ঢাকা, শনিবার, ২১ মার্চ ২০২৬,
সময়: ০৩:০২:১০ PM

উপন্যাস: মালি

মান্নান মারুফ
20-03-2026 11:19:53 AM
উপন্যাস: মালি


পর্ব–৫

নাদিয়া এখন বাখেরগঞ্জের সেই ছোট্ট গ্রামের টিনের চালের বাড়িতে। যেদিন প্রথম এসে দাঁড়াল নাদিয়া, সেদিন যেন পুরো গ্রাম থমকে গিয়েছিল। চারদিকে হুলুস্থুল পড়ে গেল—বিদেশ ফেরত এক মেয়ে, যার চোখে একসময় শহরের ঝলমল আলো ছিল, সে এখন হাঁটছে কাদামাখা মেঠো পথে!

লোকজন দূর থেকে তাকিয়ে থাকত, কেউ কেউ ফিসফিস করে বলত—
“ওই যে… ওইটাই না কুদ্দুছের বউ?”
“বিদেশে ছিল নাকি!”
“তাইলে এইখানে আইলো ক্যান?”

এই প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর ছিল না নাদিয়ার কাছে। বা হয়তো ছিল—কিন্তু সে জানত, এই গ্রাম সেই উত্তর বুঝবে না।

প্রথম দিন থেকেই নাদিয়া বুঝে গেল—এখানে তাকে নতুন করে জন্ম নিতে হবে। তার আগের জীবন, তার সাজগোজ, তার ভাষা—সবকিছু যেন এখানে অচেনা।

সে ধীরে ধীরে বোরকা ছেড়ে সুতির শাড়ি পরা শিখল। প্রথমদিকে বারবার শাড়ি খুলে যেত, আঁচল ঠিক রাখতে পারত না। গ্রামের মেয়েরা কেউ কেউ সাহায্য করত, আবার কেউ মুচকি হেসে তাকিয়ে থাকত।

উনুনের সামনে বসে রান্না করতে গিয়ে তার চোখে পানি আসত। ধোঁয়ার কটু গন্ধে তার ফর্সা মুখ লাল হয়ে উঠত। হাত পুড়ে যেত মাঝে মাঝে। তবুও সে থামেনি।

কারণ সে জানত—এটাই এখন তার জীবন।


কিন্তু মানুষের কথা থামেনি।

গ্রামের মোড়ল একদিন সরাসরি কুদ্দুছকে ডেকে বলেছিল—
“এই মাইয়া তোদের মানায় না। শহরের মাইয়া, বিদেশের চালচলন—এই গ্রামে এহন কি হইবো?”

কুদ্দুছ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল। তার ভেতরে আগুন জ্বলছিল, কিন্তু সে কিছু বলতে পারেনি।

প্রতিবেশীরাও কম যায় না—
“জাত মারছে!”
“এই মাইয়ার জন্যই কুদ্দুছের সর্বনাশ হইবো!”

এই কথাগুলো বাতাসে ভাসত, আর নাদিয়ার কানে গিয়ে লাগত। প্রথমদিকে সে কাঁদত। রাতে চুপিচুপি কান্না করত, যাতে কুদ্দুছ না শুনতে পায়।

কিন্তু ধীরে ধীরে সে কান্নাও লুকাতে শিখে গেল।


কুদ্দুছের ভেতরের লড়াইটা ছিল আরও ভয়ংকর।

সে নাদিয়াকে ভালোবাসে—এই ভালোবাসা নিয়ে তার কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু যখন সে দেখে, নাদিয়া কষ্ট করে হাসার চেষ্টা করছে, গ্রামের মানুষের তিরস্কার সহ্য করছে, তখন তার বুকটা যেন ছিঁড়ে যায়।

একদিন সন্ধ্যায়, কুদ্দুছ বাড়ির উঠোনে বসে ছিল। নাদিয়া রান্নাঘরে ব্যস্ত। হঠাৎ সে দেখে, নাদিয়ার হাতের চামড়া পুড়ে গেছে।

“এইটা কিভাবে হইলো?” কুদ্দুছ ছুটে গিয়ে জিজ্ঞেস করল।

নাদিয়া হেসে বলল,
“কিছু না… উনুনে একটু লেগে গিয়েছিল।”

“তুমি আগে কখনো এইসব করো নাই… কেন করছো?”

নাদিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
“কারণ আমি এখন এই ঘরের মানুষ।”

এই কথাটা শুনে কুদ্দুছের চোখে পানি চলে আসে। সে মুখ ঘুরিয়ে নেয়, যাতে নাদিয়া দেখতে না পায়।


রাতগুলো ছিল সবচেয়ে কঠিন।

চারদিকে নীরবতা, দূরে কোথাও শেয়ালের ডাক, আর মাঝে মাঝে বাতাসে টিনের চাল কাঁপে। সেই শব্দে নাদিয়ার ঘুম ভেঙে যায়।

একদিন রাতে সে ধীরে ধীরে কুদ্দুছকে জিজ্ঞেস করল—
“তুমি কি আমাকে নিয়ে আফসোস করো?”

কুদ্দুছ চমকে ওঠে।
“এই কথা কেন বলো?”

