আর সেই বিয়ে শুধু দুই মানুষের নয়—দুই দেশ, দুই সংস্কৃতি আর দুই ভিন্ন জীবনের মিলনের গল্প হয়ে উঠবে।

চলবে.............