“আমি মরে গেলেও তুমি কখনও কাদিও না। চোখের কোনে এক ফোঁটা জলও ফেলিও না। বরং হাসতে হাসতে বল—শেষমেষ পাগল ছেলেটির ঝামেলা থেকে আমি মুক্তি পেলাম। যে ছেলেটা অকারণে বেশি ভালোবাসত, যে ছেলেটা একটু মনোযোগ পেলেই বাঁচতে চাইত। যে ছেলেটা নিজের কষ্ট লুকিয়ে সবাইকে হাসাতে গিয়ে নিজেই হারিয়ে যেত। তার চলে যাওয়ায় ভালো। তার চলে যাওয়ায় নিশ্চয়ই হালকা লাগবে তোমার মন। আমি চলে যাওয়ার পর তুমি কি আসবে আমাকে দেখতে, নাকি আসবে আমাকে অবহেলার নমুনা বুঝাতে?”
চিঠির শেষ লাইনটা পড়তে পড়তে ঐশির হাত কাঁপছিল। কাগজের কোণ ভিজে উঠেছে অজান্তেই। অথচ সেই ছেলেটাই বলেছিল—“কান্না করিও না।” ঐশি নিজের চোখ মুছতে গিয়ে হঠাৎ থেমে গেল। যেন তার কান্না কুদ্দুছের ইচ্ছার বিরুদ্ধে এক ধরনের অপরাধ।
কুদ্দুছ—এই নামটা উচ্চারণ করলেই ঐশির মনে ভেসে উঠত এক হাসিখুশি, অদ্ভুত, বেখেয়ালি ছেলের মুখ। যে ছেলেটা সবসময় বলত, “তুমি থাকলে আমার পৃথিবীটা একটু সুন্দর লাগে।” অথচ সেই পৃথিবীটাই হয়তো ঐশি কখনো সত্যিকারের বুঝে উঠতে পারেনি।
তাদের পরিচয়টা ছিল খুব সাধারণ। কলেজের লাইব্রেরিতে। ঐশি তখন বইয়ের পাতায় মুখ গুঁজে থাকা এক শান্ত মেয়ে, আর কুদ্দুছ—অকারণে হাসতে থাকা এক চঞ্চল প্রাণ। প্রথমদিনই সে বলেছিল,
“তুমি এত চুপচাপ কেন? মনে হয় বইয়ের ভেতরেই বাসা বেঁধে ফেলেছো।”
ঐশি ভ্রু কুঁচকে তাকিয়েছিল, “আপনার সমস্যা কী?”
কুদ্দুছ হেসে বলেছিল, “সমস্যা নেই, আগ্রহ আছে।”
সেই আগ্রহটাই ধীরে ধীরে রূপ নেয় এক অদ্ভুত বন্ধুত্বে। আর সেই বন্ধুত্বই একসময় নিঃশব্দে ভালোবাসায় পরিণত হয়—যার খবর হয়তো শুধু কুদ্দুছই জানত, কিংবা অনুভব করত।
কুদ্দুছ কখনো সরাসরি ভালোবাসার কথা বলেনি। বরং তার ভালোবাসা ছিল ছোট ছোট কাজের ভেতর—
ঐশির পছন্দের বই খুঁজে এনে দেওয়া,
পরীক্ষার আগে নোটস বানিয়ে দেওয়া,
অকারণে মেসেজ করে বলা—“খেয়েছো?”
ঐশি এসবকে কখনো বিশেষ কিছু মনে করেনি। তার কাছে এগুলো ছিল “স্বাভাবিক যত্ন”, কিন্তু কুদ্রদুছের কাছে এগুলোই ছিল বেঁচে থাকার কারণ।
একদিন হঠাৎ কুদ্দুছ বলেছিল,
“তুমি জানো, আমি তোমাকে একটু বেশি ভালোবাসি।”
ঐশি হেসে বলেছিল,
“তুমি সবকিছুতেই একটু বেশি করো।”
সেই হাসির আড়ালে ঐশি বুঝতে পারেনি—কতটা গভীর ছিল সেই ভালোবাসা।
সময়ের সাথে সাথে ্ঐশির জীবনে পরিবর্তন আসতে শুরু করল। নতুন বন্ধু, নতুন ব্যস্ততা, নতুন স্বপ্ন। আর সেই ভিড়ে কোথায় যেন হারিয়ে যেতে লাগল কুদ্দুছ।
কুদ্দুছ তখনো আগের মতোই ছিল—অপেক্ষায়, ভালোবাসায়, আর একটুখানি মনোযোগের আশায়।
কিন্তু ঐশি আর আগের মতো সময় দিতে পারত না।
মেসেজের উত্তর দিত দেরিতে,
কল ধরত অনিচ্ছায়,
দেখা করত খুব কম।
কুদ্দুছ একদিন মৃদু স্বরে বলেছিল,
“তুমি কি বদলে গেছো?”
