পর্ব – ৪
কি দুপুর, কি সকাল, কি রাত—মনে হয় তুমি সামনে আছ, আর আমি ডাগর চোখে তাকিয়ে আছি তোমার দিকে। তন্দ্রা ভেঙে যখন নিজ জগতে ফিরে আসি, তোমাকে দেখি না। তাই আজও জানতে ইচ্ছা করে—তুমি কেমন আছো? তুমি ভাল আছো কিনা জানাইও। পত্র দিও।
কুদ্দুছ এই লাইনগুলো লিখে অনেকক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল। তার মনে হচ্ছিল—এই কথাগুলো যেন শুধু লেখা নয়, বরং তার প্রতিদিনের বেঁচে থাকার সংজ্ঞা। সময় এখন আর তার কাছে সকাল, দুপুর, রাতের আলাদা কোনো অর্থ বহন করে না। সবকিছু যেন এক অদ্ভুত অপেক্ষার ভেতরে মিশে গেছে।
জীবনের প্রতিটি মুহূর্তেই নেহা যেন উপস্থিত।
সকালে ঘুম ভাঙার পর প্রথম যে অনুভূতিটা তার মনে জাগে, সেটাও নেহা। চোখ খুলেই সে একবার চারপাশে তাকায়—যেন কোনো অলৌকিকভাবে নেহা তার পাশে বসে আছে। কিন্তু বাস্তব খুব দ্রুত তাকে মনে করিয়ে দেয়—এটা শুধু কল্পনা।
দুপুরে অফিসের কাজের ফাঁকে হঠাৎ করেই কোনো একটা শব্দ, কোনো একটা গন্ধ, কিংবা কারো হাসি—সবকিছুই যেন নেহার কথা মনে করিয়ে দেয়। সহকর্মীরা যখন গল্প করে, হাসাহাসি করে, তখন কুদ্দুছ চুপ করে থাকে। তার ভেতরে তখন অন্য এক গল্প চলতে থাকে—যেখানে শুধু সে আর নেহা।
রাত হলো সবচেয়ে কঠিন সময়।
নিশীথের নীরবতায় যখন চারপাশ থেমে যায়, তখন স্মৃতিগুলো আরও জোরে ফিরে আসে। কুদ্দুছের মনে হয়—নেহা যেন তার সামনে বসে আছে। সে তাকিয়ে থাকে—ডাগর চোখে, অবাক হয়ে, যেন অনেকদিন পর কাউকে খুঁজে পেয়েছে।
সে মনে মনে বলে—
“নেহা, তুমি এতদিন কোথায় ছিলে?”
কিন্তু কোনো উত্তর আসে না।
হঠাৎ তন্দ্রা ভেঙে গেলে সে বুঝতে পারে—সবটাই তার কল্পনা।
বাস্তবতা তখন আরও নিষ্ঠুর মনে হয়।
কুদ্দুছ মাঝে মাঝে ভাবতে থাকে—মানুষ কি সত্যিই কাউকে এতটা অনুভব করতে পারে, যে বাস্তব আর কল্পনার সীমারেখা মুছে যায়?
তার কাছে উত্তরটা পরিষ্কার—হ্যাঁ, পারে।
কারণ, সে নিজেই তার প্রমাণ।
একদিন বিকেলে অফিস থেকে ফেরার পথে হঠাৎ করে কুদ্দুছ থমকে দাঁড়াল। রাস্তার পাশে একটা মেয়েকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল। দূর থেকে দেখতে ঠিক নেহার মতো লাগছিল।
তার বুক ধক করে উঠল।
সে একটু দ্রুত হাঁটতে শুরু করল। কাছে গিয়ে ডাকতে গিয়েও থেমে গেল।
মেয়েটি নেহা নয়।
কুদ্দুছ ধীরে ধীরে পিছিয়ে এল।
তার মনে হলো—সে যেন নিজেরই কাছে হেরে গেল।
বাসায় ফিরে এসে সে আয়নার সামনে দাঁড়াল। নিজের চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে এখন আর আগের সেই উজ্জ্বলতা নেই—বরং আছে ক্লান্তি, আর এক ধরনের নীরব যন্ত্রণা।
সে ধীরে ধীরে ডায়েরিটা বের করল।
এই ডায়েরিটাই এখন তার একমাত্র সঙ্গী।
সে লিখতে শুরু করল—
“নেহা,
আমি জানি না তুমি এখন কোথায় আছো।
তুমি কেমন আছো, সেটাও জানি না।
কিন্তু আমি জানি—আমি এখনো তোমার ভেতরেই আটকে আছি।
কি সকাল, কি দুপুর, কি রাত—সবসময় মনে হয় তুমি আমার সামনে।
আমি তাকিয়ে থাকি, কিছু বলতে চাই—কিন্তু তুমি কিছু বলো না।
তারপর হঠাৎ করেই সব শেষ হয়ে যায়।
আমি আবার একা হয়ে যাই।
তুমি কি কখনো আমাকে এভাবে মনে করো?”
