পর্ব-৬
সেদিন রাতে কুদ্দুছ ঘুমাতে পারেনি। বারবার ফোনটা হাতে নিয়ে নাম্বারটার দিকে তাকাচ্ছিল। কল করবে কি করবে না—এই দ্বিধার মধ্যেই রাত কেটে গেল।
পরদিন বিকেলে আর নিজেকে থামাতে পারলো না।
সে ফোন করলো।
ফোনের ওপাশে কয়েকবার রিং হওয়ার পর একটি নরম কণ্ঠ ভেসে এলো,
—হ্যালো…
কুদ্দুছের বুক কেঁপে উঠলো।
—আপনি… কেমন আছেন?
—ভালো… আপনি?
—আমি… ভালো আছি।
এই “ভালো আছি” কথাটার মধ্যেই যেন লুকিয়ে ছিল অজস্র না বলা কথা।
কুদ্দুছ ধীরে ধীরে কথা বাড়াতে লাগলো।
—আপনার বাবা কেমন আছেন?
—ভালো আছেন।
—আপনার… বাড়ির সবাই?
—আমরা তো দুজনই…
কথাগুলো খুব সাধারণ ছিল, কিন্তু তবুও তাদের মধ্যে এক ধরনের গভীরতা তৈরি হচ্ছিল। যেন দুইটা একাকী মন ধীরে ধীরে একে অপরের কাছে খুলে যাচ্ছে।
কথা বলতে বলতে কখন যে আধাঘণ্টা, তারপর এক ঘণ্টা পার হয়ে গেল—কেউ টেরই পেল না।
হঠাৎ কুদ্দুছ মনে করলো, একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনো অজানা।
সে একটু থেমে বলল,
—আপনার পুরো নামটা তো জানা হলো না…
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর মেয়েটি বলল,
ঐশি।
—ঐশি?—কুদ্দুছ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো।
—হ্যাঁ… নাম ঐশি। হাসতে হাসতে বলল, সেদিন যে ঐশি বলেছি ওটা আমার সার্টিফিকেটের নাম । কিন্তু সবাই আমাকে নীল বলেই ডাকে। এখন তো সবাই আমাকে এই নামেই চেনে।
“নীল”—শব্দটা কুদ্দুছের মনে এক অদ্ভুত অনুভূতি তৈরি করলো। নীল মানে আকাশ, নীল মানে গভীরতা, নীল মানে এক ধরনের অজানা বিষণ্ণতা।
ঠিক যেন এই মেয়েটির মতোই।
কুদ্দুছ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—নীল… একটা কথা বলবো?
—বলুন।
কুদ্দুছের গলা কেঁপে উঠলো।
—তোমাকে আমি অনেক ভালোবেসে ফেলেছি।
ওপাশে হঠাৎ নীরবতা নেমে এলো।
কুদ্দুছ বলতে থাকলো,
—আমি জানি না কেন… কিভাবে… কিন্তু তোমাকে ছাড়া এখন কিছুই বুঝি না। তুমি আমার জীবনে হঠাৎ করে এসে সবকিছু বদলে দিয়েছো।
নীল কিছু বলছে না।
—তুমি কি আমাকে কষ্ট দেবে?—কুদ্দুছের কণ্ঠে অসহায়তা,—আমার মতো করে কি তুমি আমাকে ভালোবাসতে পারবে?
ফোনের ওপাশে দীর্ঘ নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা গেল।
তারপর নীল ধীরে বলল,
—তুমি খুব সহজভাবে ভালোবাসতে পারো, কুদ্দুছ। কিন্তু আমার জীবনটা এত সহজ না…
কুদ্দুছ থেমে গেল।
—মানে?
—মানে… আমি চাই না, কেউ আমার জন্য কষ্ট পাক।
—আমি তো আগেই কষ্টে আছি,—কুদ্দুছ মৃদু হেসে বলল,—তোমাকে না পেলে এই কষ্ট আরও বাড়বে।
নীল চুপ করে রইলো। তার বুকের ভেতর যেন একটা ঝড় বইছে।
—তুমি বুঝতে পারছো না,—নীল বলল,—আমার সাথে জড়িয়ে পড়া মানে… নিজেকে হারিয়ে ফেলা।
—আমি তো আগেই হারিয়ে গেছি,—কুদ্দুছ শান্ত গলায় বলল,—তোমার চোখে প্রথম যেদিন তাকিয়েছিলাম, সেদিনই।
এই কথাটা শুনে নীলের চোখে পানি এসে গেল। কিন্তু সে সেটা লুকানোর চেষ্টা করলো।
—তুমি কেন এত ভালো কথা বলো?—নীল কাঁপা গলায় বলল।
—কারণ আমি সত্যি বলি।
আবার নীরবতা।
এই নীরবতার মধ্যেই যেন তাদের ভালোবাসার প্রথম অধ্যায় লেখা হচ্ছিল।
কিছুক্ষণ পর নীল বলল,
—ঠিক আছে… আমরা কথা বলবো। কিন্তু একটা শর্ত আছে।
—কি শর্ত?
—তুমি কখনো আমাকে জোর করবে না। আমার জীবনের কিছু কথা আছে… যা আমি এখন বলতে পারবো না।
কুদ্দুছ এক মুহূর্তও দেরি না করে বলল,
—আমি তোমার সব শর্ত মেনে নেবো।
নীল মৃদু হেসে বলল,
—তুমি খুব বোকা।
—হ্যাঁ… তোমার জন্য বোকা হয়ে গেছি।
এই প্রথম নীল একটু হেসে উঠলো—একটা নরম, বিষণ্ণ হাসি।
কথা শেষ হলো অনেক রাতে।
ফোন কেটে যাওয়ার পরও কুদ্দুছ অনেকক্ষণ মোবাইলটা হাতে ধরে বসে রইলো। তার মনে হচ্ছিল, সে যেন নতুন একটা পৃথিবীতে পা দিয়েছে—যেখানে শুধু নীল আর সে।
কিন্তু সে জানে না—এই নীল রঙের আকাশের নিচে কতটা ঝড় লুকিয়ে আছে।
আর নীল… জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল।
তার চোখে পানি।
সে একা একা আস্তে করে বলল,
—তুমি কেন আমাকে ভালোবাসলে, কুদ্দুছ…?
কারণ সে জানে—তার জীবনের গল্পে ভালোবাসা মানেই শেষ পর্যন্ত এক গভীর ট্র্যাজেডি।
তবুও, ভালোবাসা কি কখনো থেমে থাকে…?
চলবে…