ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২৬,
সময়: ০৪:০৯:৩২ PM

উপন্যাস: গুডবয়

মান্নান মারুফ
26-03-2026 02:52:34 PM
উপন্যাস: গুডবয়

শেষ পর্ব

এভাবে কয়েকটি দিন কেটে গেল।

দিনগুলো যেন একই রকম—অফিস, কাজ, নীরবতা, আর ভেতরে জমে থাকা অজস্র অনিশ্চয়তা। কুদ্দুছ চেষ্টা করেছিল, বারবার চেষ্টা করেছিল—কথা বলে, বোঝিয়ে, সময় দিয়ে—কিন্তু তার মা-বাবার মন গলেনি। তাদের চোখে এই সম্পর্ক ছিল একরকম বিদ্রোহ, একরকম অসম্মান।

অন্যদিকে রিচি দিন দিন আরও চুপ হয়ে যাচ্ছিল। তার চোখে সেই পুরনো ভয় আবার ফিরে আসছিল—হারানোর ভয়, ভেঙে যাওয়ার ভয়, আবার একা হয়ে যাওয়ার ভয়।

কুদ্দুছ বুঝতে পারছিল—এই অবস্থাটা বেশিদিন চলতে পারে না।

একদিন সন্ধ্যায় সে রিচিকে কাছে ডাকল।

চায়ের দোকানটা প্রায় ফাঁকা। হালকা বাতাস বইছে।

“কাল কোনো কাজ রাখবেন না,”—কুদ্দুছ বলল।

রিচি একটু অবাক হলো, “কেন?”

“আমাদের একটা কাজ আছে… একটু সময় কাটাতে চাই।”

রিচি কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু কুদ্দুছ থামিয়ে দিল।

“প্লিজ… কাল আসবেন।”

তার কণ্ঠে এমন কিছু ছিল, যা রিচিকে আর প্রশ্ন করতে দিল না।


পরদিন সকাল।

ঘড়ির কাঁটা দশটা ছুঁইছুঁই।

রিচি এসে দাঁড়াল নির্দিষ্ট জায়গায়। কুদ্দুছ আগে থেকেই অপেক্ষা করছিল।

“চলুন,”—সে বলল।

“কোথায়?”—রিচির কণ্ঠে কৌতূহল।

“চলুন… সব বুঝবেন।”

কুদ্দুছ আজ অদ্ভুত রকমের নীরব। চোখে এক ধরনের দৃঢ়তা।

তারা রিকশায় উঠল। শহরের ব্যস্ত রাস্তা পেরিয়ে, ধীরে ধীরে এক পুরনো এলাকায় ঢুকল।

রিচির মনে অজানা শঙ্কা।

“কুদ্দুছ… কোথায় যাচ্ছি আমরা?”

কুদ্দুছ শুধু বলল—“আর একটু।”

রিকশা থামল একটা ছোট্ট দালানের সামনে।

দালানের দরজায় লেখা—
“কাজী অফিস”

রিচি যেন স্থির হয়ে গেল।

তার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।

“কুদ্দুছ… এটা…?”

কুদ্দুছ তার দিকে তাকাল। তার চোখে কোনো দ্বিধা নেই।

“আজ আমরা বিয়ে করব।”

এক মুহূর্তে যেন পৃথিবী থেমে গেল।

রিচির চোখে ভয়, বিস্ময়, আর এক অদ্ভুত আবেগ।

“না… না কুদ্দুছ, এটা হঠাৎ… আমি প্রস্তুত না…”—সে কাঁপা গলায় বলল।

কুদ্দুছ তার হাতটা ধরে ফেলল।

“আমি প্রস্তুত,”—সে বলল, “আর আমি জানি—আপনিও ভেতরে ভেতরে প্রস্তুত।”

“কিন্তু আপনার পরিবার—”

“আমি সব ভেবে নিয়েছি।”

“আপনি বুঝতে পারছেন না—”

