যে সত্যিই ভালোবাসে,
সে অনেক সময় নীরব থাকে—
মুখে বলে না কখনো,
“ভালোবাসি”।
বর্ষার এক নরম বিকেল। আকাশ জুড়ে মেঘের মৃদু ভ্রুকুটি, আর বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ। শহরের কোলাহল থেকে একটু দূরে, পুরোনো একটি লাইব্রেরির বারান্দায় বসে ছিল হৃদয়। নামটা যেমন, মানুষটাও তেমনই—নরম, সংবেদনশীল, আর গভীর।
হৃদয়ের জীবনে অনেক মানুষ এসেছে, গেছে, কিন্তু তার মনে একটাই নাম গেঁথে ছিল—মেহরিন।
মেহরিনকে সে প্রথম দেখেছিল এই লাইব্রেরিতেই। এক কোণে বসে বই পড়ছিল মেয়েটি, জানালার পাশে। তার চুলের ওপর এসে পড়া সূর্যের আলো যেন তাকে আলাদা করে তুলেছিল চারপাশের সবকিছু থেকে। হৃদয় তখন বই খুঁজছিল, কিন্তু হঠাৎ করেই তার দৃষ্টি আটকে গেল সেই মেয়েটির দিকে।
সেদিন কথা হয়নি। শুধু দূর থেকে তাকিয়েছিল। কিন্তু অদ্ভুতভাবে, সেই এক নজরেই কিছু একটা বদলে গিয়েছিল তার ভেতরে।
পরের দিন আবার এল সে। অজান্তেই। নিজের কাছেই অজুহাত বানিয়ে—“বই দরকার”, “নোটস দরকার”… অথচ সত্যি ছিল একটাই—মেহরিনকে দেখা দরকার।
দিন যায়, সপ্তাহ যায়। তাদের চোখে চোখ পড়ে, মাঝে মাঝে হালকা হাসি বিনিময় হয়। তারপর একদিন, সাহস করে হৃদয় বলল—
“আপনি কি এই বইটা শেষ করেছেন? আমি নেবো।”
মেহরিন তাকিয়ে মুচকি হেসে বলেছিল—
“শেষ হয়নি, তবে আপনি চাইলে নিতে পারেন।”
সেই ছিল শুরু।
তাদের বন্ধুত্বটা ছিল অদ্ভুতভাবে স্বচ্ছ। কোনো তাড়াহুড়া নেই, কোনো নাটকীয়তা নেই। শুধু ধীরে ধীরে একে অপরকে জানার একটা সুন্দর প্রক্রিয়া।
হৃদয় খুব বেশি কথা বলত না। সে শুনতে ভালোবাসত। আর মেহরিন ছিল কথার মানুষ—সে গল্প করত, হাসত, নিজের ছোট ছোট অনুভূতিগুলো ভাগ করে নিত।
একদিন বৃষ্টির মধ্যে আটকে পড়ে তারা লাইব্রেরির ভেতরেই। বাইরে ঝমঝম শব্দ, ভেতরে নীরবতা।
মেহরিন হঠাৎ বলল—
“আপনি এত চুপচাপ কেন?”
হৃদয় একটু ভেবে বলল—
“সব কথা কি বলা দরকার?”
মেহরিন হেসে বলল—
“না, তবে কিছু কিছু কথা না বললে আফসোস থেকে যায়।”
সেই মুহূর্তে হৃদয় চেয়েছিল বলতে—
“আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
কিন্তু সে বলেনি।
কারণ তার মনে হয়েছিল, এই অনুভূতিটা এত সহজ নয় যে মুখে বলে ফেলা যায়।
সময় গড়িয়ে যায়। তাদের সম্পর্ক গভীর হয়, কিন্তু নাম পায় না।
মেহরিনের জীবনে অনেক প্রস্তাব আসে। পরিবার চায় সে বিয়ে করুক। সে এসব কথা মাঝে মাঝে হৃদয়কে বলত।
“জানো, মা বলছে এবার সিরিয়াসলি ভাবতে,” একদিন বলেছিল মেহরিন।
হৃদয় হেসে বলেছিল—
“ভালো তো। কারো তো জীবনটা গুছাতে হবে।”
কথাটা বলার সময় তার বুকের ভেতরটা হালকা কেঁপে উঠেছিল, কিন্তু মুখে কিছু বোঝা যায়নি।
মেহরিন তাকিয়ে ছিল কিছুক্ষণ। যেন কিছু খুঁজছিল হৃদয়ের চোখে।
“তুমি কিছু বলবে না?”