লিখতে লিখতে কুদ্দুছ থেমে গেল।
তার মনে হলো—এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো সে কখনোই পাবে না।
হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো।
কুদ্দুছ চমকে উঠল।
দরজা খুলে দেখে, পোস্টম্যান।
আবার একটা চিঠি।
তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
খামটা হাতে নিয়েই সে বুঝে গেল—এটা নেহার।
হাত কাঁপতে লাগল।
সে ধীরে ধীরে খামটা খুলল।
চিঠিটা পড়তে শুরু করল—
“কুদ্দুছ,
তোমার চিঠি পড়ার পর অনেকদিন কিছু লিখতে পারিনি।
কারণ, কিছু অনুভূতি শব্দে প্রকাশ করা যায় না।
তুমি লিখেছ—তুমি আমাকে সবসময় অনুভব করো।
জানো, আমিও মাঝে মাঝে ঠিক একই জিনিস অনুভব করি।
রাতের বেলায় যখন সব চুপ হয়ে যায়,
মনে হয় তুমি আমার সামনে বসে আছো।
আমি তোমার দিকে তাকিয়ে থাকি—কিছু বলতে চাই,
কিন্তু বলতে পারি না।
হয়তো এটাই আমাদের নিয়তি—
আমরা অনুভব করব, কিন্তু বলতে পারব না…”
কুদ্দুছের চোখ ঝাপসা হয়ে গেল।
সে চিঠিটা বুকের কাছে চেপে ধরল।
নেহা আবার লিখেছে—
“তুমি জানতে চেয়েছ আমি ভালো আছি কিনা।
এই প্রশ্নের উত্তর খুব সহজ না।
আমি বেঁচে আছি—এটাই সত্যি।
কিন্তু ভালো আছি কিনা—সেটা জানি না।
কিছু সম্পর্ক থাকে, যেগুলো শেষ হয়ে গেলেও শেষ হয় না।
তুমি তেমনই একটা সম্পর্ক।
তুমি আমার জীবনে নেই,
তবুও তুমি আছো।”
এই লাইনগুলো কুদ্দুছের হৃদয়ে যেন গভীরভাবে আঘাত করল।
সে অনুভব করল—তারা দুজনই একই অনুভূতির মধ্যে আটকে আছে।
নেহা শেষ লাইনে লিখেছে—
“তুমি কেমন আছো, জানিও।
আর যদি সম্ভব হয়—পত্র দিও…”
চিঠিটা পড়ে কুদ্দুছ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
তার মনে হলো—এই চিঠিগুলোই এখন তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র উপায়।
তারা একে অপরকে দেখতে পারে না, ছুঁতে পারে না—
কিন্তু এই কাগজের শব্দগুলোই তাদের একমাত্র সেতু।
সেই রাতে কুদ্দুছ অনেকদিন পর একটু শান্তিতে ঘুমাল।
স্বপ্নে আবার নেহাকে দেখল।
কিন্তু এবার সে একা ছিল না।
নেহা তার সামনে বসে ছিল, হাসছিল।
কুদ্দুছ ধীরে বলল—
“তুমি এবার সত্যি এসেছো?”
নেহা শুধু হাসল।
সকালে ঘুম ভাঙার পর কুদ্দুছ বুঝল—এটা স্বপ্ন ছিল।
কিন্তু আজ তার খারাপ লাগল না।
কারণ, সে জানে—স্বপ্ন হলেও নেহা তার কাছে এসেছে।
সে আবার কলম তুলে নিল।
লিখতে শুরু করল—
“নেহা,
তোমার চিঠি পড়ে মনে হলো—আমি একা নই।
তুমিও একইভাবে আমাকে অনুভব করো।
হয়তো আমরা একসাথে নেই,
কিন্তু আমরা একে অপরের ভেতরে আছি।
এটাই কি ভালোবাসা?
নাকি এটা কোনো শাস্তি?”
কুদ্দুছ থেমে গেল।
তার মনে হলো—এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো কারোর কাছেই নেই।
তবুও সে লিখল—
“তুমি বলেছ—আমরা বলতে পারি না।
কিন্তু আজ একটা কথা বলি—
আমি এখনো তোমাকে ভালোবাসি।
এই ভালোবাসার কোনো দাবি নেই,
কোনো প্রত্যাশা নেই—
শুধু আছে একটুকরো অনুভূতি,
যা কখনো মরে না।
তুমি ভালো থেকো।
আর মাঝে মাঝে—পত্র দিও…”
চিঠিটা শেষ করে কুদ্দুছ জানালার দিকে তাকাল।
বাইরে সূর্যের আলো পড়েছে।
একটা নতুন দিন শুরু হয়েছে।
কিন্তু তার কাছে দিনটা নতুন না।
কারণ, তার জীবনের প্রতিটি দিন একই—
নেহাকে অনুভব করা,
আর তাকে না পাওয়া।
তবুও সে বেঁচে আছে।
কারণ, কোথাও একজন আছে—
যে তাকে একইভাবে অনুভব করে।
এই অনুভূতিটুকুই তার বেঁচে থাকার শক্তি।
কুদ্দুছ ধীরে ফিসফিস করে বলল—
“নেহা… তুমি ভালো থেকো…”
তার কণ্ঠে ছিল এক অদ্ভুত শান্তি।
হয়তো এই শান্তিটাই তাদের ভালোবাসার শেষ আশ্রয়।
(চলবে…)