ঢাকা, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬,
সময়: ০২:১৪:৫৫ AM

উপন্যাস:“কষ্ট”

মান্নান মারুফ
12-04-2026 01:18:27 PM
উপন্যাস:“কষ্ট”

পর্ব ৫

সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়ার আগেও মানুষের ভেতরে একটা ছোট্ট আলো বেঁচে থাকে।
একটা ক্ষীণ আশা—যাকে বলে, “আরেকবার চেষ্টা কর…”

কুদ্দুছের ভেতরেও সেই আলোটা এখনও পুরোপুরি নিভে যায়নি।

সেদিন ভোরে হঠাৎ করেই তার ঘুম ভেঙে যায়।

কোনো দুঃস্বপ্ন না, কোনো শব্দ না—তবুও ঘুম ভাঙে।

সে উঠে বসে।

ঘরটা আগের মতোই অন্ধকার, অগোছালো।

কিন্তু আজ তার মনে একটা অদ্ভুত অনুভূতি কাজ করছে।

“এভাবে আর চলতে পারে না…”

সে নিজের সাথে কথা বলে।

কয়েকদিন আগেও এই চিন্তাটা তার মাথায় আসত, কিন্তু আজ সেটা একটু জোরালো।

আজ তার মনে হচ্ছে—
যদি সে এখন কিছু না করে, তাহলে সে সত্যিই হারিয়ে যাবে।

কুদ্দুছ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়।

বালতির পানি দিয়ে মুখ ধোয়।

অনেকদিন পর সে আয়নার সামনে একটু বেশি সময় দাঁড়ায়।

চোখের নিচে কালি, মুখে ক্লান্তি—

তবুও সে নিজের দিকে তাকিয়ে বলে—

“আমি এখনও শেষ হয়ে যাইনি।”

এই একটা বাক্যই যেন তাকে একটু শক্তি দেয়।

সেদিন সে ঘরটা পরিষ্কার করে।

পুরনো কাপড় গুছায়, মেঝে ঝাড়ু দেয়, টেবিল মুছে।

এই ছোট ছোট কাজগুলো করতে করতেই তার মনে হয়—

সে যেন নিজের ভেতরটাও একটু গুছাচ্ছে।

দুপুরের দিকে সে বাইরে বের হয়।

আজ তার হাঁটার ভঙ্গি আগের মতো না।

ক্লান্তি আছে, কিন্তু সাথে একটা দৃঢ়তাও আছে।

সে সিদ্ধান্ত নেয়—
আজ সে যেকোনো একটা কাজ নিয়ে ফিরবে।

ছোট হোক, বড় হোক—কিছু একটা।

প্রথমে সে একটা রেস্টুরেন্টে যায়।

ম্যানেজারের সাথে কথা বলে।

“স্যার, আমি কাজ করতে চাই। যেকোনো কাজ।”

ম্যানেজার তাকে দেখে।

“অভিজ্ঞতা আছে?”

কুদ্দুছ এবার একটু ভিন্নভাবে উত্তর দেয়—

“না। কিন্তু আমি শিখতে প্রস্তুত। যত কষ্টই হোক।”

ম্যানেজার কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে।

তারপর বলে—

“এখন লোক লাগবে না। পরে আসবেন।”

আগের মতো এই উত্তর শুনে কুদ্দুছ ভেঙে পড়ে না।

সে শুধু মাথা নাড়ে।

“ঠিক আছে।”

এরপর সে একের পর এক জায়গায় যায়।

দোকান, গুদাম, অফিস—

সবখানেই একই প্রশ্ন, একই উত্তর।

কিন্তু আজ একটা জিনিস আলাদা—

সে হাল ছাড়ছে না।

বিকেলের দিকে সে খুব ক্লান্ত হয়ে পড়ে।

পা ব্যথা করছে, শরীর দুর্বল।

সে একটা রাস্তার পাশে বসে পড়ে।

তার মনে হয়—

হয়তো আজও কিছু হবে না।

ঠিক তখনই তার চোখে পড়ে একটা ছোট্ট সাইনবোর্ড—

“ডেলিভারি ম্যান প্রয়োজন”

কুদ্দুছ উঠে দাঁড়ায়।

শেষ শক্তিটুকু নিয়ে ভেতরে ঢোকে।

একটা ছোট কুরিয়ার সার্ভিস।

ভেতরে একজন মধ্যবয়স্ক লোক বসে আছে।

কুদ্দুছ এগিয়ে যায়—

“স্যার, আমি কাজটা করতে চাই।”

লোকটা তাকে দেখে।

“বাইক আছে?”

