পর্ব: -৭
ইদানিং কুদ্দুছ আর আগের মতো নেই।
যে ছেলেটা একসময় দূর থেকে হলেও মেহরিনকে দেখার মধ্যে এক ধরনের শান্তি খুঁজে পেত, এখন সেই ছেলেটাই মেহরিনের সামনে পড়লে নিজেকে সরিয়ে নেয়।
সে আর স্বাভাবিকভাবে কথা বলে না।
আসলে—সে কথা বলার সাহসই পায় না।
কারণ, তার মনে একটা ভয় স্থায়ী হয়ে গেছে—মেহরিন তাকে খারাপ ভাবে। চরিত্রহীন ভাবে।
এই চিন্তাটাই তার বুকের ভেতরে এক ধরনের লজ্জা তৈরি করেছে।
একদিন সকালে ক্লাসে ঢুকতেই কুদ্দুছ দেখল—মেহরিন সামনে বসে আছে।
আগে হলে সে হয়তো এমন জায়গায় বসত, যেখান থেকে অন্তত মেহরিনকে দেখা যায়।
কিন্তু আজ সে ইচ্ছে করেই একেবারে পেছনের বেঞ্চে গিয়ে বসল।
মাথা নিচু করে খাতা খুলে রাখল।
তার চোখ যেন নিজে থেকেই নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে—মেহরিনের দিকে তাকাবে না।
ক্লাসের মাঝে একবার শিক্ষক একটা প্রশ্ন করলেন।
মেহরিন উত্তর দিতে দাঁড়াল।
তার কণ্ঠ পরিষ্কার, আত্মবিশ্বাসী।
এই কণ্ঠ একসময় কুদ্দুছের মনে প্রশান্তি আনত।
আজও আনে—কিন্তু সেই প্রশান্তির সঙ্গে এক ধরনের কষ্ট মিশে থাকে।
সে মাথা নিচু করে রাখে।
সে চায় না—মেহরিন বুঝতে পারুক, সে এখনও তাকে এতটা গুরুত্ব দেয়।
কুদ্দুছ এখন শুধু মেহরিনের থেকেই না, মেহরিনের ঘনিষ্ঠ জনদের থেকেও দূরে সরে গেছে।
আগে মাঝে মাঝে তাদের সঙ্গে কথাবার্তা হতো—সাধারণ, নির্দোষ আলাপ।
কিন্তু এখন সে সেগুলোও এড়িয়ে চলে।
কারণ, তার মনে হয়—ওরা হয়তো তাকে নিয়ে হাসাহাসি করে।
হয়তো ওরাই সেই “লুচ্চা” শব্দটা ছড়িয়েছে।
এই সন্দেহটা তাকে আরও গুটিয়ে দেয়।
একদিন করিডোরে মেহরিনের এক বান্ধবী কুদ্দুছকে বলল—
“এই, কুদ্দুছ! কেমন আছো?”
আগে হলে সে হাসিমুখে উত্তর দিত।
আজ সে শুধু মাথা নেড়ে বলল—
“ভালো।”
তারপর আর দাঁড়াল না।
দ্রুত সরে গেল।
মেয়েটা কিছুটা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
কুদ্দুছ এখন নিজেকে এমনভাবে গড়ে তুলছে—যেন সে কারও জীবনে নেই।
সে কারও সঙ্গে মিশছে না, কারও চোখে চোখ রাখছে না।
তার এই পরিবর্তনটা সবাই লক্ষ্য করছে, কিন্তু কেউ পুরোটা বুঝতে পারছে না।
রাশেদ একদিন তাকে থামিয়ে বলল—
“তুই এভাবে নিজেকে আলাদা করে রাখছিস কেন?”
