পর্ব–৫
রিচি প্রতিদিনের মতো অফিসে আসে। ডেস্কে বসে কাজ করে ঠিকই, ফাইল ঘাঁটে, রিপোর্ট তৈরি করে, মেইলের জবাব দেয়—সবকিছু যেন নিয়মমাফিক চলছে। কিন্তু তার ভেতরের জগতটা আর আগের মতো নেই। কোথাও একটা অদৃশ্য ভয় তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে।
কুদ্দুছের বলা সেই কথাগুলো—“আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাই”—বারবার কানে বাজে। আর সেই কথার পর তার নিজের প্রতিক্রিয়া, তার ভয়, তার অস্বীকৃতি—সব মিলিয়ে এক অস্থিরতা।
তার মনে একটাই প্রশ্ন—
“যদি কুদ্দুছের পরিবার জানে?”
রিচি জানে, এই সমাজ সহজ না। এখানে একজন ডিভোর্সি মেয়ের জন্য বিচার আগে হয়, বোঝাপড়া পরে। আর কুদ্দুছ? সে তো এই সমাজেরই একজন ছেলে—তার পরিবার আছে, তাদের স্বপ্ন আছে, তাদের সামাজিক অবস্থান আছে।
রিচি নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করে—
“এই সম্পর্ক এখানেই থেমে যাওয়া ভালো…”
কিন্তু মন কি এত সহজে থামে?
অফিসে কুদ্দুছের সাথে দেখা হয় প্রতিদিন। কথা হয়, কিন্তু আগের মতো স্বাভাবিক না। দুজনেই যেন কিছু লুকিয়ে রাখছে—কেউ নিজের ভালোবাসা, কেউ নিজের ভয়।
এই নীরবতার মধ্যেই দিন কেটে যাচ্ছিল।
কিন্তু একদিন, সেই আশঙ্কাটাই সত্যি হলো।
কুদ্দুছ একরাতে সাহস করে বাড়িতে কথা বলেছিল।
প্রথমে ভেবেছিল—শান্তভাবে বলবে, বোঝাবে, তার সিদ্ধান্তের কথা জানাবে। কিন্তু সে বুঝতে পারেনি—এই কথাটা তার পরিবারের ভেতরে এমন ঝড় তুলবে।
ডাইনিং টেবিলে বসে সে বলল—
“আমি একটা মেয়েকে বিয়ে করতে চাই।”
মা প্রথমে হাসলেন, “ভালো কথা… কে মেয়ে?”
কুদ্দুছ একটু থেমে বলল, “ও আমার অফিসে কাজ করে… নাম রিচি।”
সবকিছু ঠিকই ছিল—যতক্ষণ না সে বলল—
“ও… ডিভোর্সি।”
শব্দটা যেন ঘরের ভেতর বিস্ফোরণের মতো পড়ল।
মায়ের মুখের হাসি মুহূর্তেই মুছে গেল।
বাবার চোখ কড়া হয়ে উঠল।
“কি বললি?”—বাবার কণ্ঠ ভারী।
কুদ্দুছ শান্ত থাকার চেষ্টা করল, “আমি ওকে ভালোবাসি।”
এরপর যা হলো, সেটা কুদ্দুছ কল্পনাও করেনি।
মা হঠাৎ বুকে থাপ্পড় মেরে কাঁদতে শুরু করলেন—
“হায় আল্লাহ! আমার ছেলের কপালে এ কী লিখে রেখেছিস!”
তিনি বিলাপ করতে লাগলেন, “দেশে কি মেয়ের আকাল পড়েছে? এত মেয়ের মধ্যে তুই একটা ডিভোর্সি মেয়েকেই পেলি?”
কুদ্দুছ কিছু বলতে গেল, কিন্তু মা শুনলেন না।
“আমার মুখ আমি কোথায় দেখাবো? মানুষ কি বলবে? আমাদের মান-সম্মান সব শেষ করে দিলি!”
বাবা এতক্ষণ চুপ ছিলেন। এবার তিনি ধীরে, কিন্তু কঠিন কণ্ঠে বললেন—
“দেশে কি মেয়ের আকাল পড়েছে, যে তুই একটা অন্যের ফেলে দেওয়া উচ্ছিষ্ট ঘরে তুলবি?”
এই কথাটা কুদ্দুছের বুকের ভেতর ছুরির মতো বিঁধল।
সে ধীরে বলল, “বাবা, আপনি এভাবে বলছেন কেন? সে মানুষ… তারও সম্মান আছে।”
“চুপ!”—বাবা গর্জে উঠলেন, “আমাকে শেখাতে আসিস না। আমি সমাজে মুখ দেখিয়ে চলি। তোর এই সিদ্ধান্ত আমাদের মাথা নিচু করে দেবে।”
কুদ্দুছের গলা শুকিয়ে গেল।
“আমি কাউকে ছোট করছি না,”—সে বলল, “আমি শুধু আমার জীবনের সিদ্ধান্ত নিচ্ছি।”
বাবা টেবিলে হাত চাপড়ালেন—
“এই বিয়ে করলে তুই আজ থেকে আমাদের পুত্র না। এই বাড়ির দরজা তোর জন্য চিরতরে বন্ধ!”
ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
এই একটা বাক্য যেন সবকিছু বদলে দিল।
মা কাঁদছেন, বাবা কঠোর মুখে বসে আছেন—আর কুদ্দুছ দাঁড়িয়ে আছে মাঝখানে, একা।
সে বুঝতে পারল—এই লড়াইটা শুধু ভালোবাসার না, এটা অস্তিত্বের লড়াই।
সেই রাতে সে ঘুমাতে পারেনি।
মনের মধ্যে একদিকে রিচির মুখ—তার ভয়, তার অস্বস্তি, তার অস্বীকৃতি।
অন্যদিকে নিজের পরিবার—যাদের জন্য সে এতদিন সবকিছু করেছে।
সে নিজেকে প্রশ্ন করল—
“আমি কি ভুল করছি?”
কিন্তু হৃদয় থেকে একটা উত্তর এলো—
“না… তুমি শুধু ভালোবাসছো।”
পরদিন অফিসে এসে কুদ্দুছ অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকল।
রিচি দূর থেকে তাকাচ্ছিল। সে বুঝতে পারছিল—কিছু একটা হয়েছে।
শেষমেশ সে এগিয়ে এলো।
“সব ঠিক আছে?”—রিচির কণ্ঠে উদ্বেগ।
কুদ্দুছ তাকাল। তার চোখে ক্লান্তি, কিন্তু কোথাও একটা দৃঢ়তা।
“আমি বাড়িতে বলেছি,”—সে ধীরে বলল।
রিচির মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
“কি বললেন তারা?”
কুদ্দুছ একটু হাসল—একটা বিষণ্ন হাসি।
“যেটা আপনি ভয় পাচ্ছিলেন… সেটাই।”
রিচির বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
“আমি বলেছিলাম…”—তার কণ্ঠ কাঁপছিল।
“হ্যাঁ, আপনি ঠিক ছিলেন,”—কুদ্দুছ বলল, “কিন্তু তবুও… আমি পিছিয়ে আসতে পারব না।”
রিচি চুপ করে গেল।
তার মনে হচ্ছিল—সে যেন কুদ্দুছের জীবনে ঝড় নিয়ে এসেছে।
“আপনি কেন এমন করছেন?”—সে বলল, “আপনার পরিবার… আপনার মা…”
কুদ্দুছ ধীরে বলল,
“আমি সারাজীবন ‘গুড বয়’ হয়ে থেকেছি। সবার কথা শুনেছি, সবার জন্য ভেবেছি। কিন্তু এবার… আমি নিজের জন্য ভাবতে চাই।”
রিচির চোখে পানি চলে এলো।
“এই ‘নিজের জন্য ভাবা’ যদি আপনাকে সবকিছু থেকে দূরে নিয়ে যায়?”
কুদ্দুছ একটু থামল।
তারপর বলল—
“তাহলে… হয়তো সেটাই আমার পথ।”
নীরবতা।
দুজনেই বুঝতে পারছিল—এখন তারা এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, যেখান থেকে ফিরে যাওয়া সহজ না।
রিচির ভেতরে ভয় আরও গভীর হলো।
সে জানে—এই পথে গেলে কুদ্দুছকে অনেক কিছু হারাতে হবে।
আর সে নিজে?
সে কি সেই দায়িত্ব নিতে পারবে?
“আমি চাই না আপনি আমার জন্য আপনার পরিবার হারান,”—রিচি ধীরে বলল।
কুদ্দুছ তাকাল তার দিকে।
“আপনি আমার জন্য না,”—সে বলল, “আপনি আমার সাথে।”
এই কথাটা শুনে রিচির চোখ ভিজে উঠল।
কিন্তু তার ভেতরের ভয় এখনো কাটেনি।
সে জানে—ভালোবাসা শুধু অনুভূতি না, এটা একটা কঠিন সিদ্ধান্ত।
আর সেই সিদ্ধান্তের পথটা কখনও সহজ না।
সেদিন অফিস শেষে তারা একসাথে বের হলো না।
দুজনেই আলাদা পথে হাঁটল—কিন্তু তাদের চিন্তা একই জায়গায় আটকে রইল।
ভালোবাসা… পরিবার… সমাজ…
এই তিনের টানাপোড়েনে এখন তাদের জীবন জড়িয়ে গেছে।
প্রশ্ন একটাই—
কে জিতবে?
ভালোবাসা?
নাকি বাস্তবতা?
গল্প এখানেই শেষ না।
কারণ এই লড়াই এখনো শেষ হয়নি—
বরং এখনই শুরু হলো তার সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়।
চলবে…