পর্ব:-৮
ইদানিং এক অদ্ভুত পরিবর্তন ঘটছে।
যে দূরত্ব কুদ্দুছ এত কষ্ট করে গড়ে তুলেছিল, সেই দূরত্বে যেন হালকা ফাটল ধরতে শুরু করেছে।
আর সেই ফাটলের শুরুটা—মেহরিনের দিক থেকেই।
একদিন সকালে ক্লাসে ঢোকার সময় হঠাৎ মেহরিন নিজেই কুদ্দুছকে বলল—
“এই… কুদ্দুছ, একটা কথা ছিল…”
কুদ্দুছ থেমে গেল, কিন্তু পুরোপুরি ঘুরে তাকাল না।
“বলুন,”—তার কণ্ঠে অদ্ভুত এক গাম্ভীর্য।
মেহরিন একটু থেমে বলল,
“গতকালের নোটটা… যদি একটু দিতেন?”
এই ছোট্ট অনুরোধটাও কুদ্দুছের ভেতরে অদ্ভুত ঝড় তুলল।
একসময় এই সুযোগের জন্য সে অপেক্ষা করত।
একটা কথা যেন তার কাছে অনেক বড় ছিল।
কিন্তু আজ—সবকিছু বদলে গেছে।
সে ব্যাগ থেকে খাতা বের করে এগিয়ে দিল।
“নিন।”
কোনো হাসি নেই, কোনো বাড়তি কথা নেই।
মেহরিন খাতাটা নিল, কিন্তু তার চোখে একটা বিস্ময় ছিল।
মেহরিন যেন বুঝতে পারছিল—কুদ্দুছ আর আগের মতো নেই।
আগে সে চুপচাপ থাকলেও তার চোখে এক ধরনের কোমলতা থাকত।
এখন সেখানে এক ধরনের দূরত্ব, এক ধরনের ঠাণ্ডা ভাব।
কুদ্দুছ নিজেও বুঝতে পারছে—মেহরিন তার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করছে।
কিন্তু সে ইচ্ছে করেই গম্ভীর থাকে।
কারণ, সে জানে—এই গাম্ভীর্যের আড়ালেই তার নিরাপত্তা।
যদি সে আবার আগের মতো হয়ে যায়, তাহলে হয়তো আবার কষ্ট পাবে।
মেহরিন ইদানিং মাঝে মাঝে নিজেই এগিয়ে এসে কথা বলে।
“তুমি এখন খুব চুপচাপ হয়ে গেছো, না?”
কুদ্দুছ ছোট করে উত্তর দেয়—
“হয়তো।”
“আগে তো এমন ছিলে না…”-মেহরিনের কণ্ঠে হালকা আক্ষেপ।
কুদ্দুছ কিছু বলে না।
কারণ, সে জানে—এই “আগে” আর “এখন”-এর মাঝখানে একটা শব্দ দাঁড়িয়ে আছে—
“লুচ্চা।”
কুদ্দুছ এখন আর জানতে চায় না—মেহরিন কেমন আছে, কী করছে।
আগে সে প্রতিদিন খোঁজ রাখত—কোথায় যায়, কার সঙ্গে কথা বলে, কেমন আছে।
এখন সে নিজেকে সেই জায়গা থেকে সরিয়ে নিয়েছে।
সে নিজের মনকে শক্ত করে বলেছে—
“যে আমাকে লুচ্চা ভাবে, তার জীবনের খোঁজ রাখার অধিকার আমার নেই।”
তবুও, মনের ভেতরের অনুভূতিগুলো কি এত সহজে থামে?
না, থামে না।
কুদ্দুছ এখনও মেহরিনকে ভালোবাসে—একই গভীরতায়, একই নিঃশব্দতায়।
কিন্তু এখন সেই ভালোবাসার ওপর একটা স্তর পড়েছে—ব্যথার স্তর।
সে এখন একা একা সময় কাটাতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।
কলেজ শেষে সরাসরি বাড়ি চলে যায়।
বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা কমে গেছে।
ছাদের কোণাটা এখন তার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা।
সেখানে বসে সে আকাশ দেখে, বাতাসে নিজেকে ভাসিয়ে দেয়।
একদিন বিকেলে ছাদে বসে ছিল কুদ্দুছ।
হালকা বাতাস বইছে। দূরে সূর্য ডুবছে।
তার হাতে ডায়েরি।
সে লিখতে শুরু করল—
“তুমি এখন আমার সঙ্গে কথা বলো।
আগে আমি চাইতাম—তুমি একবার কথা বলো।
আজ তুমি বলছো, কিন্তু আমি চুপ।”
সে একটু থামল।
তারপর আবার লিখল—
“এই চুপ থাকাটা কি আমার জেদ?