কুদ্দুছ একটু থামে।

“না…”

লোকটা মাথা নাড়ে—

“তাহলে হবে না।”

কুদ্দুছের ভেতরটা আবার ভেঙে যায়।

সে ঘুরে বের হয়ে আসতে যায়।

ঠিক তখনই লোকটা ডাকে—

“এই শোনেন!”

কুদ্দুছ থামে।

পেছনে তাকায়।

লোকটা বলে—

“আপনি যদি সাইকেল চালাতে পারেন, তাহলে একটা ব্যবস্থা করা যেতে পারে। বেতন কম হবে, কাজ কষ্টের।”

কুদ্দুছের চোখে হঠাৎ করে একটা আলো জ্বলে ওঠে।

“আমি পারি, স্যার!”

লোকটা বলে—

“ঠিক আছে, কাল থেকে আসবেন। দেখি কতদিন টিকতে পারেন।”

এই “দেখি কতদিন টিকতে পারেন” কথাটাও চ্যালেঞ্জের মতো লাগে কুদ্দুছের কাছে।

সে বাইরে বের হয়।

তার মনে হয়—

আজ সে কিছু একটা পেয়েছে।

ছোট, কিন্তু নিজের।

রাতে ঘরে ফিরে সে অনেকদিন পর হাসে।

একটা হালকা, শান্ত হাসি।

পরদিন সকাল।

কুদ্দুছ খুব ভোরে উঠে।

প্রস্তুত হয়।

তার প্রথম দিন।

কাজটা সহজ না।

সারাদিন সাইকেল চালিয়ে পার্সেল ডেলিভারি করতে হয়।

রোদ, ধুলো, ক্লান্তি—

সবকিছু মিলে শরীর ভেঙে যায়।

প্রথম দিনেই সে কয়েকবার ভুল করে।

ঠিকানা খুঁজে পায় না, দেরি হয়।

কিছু লোক তার সাথে খারাপ ব্যবহার করে।

একজন তো সরাসরি বলে—

“এই কাজও ঠিকমতো করতে পারো না?”

এই কথাটা শুনে কুদ্দুছের ভেতরটা কেঁপে ওঠে।

কিন্তু সে এবার চুপ থাকে।

প্রতিবাদ করে না।

হালও ছাড়ে না।

রাতে ঘরে ফিরে তার শরীর ব্যথায় ভরে যায়।

সে বিছানায় শুয়ে পড়ে।

কিন্তু আজ তার কষ্টটা অন্যরকম।

এই কষ্টে অপমান আছে, পরিশ্রম আছে—

কিন্তু একটা জিনিসও আছে—

অর্থ।

হয়তো খুব কম।

কিন্তু এটা তার নিজের উপার্জন।

সে মনে মনে ভাবে—

“আমি পারবো…”

পরের দিন, তার পরের দিন—

ধীরে ধীরে সে কাজটা শিখে যায়।

লোকজন এখনও তাকে ছোট করে দেখে।

অনেকে অবহেলা করে।

কিন্তু কুদ্দুছ এখন আর সেগুলো নিয়ে ভাবে না।

কারণ তার একটা লক্ষ্য তৈরি হয়েছে—

নিজেকে আবার দাঁড় করানো।

একদিন ডেলিভারি দিতে গিয়ে সে হঠাৎ করে ঐশিকে দেখে।

একটা বড় শপিং মলের সামনে।

ঐশি হাসছে, তার পাশে সেই ভদ্রলোক।

কুদ্দুছ থেমে যায়।

কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে।

ঐশি তাকে দেখে।

এক সেকেন্ডের জন্য।

তারপর আবার অন্যদিকে তাকায়।

আগে এই দৃশ্যটা কুদ্দুছকে ভেঙে দিত।

কিন্তু আজ—

সে শুধু হালকা একটা নিঃশ্বাস ফেলে।

তারপর সাইকেল চালিয়ে চলে যায়।

কারণ সে বুঝে গেছে—

তার জীবন এখন অন্য পথে চলছে।

রাতে ঘরে ফিরে সে আকাশের দিকে তাকায়।

তার মনে হয়—

সবকিছু এখনও শেষ হয়ে যায়নি।

হয়তো এই পথটাই তাকে কোথাও নিয়ে যাবে।

হয়তো না।

কিন্তু সে এবার থামবে না।

কারণ এটা তার শেষ চেষ্টা।

এবং এই চেষ্টাই হয়তো তার জীবন বদলে দেবে…

অথবা সম্পূর্ণ ভেঙে দেবে।

কিন্তু এবার—

সে লড়াই করবে।

চলবে.........