কুদ্দুছ একটু চুপ করে থেকে বলল—
“সব জায়গায় সবার থাকা দরকার হয় না।”
রাশেদ বিরক্ত হয়ে বলল—
“এইসব দার্শনিক কথা বলিস না। সরাসরি বল।”
কুদ্দুছ একটু হেসে বলল—
“আমি এখন চুপ থাকতেই স্বস্তি পাই।”
এই কথাটা সত্যি—কিন্তু পুরো সত্যি না।
কারণ, এই চুপ থাকা স্বস্তির চেয়ে বেশি কষ্টের।
মেহরিনের সঙ্গে তার এখন মাঝে মাঝে চোখাচোখি হয়।
সেই মুহূর্তগুলো অদ্ভুত।
দুজনেই এক সেকেন্ডের জন্য তাকায়, তারপর দ্রুত চোখ সরিয়ে নেয়।
কেউ কিছু বলে না।
এই নীরবতাটা অনেক কথা বলে—কিন্তু কেউ শুনতে চায় না।
কুদ্দুছের মনে হয়—এই দূরত্বটাই এখন তার জন্য নিরাপদ।
যদি সে কাছে যায়, তাহলে হয়তো আবার কোনো ভুল বোঝাবুঝি হবে।
আবার হয়তো নতুন করে অপমান আসবে।
তাই সে দূরে থাকাটাকেই বেছে নিয়েছে আপদ হিসাবে।
তবুও, কিন্তু তার ভালোবাসা কমে নাই।
বরং এই দূরত্বের ভেতরেই তা আরও গভীর হয়ে ওঠে।
সে এখন আর মেহরিনকে ছুঁতে চায় না, কাছে পেতে চায় না।
সে শুধু চায়—মেহরিন ভালো থাকুক।
এই চাওয়াটাই এখন তার ভালোবাসার একমাত্র রূপ।
একদিন বিকেলে কুদ্দুছ লাইব্রেরিতে বসে ছিল।
হঠাৎ মেহরিন এসে পাশের টেবিলে বসল।
এই কাছাকাছি অবস্থানটা তাকে অস্থির করে তোলে।
সে বইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকার চেষ্টা করে, কিন্তু মনোযোগ দিতে পারে না।
তার মনে হয়—সে উঠে চলে যাক।
কিন্তু আবার মনে হয়—এভাবে চলে যাওয়া কি ঠিক?
শেষমেশ সে চুপচাপ বসে থাকে।
এই নীরব সহাবস্থানটা যেন তার জন্য এক ধরনের পরীক্ষা।
কিছুক্ষণ পর মেহরিন উঠে চলে যায়।
কুদ্দুছ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
তার মনে হয়—সে যেন একটা যুদ্ধ জিতে এসেছে।
রাতে ডায়েরি খুলে সে লিখল—
“আমি এখন তার কাছ থেকে দূরে থাকি।
কারণ, আমি চাই না—সে আমাকে আবার খারাপ ভাবুক।
আমি চাই না—আমার জন্য তার কোনো অস্বস্তি হোক।”
সে আবার লিখে—
“ভালোবাসা মানে সবসময় কাছে থাকা না।
অনেক সময় দূরে থাকাটাই ভালোবাসা।”
কুদ্দুছ এখন নিজের ভেতরে একটা দেয়াল তৈরি করেছে।
এই দেয়ালের এক পাশে সে—তার অনুভূতি, তার কষ্ট, তার ভালোবাসা।
আর অন্য পাশে—মেহরিন, তার জীবন, তার স্বাভাবিকতা।
এই দেয়ালটা সে নিজেই বানিয়েছে।
কারণ, সে বিশ্বাস করে—এই দেয়ালই তাকে আর মেহরিনকে রক্ষা করবে।
একদিন রাতে ছাদে দাঁড়িয়ে সে আকাশের দিকে তাকাল।
তার মনে হলো—এই আকাশটাই একমাত্র জায়গা, যেখানে কোনো দূরত্ব নেই।
সে আস্তে করে বলল—
“আমি তোমার কাছ থেকে দূরে আছি,
কিন্তু আমার ভালোবাসা তোমার কাছেই আছে।”
তার কণ্ঠে এক ধরনের শান্ত বেদনা।
এইভাবে কুদ্দুছ তার ভালোবাসাকে দূরত্বের ভেতরে বাঁচিয়ে রাখছে।
সে কথা বলে না, প্রকাশ করে না—তবুও ভালোবাসে।
তার নীরবতা এখন তার সবচেয়ে বড় ভাষা।
আর সেই নীরবতার ভেতরেই লুকিয়ে আছে—এক গভীর, নির্মল, অথচ অসমাপ্ত প্রেমের গল্প।
(চলবে…)