ঐশি বিরক্ত হয়ে বলেছিল,
“সবসময় তো একরকম থাকা যায় না।”
কুদ্দুছ আর কিছু বলেনি। শুধু হাসল—সেই চেনা হাসি, যার ভেতরে লুকানো ছিল অসংখ্য না বলা কষ্ট।
সেদিন বৃষ্টি হচ্ছিল। ভারী, অঝোর বৃষ্টি।
কুদ্কেদুছ ঐশিকে ফোন করেছিল।
“আজ একটু দেখা করবে?”
ঐশি বলেছিল,
“আজ না, খুব ব্যস্ত আছি।”
“একটু হলেও?”—কণ্ঠে ছিল অনুনয়।
“বলেছি তো পারব না!”—ঐশি রাগ করে ফোন কেটে দিয়েছিল।
সেদিনই কুদ্দুছ শেষবারের মতো চেষ্টা করেছিল।
তারপর ধীরে ধীরে সবকিছু নিঃশব্দ হয়ে গেল।
কুদ্দুছ আর ফোন করল না,
মেসেজ করল না,
কোনো খোঁজ নিল না।
ঐশি প্রথমে স্বস্তি পেয়েছিল,বলেছিল—“অবশেষে ঝামেলা কমল।”
কিন্তু কিছুদিন পর সেই নীরবতাই অদ্ভুতভাবে তাকে অস্থির করে তুলল।
সে একদিন নিজেই ফোন করল।
“হ্যালো?”
ওপাশে নীরবতা।
”কুদ্দুছ?”
কোনো উত্তর নেই।
তারপর এল সেই চিঠি।
একটা পুরনো খামে, খুব পরিচিত হাতের লেখায়।
আর সেই চিঠির শুরুতেই লেখা—
“আমি মরে গেলেও কান্না করিও না…”
ঐশির বুকের ভেতরটা হঠাৎ শূন্য হয়ে গেল।
সে দৌড়ে বেরিয়ে পড়ল।
কুদ্রদুছের বাড়ির দিকে।
রাস্তাটা আজ অদ্ভুত লাগছিল।
সবকিছু যেন থমকে গেছে।
বাড়ির সামনে মানুষের ভিড়।
কেউ ফিসফিস করছে, কেউ চুপচাপ দাঁড়িয়ে।
ঐশি ভিড় ঠেলে ভেতরে ঢুকল।
সাদা কাপড়ে ঢাকা একটা নিথর দেহ।
কুদ্দুছ ?
তার মুখে সেই চেনা হাসিটা নেই।
শুধু এক নিস্তব্ধতা।
কুদ্দুছের কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
তার চোখে জল এসে গিয়েছিল, কিন্তু সে জোর করে নিজেকে সামলাল।
কারণ কুদ্দুছ বলেছিল—
“কান্না করিও না…”
কিন্তু চোখের জল কি কথা শোনে?
এক ফোঁটা, দুই ফোঁটা—ঝরে পড়তেই লাগল।
ঐশি ফিসফিস করে বলল,
“তুমি তো বলেছিলে আমি আসব… আমি তো এসেছি… তুমি কেন নেই?”
চারপাশে মানুষজন কথা বলছিল—
“ছেলেটা খুব ভালো ছিল…”
“সবসময় হাসিখুশি…”
“কিন্তু ভিতরে কী ছিল, কেউ জানত না…”
্ঐশির মনে হচ্ছিল—সে-ই কি তবে সবচেয়ে বেশি না-জানা মানুষ?
