ঢাকা, রবিবার, ২২ মার্চ ২০২৬,
সময়: ০২:৪৬:১২ PM

উপন্যাস: সেই মেয়েটি

মান্নান মারুফ
22-03-2026 01:01:07 PM
উপন্যাস: সেই মেয়েটি

পর্ব-২

কুদ্দুছের মাথার মধ্যে হঠাৎ করেই একটা শয়তানি বুদ্ধি ঢুকে গেল। সেই অদৃশ্য হয়ে যাওয়া মেয়েটির রহস্য তাকে যেন ভিতর থেকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। তবুও, তার ভেতরের এক অংশ বিশ্বাস করতে চাইছিল—মেয়েটি বাস্তব, সে হারিয়ে যায়নি, কোথাও না কোথাও আছে।

আর আজ—সে তাকে আবার দেখেছে।

এইবার আর সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না।

কুদ্দুছ মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল—সে সরাসরি মেয়েটির সামনে গিয়ে দাঁড়াবে, আর তাকে প্রেমের প্রস্তাব দেবে। এই অদ্ভুত টান, এই অজানা অনুভূতির একটা নাম দরকার। সে নাম—ভালোবাসা।

যেই চিন্তা, সেই কাজ।

বন্ধুকে ইশারা করতেই সে মুচকি হেসে বললো,
—“এইবার তো দেখি আসল খেলা!”

দু’জন দ্রুত আবার একটা রিকশায় উঠে বসল।

—“ওই সামনে অনেক দুরে যে রিকশাটা যাচ্ছে, ওটাকে ফলো করেন।”
কুদ্দুছ বললো,
—“কিন্তু সামনে যাবেন না, দূর থেকে যাবেন।”

রিকশাওয়ালা মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।

রিকশা ধীরে ধীরে চলতে শুরু করলো।

সামনে মেয়েটি, পেছনে কুদ্দুছ।

এই দূরত্বটা যেন কুদ্দুছের জীবনের সবথেকে অদ্ভুত দূরত্ব—একটু এগোলেই পাওয়া যায়, কিন্তু তবুও ছোঁয়া যায় না।

মেয়েটির চুল বাতাসে উড়ছিল। রোদের আলোতে তার মুখটা কখনো উজ্জ্বল হয়ে উঠছিল, আবার কখনো ছায়ায় ঢেকে যাচ্ছিল। সেই লুকোচুরি খেলা কুদ্দুছের হৃদয়কে আরও অস্থির করে তুলছিল।

সে বুঝতে পারছিল—সে নিজের নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে।

—“দোস্ত, এত সিরিয়াস কেন?”
বন্ধু হাসতে হাসতে বললো।

কুদ্দুছ ধীরে বললো,
—“আমি ওর সাথে কথা বলবো।”

—“তারপর?”

—“তারপর… যা হওয়ার হবে।”

রিকশা এগোতে লাগলো।

রাস্তা ফাঁকা হতে শুরু করলো। লোকজন কমে গেল। চারপাশে এক ধরনের নিস্তব্ধতা নেমে এলো, যেন এই পৃথিবীর শব্দগুলোও ধীরে ধীরে থেমে যাচ্ছে।

হঠাৎ করেই মেয়েটির রিকশা থেমে গেল।

সে ধীরে ধীরে নেমে পড়লো।

কুদ্দুছের বুকের ভেতর ধক করে উঠলো।

—“থামান!”
সে রিকশাওয়ালাকে বললো।

রিকশা থামলো।

কুদ্দুছ আর তার বন্ধু দু’জনেই নেমে পড়লো।

কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে তারা হাঁটতে লাগলো। মেয়েটি সামনে এগিয়ে যাচ্ছিল—শান্ত, নির্লিপ্ত। যেন সে জানেই না কেউ তার পিছু নিয়েছে।

অথবা—

হয়তো জানে।

কুদ্দুছ আর অপেক্ষা করতে পারলো না।

সে দ্রুত কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে মেয়েটির সামনে দাঁড়িয়ে পড়লো।

মেয়েটি থেমে গেল।

ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকালো।

সেই চোখ—

সেই একই গভীরতা, একই রহস্য, একই অদ্ভুত শূন্যতা।

কুদ্দুছ কিছুক্ষণ কথা বলতে পারলো না।

তার গলা শুকিয়ে গেল।

বন্ধু দূরে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল।

অবশেষে কুদ্দুছ সাহস জোগাড় করে বললো,
—“আমি… তোমার সাথে একটু কথা বলতে চাই।”

মেয়েটি স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।

—“তুমি আবার এসেছো…”
সে ধীরে বললো।

কুদ্দুছ চমকে উঠলো।

—“তুমি… আমাকে চেনো?”