নাকি আমার ভাঙা হৃদয়ের প্রতিরক্ষা?”
কুদ্দুছ নিজেই এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পায় না।
সে শুধু জানে—তার ভেতরে এখনও অনেক ব্যথা আছে।
এই ব্যথা নিয়েই সে বেঁচে আছে।
একদিন লাইব্রেরিতে বসে ছিল কুদ্দুছ।
মেহরিন এসে তার সামনে বসে বলল—
“তুমি কি আমার ওপর রাগ করেছো?”
এই প্রশ্নটা কুদ্দুছকে থামিয়ে দিল।
সে মাথা তুলল।
প্রথমবারের মতো সরাসরি মেহরিনের চোখে তাকাল।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল—
“না।”
“তাহলে এমন আচরণ করছো কেন?”—মেহরিনের কণ্ঠে কৌতূহল।
কুদ্দুছ একটু হেসে বলল—
“মানুষ বদলায়।”
এই কথাটা শুনে মেহরিন চুপ হয়ে গেল।
কুদ্দুছ জানে—সে পুরো সত্যিটা বলছে না।
কিন্তু সে বলতে চায়ও না।
কারণ, সে ভয় পায়—সত্যি বললে আবার সবকিছু জটিল হয়ে যেতে পারে।
মেহরিনের ভেতরেও যেন কিছু পরিবর্তন এসেছে।
সে এখন কুদ্দুছকে একটু ভিন্নভাবে দেখছে।
আগের সেই বিরক্তি নেই, বরং এক ধরনের প্রশ্ন—
“এই ছেলেটা হঠাৎ এমন হয়ে গেল কেন?”
কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তর কেউই খুজেঁ পায় না।
কুদ্দুছের দিনগুলো এখন নিঃশব্দে কাটে।
সে কথা বলে কম, ভাবে বেশি।
তার ভেতরে একটা চলমান সংলাপ আছে—যেখানে সে নিজেই প্রশ্ন করে, নিজেই উত্তর দেয়।
রাতে ডায়েরিতে সে লিখল—
“আমি এখন আর তোমার খোঁজ নেই না।
কারণ, আমি জানি—আমার জানার কোনো অধিকার নেই।
তবুও, আমার মন প্রতিদিন তোমার দিকেই ছুটে যায়।”
তার চোখ ভিজে ওঠে।
সে আবার লিখে—
“ভালোবাসা কখনও শেষ হয় না।
শুধু তার প্রকাশ বদলে যায়।”
কুদ্দুছ এখন তার ভালোবাসাকে নতুনভাবে বাঁচিয়ে রাখছে।
সে আর কিছু চায় না—না কাছাকাছি আসা, না কোনো সম্পর্ক।
সে শুধু চায়—এই অনুভূতিটা যেন বেঁচে থাকে।
একদিন রাতে ছাদে দাঁড়িয়ে সে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল—
“তুমি যদি ফিরে আসতে চাও,
আমি হয়তো কিছু বলব না।
কিন্তু আমার ভেতরের জায়গাটা—
সেটা এখনও তোমার জন্যই খালি আছে।”
তার কণ্ঠে কোনো প্রত্যাশা নেই, শুধু এক ধরনের নীরব স্বীকারোক্তি।
এইভাবে কুদ্দুছ তার ব্যথিত মন নিয়ে একা একা সময় পার করছে।
তার জীবনে এখন অনেক প্রশ্ন, অনেক অজানা অনুভূতি।
কিন্তু তবুও—তার ভালোবাসা এখনও টিকে আছে।
আর সেই ভালোবাসাই হয়তো তাকে শেষ পর্যন্ত কোথাও নিয়ে যাবে—
যেখানে সত্য, অনুভূতি আর সম্পর্ক—সবকিছুর একটা উত্তর মিলবে।
(চলবে…)