“কারণ… আমি তোমার জীবনে শুধু সমস্যা নিয়ে এসেছি। তুমি যদি আমাকে না আনতে…”

কুদ্দুছ তার কথা শেষ করতে দেয় না।
“চুপ! তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য। সমস্যা না।”

নাদিয়া মৃদু হাসে।
“তাহলে এইসব কষ্ট কেন?”

কুদ্দুছ উত্তর দিতে পারে না। কারণ সে নিজেও জানে না—ভালোবাসা কেন এত কষ্ট দেয়।


দিন যায়, সময় এগোয়। নাদিয়া ধীরে ধীরে গ্রামের জীবনে মিশে যেতে থাকে।

সে এখন নিজে থেকে পানি তোলে, গরুকে ঘাস দেয়, উঠোন ঝাড়ু দেয়। গ্রামের কিছু মেয়েও এখন তার সাথে কথা বলে, হাসে।

কিন্তু তবুও একটা দূরত্ব থেকে যায়।

কারণ মানুষ সহজে বদলায় না।


একদিন হাটে যাওয়ার সময়, কয়েকজন লোক নাদিয়াকে দেখে কটাক্ষ করে—
“দেখছো, বিদেশের মেম এখন গরু চরায়!”
“এইটাই হইলো প্রেমের ফল!”

নাদিয়া মাথা নিচু করে হাঁটতে থাকে। তার চোখে পানি আসে, কিন্তু সে থামে না।

কুদ্দুছ সব শুনছিল। তার রক্ত যেন গরম হয়ে উঠল। সে ছুটে গিয়ে লোকগুলোর সামনে দাঁড়াল।

“আর একটা কথা কইলে সহ্য করুম না!”

লোকগুলো হাসতে থাকে—
“কি করবি? মারবি?”

কুদ্দুছ কিছু করতে পারে না। শুধু দাঁড়িয়ে থাকে, অসহায় হয়ে।


সেই দিন রাতে কুদ্দুছ একদম চুপ হয়ে যায়। নাদিয়া বুঝতে পারে—তার ভেতরে কিছু একটা ভেঙে যাচ্ছে।

“তুমি কিছু বলছো না কেন?” নাদিয়া জিজ্ঞেস করে।

কুদ্দুছ ধীরে ধীরে বলে,
“আমি তোমাকে এখানে এনে ভুল করছি।”

নাদিয়া থমকে যায়।
“তুমি কি আমাকে আর ভালোবাসো না?”

“ভালোবাসি… কিন্তু এই ভালোবাসা তোমাকে শুধু কষ্ট দিচ্ছে।”

নাদিয়া এগিয়ে এসে তার হাত ধরে।
“কষ্ট না থাকলে ভালোবাসার মূল্য বোঝা যায়?”

কুদ্দুছ মাথা নেড়ে বলে,
“কিন্তু আমি চাই না, তুমি আমার জন্য কষ্ট পাও।”

নাদিয়া মৃদু কাঁপা গলায় বলে,
“আমি তো কষ্ট পাই না… আমি শুধু তোমাকে হারানোর ভয় পাই।”


সেই রাতে হঠাৎ ঝড় শুরু হয়। প্রবল বাতাসে টিনের চাল কাঁপতে থাকে। বৃষ্টির শব্দে চারদিক ভেসে যায়।

নাদিয়া কুদ্দুছের পাশে এসে বসে।
“আমরা কি এই ঝড়টা পার করতে পারবো?”

কুদ্দুছ তার দিকে তাকায়। তার চোখে ক্লান্তি, ভয়, আর একটুখানি আশা।

“জানি না… কিন্তু আমরা চেষ্টা করবো।”


ঝড় থেমে গেলে, ভোরের আলো ধীরে ধীরে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

নাদিয়া উঠোনে দাঁড়িয়ে থাকে। ভেজা মাটির গন্ধ তার নাকে লাগে। সে গভীরভাবে শ্বাস নেয়।

তার মনে হয়—এই জীবন কঠিন, এই পথ কষ্টের… তবুও এই পথেই তার ভালোবাসা আছে।

কুদ্দুছ দূর থেকে তাকে দেখে। তার মনে হয়—এই মেয়েটা তার জীবনে আশীর্বাদ, আবার অভিশাপও।

সে জানে না, ভবিষ্যতে কী আছে। শুধু জানে—এই ভালোবাসা তাকে ভেঙে দিচ্ছে, আবার বাঁচিয়েও রাখছে।


দূরে গ্রামের মানুষজন আবার তাদের নিয়ে কথা বলছে। সমাজের চোখে তারা এখনও অপরাধী।

কিন্তু নাদিয়া আর কুদ্দুছ—তারা এখন আর শুধু সমাজের অংশ নয়, তারা নিজেদের এক আলাদা পৃথিবী বানানোর চেষ্টা করছে।

যেখানে কষ্ট আছে, অপমান আছে… কিন্তু ভালোবাসাও আছে।

আর সেই ভালোবাসাই হয়তো একদিন তাদের শেষ করে দেবে।

অথবা… নতুন করে বাঁচতে শেখাবে।

চলবে…