“আমি সব বুঝে নিয়েই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি,”—কুদ্দুছ ধীরে কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলল।

রিচির চোখে পানি চলে এলো।

“আমি ভয় পাচ্ছি…”

কুদ্দুছ কাছে ঝুঁকে বলল—
“আমি আছি।”

এই তিনটা শব্দ আবার তাকে থামিয়ে দিল।

রিচি জানে—এই পথ সহজ না। কিন্তু এই মানুষটার ওপর তার বিশ্বাস আছে।

শেষমেশ, কোনো বড় আয়োজন ছাড়া, কোনো আড়ম্বর ছাড়া—একটা ছোট্ট ঘরে, দুজন সাক্ষীর সামনে—তাদের বিয়ে হয়ে গেল।

না ছিল গানের শব্দ, না ছিল আলো ঝলমল আয়োজন—ছিল শুধু দুটো হৃদয়ের নিঃশব্দ প্রতিশ্রুতি।


সেদিনই, এক বুক কষ্ট নিয়ে, একটা ছোট সুটকেস হাতে কুদ্দুছ তার বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে এলো।

পেছনে ফেলে এলো শৈশব, স্মৃতি, মায়ের আঁচল, বাবার ছায়া।

কিন্তু সামনে ছিল—রিচি।

আর সেই ভালোবাসা, যেটার জন্য সে সবকিছু ছেড়ে দিতে পেরেছে।

তারা শহরের এক সরু গলিতে একটা ছোট একরুমের বাসা ভাড়া নিল।

ঘরটা ছোট, সাদামাটা। একটা খাট, একটা টেবিল, আর ছোট্ট রান্নাঘর।

কিন্তু সেই ঘরেই শুরু হলো তাদের নতুন জীবন।


প্রথম কয়েকদিন সবকিছু যেন নতুন লাগছিল।

একসাথে থাকা, একসাথে খাওয়া, একসাথে ঘুম থেকে ওঠা—সবকিছুতেই এক ধরনের মধুরতা ছিল।

কিন্তু ধীরে ধীরে বাস্তবতা সামনে এলো।

দুজনেরই বেতন খুব কম।

মাসের শুরুতেই বাসা ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, বাজার—সবকিছু মিলিয়ে হিসাব মেলাতে গিয়ে তাদের কপালে ভাঁজ পড়ে।

মাঝে মাঝে এমন দিন আসে—যখন তারা অফিস থেকে হেঁটে বাড়ি ফেরে, শুধু রিকশাভাড়া বাঁচানোর জন্য।

শুক্রবারের বাজারে গিয়ে দামি মাছ বা মাংসের দিকে তাকিয়ে থাকে কুদ্দুছ, তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে কমদামের মাছ কিনে নেয়।

রিচি কিছু বলে না।

শুধু পাশে থাকে।

এই ছোট ছোট কষ্টগুলোই তাদের জীবনকে কঠিন করে তুলছিল।

কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার—এই কষ্টের মাঝেও তাদের সম্পর্ক ভাঙেনি।

বরং আরও দৃঢ় হয়েছে।


একদিন সন্ধ্যায় কুদ্দুছ খুব ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরল।

সারাদিন অফিসের কাজ, তারপর হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি ফেরা—শরীর ভেঙে পড়েছে।

দরজা খুলতেই সে দেখল—রিচি দাঁড়িয়ে আছে।

হাতে এক কাপ চা।

“এত দেরি কেন?”—রিচি হালকা বকুনি দিল।

কুদ্দুছ হাসল, “ট্রাফিক…”