মেয়েটি হালকা হাসলো।

—“যারা একবার আমার পিছু নেয়, তারা আবার ফিরে আসে।”

এই কথাটা শুনে কুদ্দুছের বুক কেঁপে উঠলো।

—“আমি তোমাকে খুঁজছিলাম…”

—“খুঁজে পেয়েছো?”
মেয়েটি প্রশ্ন করলো।

কুদ্দুছ থেমে গেল।

সে কি সত্যিই তাকে খুঁজে পেয়েছে?

নাকি সে এখনও কোনো রহস্যের ভেতরেই ঘুরপাক খাচ্ছে?

—“আমি… তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি।”
হঠাৎ করেই বলে ফেললো সে।

কথাটা বলার সাথে সাথে চারপাশের বাতাস যেন থেমে গেল।

মেয়েটি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো।

তার চোখে কোনো বিস্ময় নেই।

শুধু এক অদ্ভুত দুঃখ।

—“ভালোবাসা?”
সে মৃদু হেসে বললো,
—“তুমি জানো ভালোবাসা কী?”

—“হয়তো জানি না… কিন্তু তোমাকে ছাড়া এখন কিছুই ভাবতে পারছি না।”

মেয়েটি ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো।

তার উপস্থিতি কুদ্দুছকে অদ্ভুতভাবে কাঁপিয়ে দিচ্ছিল।

—“তুমি ভুল করছো…”
সে বললো।

—“হয়তো… তবুও আমি থামবো না।”

মেয়েটির চোখে জল চিকচিক করলো।

—“আমার কাছাকাছি আসা মানে নিজেকে হারিয়ে ফেলা।”

—“তাহলে আমি হারাতে চাই।”

এই কথাটা শুনে মেয়েটি হঠাৎ চুপ হয়ে গেল।

তারপর ধীরে বললো,
—“তুমি জানো না আমি কে…”

—“জানতে চাই।”

—“জানলে তুমি পালিয়ে যাবে।”

—“না, যাবো না।”

মেয়েটি দীর্ঘশ্বাস ফেললো।

চারপাশে তখন সন্ধ্যা নেমে আসছে। আকাশে লালচে আভা, বাতাসে এক অদ্ভুত শীতলতা।

—“তুমি কেন আমার পিছু নিলে?”
মেয়েটি জিজ্ঞেস করলো।

কুদ্দুছ একটু ভেবে বললো,
—“কারণ তুমি আলাদা…”

—“সবাই প্রথমে তাই ভাবে।”

—“তাহলে আমি সবাই না।”

মেয়েটি তাকিয়ে রইলো।

কুদ্দুছের চোখে এক ধরনের জেদ।

একটা অদ্ভুত ভালোবাসা।

যা হয়তো খুব দ্রুত জন্মেছে, কিন্তু তবুও সত্যি।

—“তোমার নাম কী?”
কুদ্দুছ জিজ্ঞেস করলো।

মেয়েটি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললো,
—“নাম দিয়ে কী হবে?”

—“ডাকবো…”

—“ডাকলে আমি আসবো না।”

—“তবুও জানতে চাই।”

মেয়েটি ধীরে বললো,
—“আমাকে অনেকে অনেক নামে ডাকে… কিন্তু তুমি আমাকে একটা নামেই মনে রাখো—‘সেই মেয়েটি’।”

কুদ্দুছের বুকটা হঠাৎ ভারী হয়ে উঠলো।

—“তুমি আবার আমার সাথে দেখা করবে?”

মেয়েটি একটু হাসলো।

—“আমি তো আছিই… তুমি-ই খুঁজে পাও না।”

এই কথা বলে সে ধীরে ধীরে পেছন ফিরে হাঁটতে শুরু করলো।

কুদ্দুছ চিৎকার করে বললো,
—“আমি তোমাকে হারাতে চাই না!”

মেয়েটি থামলো না।

শুধু বললো,
—“আমাকে পাওয়া যায় না… শুধু অনুভব করা যায়…”

তারপর অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেল।

কুদ্দুছ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।

তার মনে হচ্ছিল—সে এক অদ্ভুত খেলায় জড়িয়ে পড়েছে।

যেখানে ভালোবাসা আছে,
কিন্তু নিশ্চয়তা নেই।

যেখানে অনুভূতি আছে,
কিন্তু বাস্তবতা নেই।

বন্ধু এসে পাশে দাঁড়ালো।

—“কি হলো?”

কুদ্দুছ ধীরে বললো,
—“আমি শেষ হয়ে যাচ্ছি…”

—“কেন?”

—“কারণ আমি তাকে ভালোবেসে ফেলেছি…”

তার চোখে তখন এক ধরনের শূন্যতা।

আর সেই শূন্যতার ভেতরেই জন্ম নিচ্ছে—

একটি ভালোবাসা,

যার পরিণতি হয়তো শুধু ট্রাজেডি…

চলবে…