যে এত কাছে থেকেও কিছুই বুঝতে পারেনি?
ঐশি ধীরে ধীরে কুদ্রদুছের পাশে বসে পড়ল।
তার ঠাণ্ডা হাতটা নিজের হাতে নিল।
“তুমি বলেছিলে, আমি এলে তুমি হাসবে… দেখো, আমি এসেছি… তুমি হাসছো না কেন?”
এ সময় ঐশির কণ্ঠ ভেঙে যাচ্ছিল।
“তুমি বলেছিলে, আমি না এলে কষ্ট পাবে… আমি তো এসেছি… এখন তো তুমি আর কষ্ট পাচ্ছো না?”
হঠাৎ মনে পড়ল—কুদ্রদুছের সেই কথাটা—
“আমি না থাকলে তুমি কি একবার আমাকে দেখতে আসবে?”
ঐশি তখন হেসে বলেছিল,
“তুমি মরলে আমি ফুল নিয়ে আসব।”
আজ সে সত্যিই ফুল নিয়ে এসেছে।
কিন্তু এই আসা কেন এত ভারী?
কুদ্রদুছের মা এসে ্ঐশির পাশে বসে বললেন,
“তুই ঐশি?”
ঐশি মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল।
“ও তোর কথা খুব বলত… খুব ভালোবাসত তোকে…”
এই কথাটা শুনে ্ঐশির বুকটা যেন ভেঙে গেল।
সে কাঁদতে চাইল, চিৎকার করতে চাইল—
কিন্তু মনে পড়ল—
“কান্না করিও না…” বলেছিল কুদ্দুছ।
রাত নেমে এলো।
সবকিছু ধীরে ধীরে নিঃশব্দ হয়ে গেল।
ঐশি একা বসে রইল।
তার মনে হচ্ছিল—
সে যেন সবকিছু হারিয়ে ফেলেছে, অথচ বুঝতেই পারেনি কখন হারিয়েছে।
সে ফিসফিস করে বলল,
“তুমি তো বলেছিলে, আমি এলে তুমি খুশি হবে… আমি এসেছি… দেরি হয়ে গেল?”
হয়তো সত্যিই দেরি হয়ে গেছে।
ভালোবাসা অপেক্ষা করে,
কিন্তু অবহেলা তাকে ধীরে ধীরে মেরে ফেলে।
পরদিন সকালে কুদ্দুছকে কবর দেওয়া হলো।
ঐশি দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখছিল।
তার মনে হচ্ছিল—
এই মাটির নিচে শুধু একটা মানুষ নয়,
একটা অসমাপ্ত ভালোবাসা,
একটা অপেক্ষা,
একটা নীরব আর্তনাদ চাপা পড়ে গেল।
দিন যায়, সময় এগিয়ে চলে।
ঐশি আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করে।
কিন্তু প্রতিদিন, প্রতিটা মুহূর্তে—
কোথাও না কোথাও কুদ্দুছ ফিরে আসে।
কখনো একটা গান হয়ে,
কখনো একটা স্মৃতি হয়ে,
কখনো একটা প্রশ্ন হয়ে—
“তুমি আসবে?”
একদিন ঐশি আবার সেই পুরানো চিঠিটা খুলে পড়ল।
শেষ লাইনে লেখা—
“তুমি যদি আসো, দেরি কোরো না…”
ঐশি মৃদু হেসে বলল,
“আমি দেরি করেছিলাম কুদ্দুছ… খুব দেরি…”
তার চোখ বেয়ে নীরব জল গড়িয়ে পড়ল।
ভালোবাসা কখনো জোর করে পাওয়া যায় না।
কিন্তু অবহেলা দিয়ে হারানো যায় খুব সহজেই।
কুদ্দুছ তার ভালোবাসা দিয়ে ঐশিকে জিততে দেয়নি,
কিন্তু তার না-থাকা দিয়ে তাকে হারিয়ে দিয়েছে চিরতরে।
আর ঐশি?
সে আজও মাঝে মাঝে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে—
“তুমি বলেছিলে, আমি আসব…
আমি এসেছিলাম কুদ্দুছ…
শুধু তুমি ছিলে না…”
শেষ।