রিচি কিছু বলল না। শুধু চায়ের কাপটা তার হাতে দিল।

দুজন পাশাপাশি বসে রইল।

কোনো কথা নেই।

কিন্তু সেই নীরবতার ভেতরেই ছিল এক অদ্ভুত শান্তি।

কুদ্দুছ রিচির চোখের দিকে তাকাল।

সেই চোখে এখন আর আগের মতো ভয় নেই, আতঙ্ক নেই, ভাঙনের ছাপ নেই।

বরং আছে—একটা গভীর নির্ভরতা।

একটা বিশ্বাস।

রিচি এখন হাসতে শিখেছে।

তার সেই হাসিতে আর কোনো কৃত্রিমতা নেই।

সে জানে—এই মানুষটা তাকে ভালোবেসে আপন করেছে, তার অতীতকে নয়, তার বর্তমানকে গ্রহণ করেছে।


তবুও, একটা শূন্যতা থেকে যায়।

কুদ্দুছের পরিবার।

আজও তারা তাকে মেনে নেয়নি।

কোনো যোগাযোগ নেই।

মাঝে মাঝে রাতে কুদ্দুছ চুপচাপ বসে থাকে। জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে।

রিচি বুঝতে পারে—সে কি ভাবছে।

একদিন রিচি ধীরে বলল—
“আপনি কি তাদের খুব মিস করেন?”

কুদ্দুছ একটু হাসল,
“হ্যাঁ… করি।”

“তাহলে… ফিরে যান না?”

কুদ্দুছ মাথা নাড়ল।

“আমি ফিরে যেতে পারি… কিন্তু আপনাকে রেখে না।”

রিচির চোখ ভিজে উঠল।

“আমি আপনার জীবনটা কঠিন করে দিয়েছি,”—সে বলল।

কুদ্দুছ তার হাত ধরল।

“না… আপনি আমার জীবনটা পূর্ণ করেছেন।”

এই কথাটা খুব বড় কিছু না, কিন্তু এর ভেতরে ছিল সত্য।


দিন যায়, মাস যায়।

তাদের জীবন সহজ হয় না—কিন্তু তারা শিখে যায় কিভাবে কঠিন জীবনকে সহজ করে নিতে হয়।

এক প্লেট খাবার ভাগ করে খাওয়া,
একটা পুরনো কাপড় নতুন করে ব্যবহার করা,
একটু হাসি দিয়ে সব ক্লান্তি ভুলে যাওয়া—

এই ছোট ছোট জিনিসগুলোই তাদের বড় করে তোলে।

তাদের ছোট্ট ঘরটা হয়তো বড় না,
কিন্তু সেখানে ভালোবাসার অভাব নেই।


এক রাতে, বিদ্যুৎ নেই।

ঘর অন্ধকার।

জানালা দিয়ে চাঁদের আলো ঢুকছে।

কুদ্দুছ আর রিচি পাশাপাশি বসে।

“আপনি কি কখনও আফসোস করেন?”—রিচি হঠাৎ জিজ্ঞেস করল।

“কিসের?”—কুদ্দুছ।

“সবকিছু ছেড়ে… আমাকে বিয়ে করার জন্য…”

কুদ্দুছ একটু ভেবে বলল—

“না… কখনও না।”

“কেন?”

“কারণ… আমি যা পেয়েছি, সেটা হারানোর মতো না।”

রিচি চুপ করে রইল।

তার চোখে জল, কিন্তু মুখে হাসি।


চার দেয়াল জানে—এই মানুষটা কতটা সাহসী।

সে শুধু ভালোবাসেনি—সে ভালোবাসার জন্য লড়েছে, ত্যাগ করেছে, দাঁড়িয়ে থেকেছে।

সে আর শুধু ‘গুড বয়’ না—

সে একজন প্রকৃত মানুষ।

আর রিচি?

সে আর শুধু এক আহত মেয়ে না—

সে একজন পূর্ণ মানুষ, যে আবার ভালোবাসতে শিখেছে।


বাইরের পৃথিবী হয়তো এখনো তাদের গল্প বোঝে না।

সমাজ হয়তো এখনো প্রশ্ন তোলে।

কিন্তু তাদের ছোট্ট ঘরের ভেতরে—

শান্তি আছে, সম্মান আছে, ভালোবাসা আছে।

আর সেটাই তো সবচেয়ে বড় সত্য।

সমাপ্ত।