“কি বলবো?”
“কিছু না,” মেহরিন ধীরে বলেছিল।
সেই রাতটা হৃদয়ের জন্য খুব কঠিন ছিল। নিজের সঙ্গে নিজের যুদ্ধ। সে বুঝতে পারছিল—সে হারিয়ে ফেলছে মেহরিনকে। অথচ একটা শব্দ, একটা স্বীকারোক্তি হয়তো সবকিছু বদলে দিতে পারত।
কিন্তু সে নিজেকে বোঝাল—
“যদি সত্যিই ভালোবাসি, তাহলে তাকে তার মতো থাকতে দিতে হবে।”
কয়েক মাস পরে খবর এলো—মেহরিনের বিয়ে ঠিক হয়েছে।
হৃদয় খবরটা শুনে শুধু বলেছিল—
“ভালো হয়েছে।”
তারপর একা ঘরে ফিরে অনেকক্ষণ বসে ছিল। চোখে পানি ছিল না, কিন্তু ভেতরে যেন এক ঝড় বয়ে যাচ্ছিল।
বিয়ের আগের দিন মেহরিন তাকে দেখা করতে ডাকল।
পুরোনো সেই লাইব্রেরি। একই জায়গা। একই জানালা।
মেহরিন বলল—
“তুমি আসবে ভেবেছিলাম না।”
হৃদয় মৃদু হাসল—
“শেষবারের মতো দেখা না করে যাওয়া ঠিক না।”
কিছুক্ষণ চুপচাপ। তারপর মেহরিন ধীরে বলল—
“তুমি কখনো কিছু বললে না কেন?”
হৃদয় তাকাল তার দিকে—
“কি বলবো?”
মেহরিনের চোখে জল —
“তুমি জানো আমি কি বলতে চাই।”
হৃদয় গভীরভাবে নিঃশ্বাস নিল।
“সব কথা বলা যায় না, মেহরিন।”
“কেন?”
“কারণ কিছু অনুভূতি বললেই ছোট হয়ে যায়।”
মেহরিন কেঁদে ফেলল—
“তুমি জানো না, আমি কতদিন অপেক্ষা করেছি তোমার একটা কথার জন্য!”
হৃদয়ের বুকটা যেন ভেঙে যাচ্ছিল। তবু সে নিজেকে সামলাল।
“তুমি সুখী হও, এটাই চাই।”
“তুমি কি আমাকে ভালোবাসো না?”
একটা দীর্ঘ নীরবতা।
তারপর হৃদয় খুব আস্তে বলল—
“কিছু প্রশ্নের উত্তর না থাকাই ভালো।”
মেহরিন আর কিছু বলেনি। শুধু তাকিয়ে ছিল—একটা অসমাপ্ত গল্পের মতো।
সেদিনই ছিল তাদের শেষ দেখা।
বছর কেটে যায়।
হৃদয় এখনো সেই শহরেই থাকে। লাইব্রেরিটা এখনো আছে, যদিও আগের মতো নয়। অনেক কিছু বদলে গেছে, কিন্তু তার ভেতরের একটা জায়গা ঠিক আগের মতোই রয়ে গেছে।
মাঝে মাঝে সে সেই পুরোনো জায়গায় গিয়ে বসে। জানালার পাশে। যেখানে একদিন মেহরিন বসত।
তার হাতে এখনো একটা পুরোনো বই থাকে—যেটা তারা একসঙ্গে পড়েছিল।
এর ফাকে অনেকদিন পর একদিন হঠাৎ করে মেহরিনের সঙ্গে দেখা হয়ে যায় হৃদয়ের ।
অপ্রত্যাশিত। হঠাৎ।
মেহরিন বদলে গেছে—চেহারায় পরিপক্বতা, চোখে ক্লান্তি। কিন্তু সেই চেনা হাসিটা এখনো আছে।
“কেমন আছ?”
“ভালো,” হৃদয় বলল।
“তুমি?”
“ভালো আছি,” মেহরিনও বলল, যদিও তার কণ্ঠে একটা অদ্ভুত শূন্যতা ছিল।
কিছুক্ষণ কথা হলো। সাধারণ কথা। কিন্তু ভেতরে ভেতরে দুজনেই জানত—অনেক অজানা কথা রয়ে গেছে।
বিদায়ের আগে মেহরিন বলল—
“একটা কথা জিজ্ঞেস করবো?”
“করো।”
“তুমি কি কোনোদিন আমাকে ভালোবেসেছিলে?”
হৃদয় একটু হাসল।
তারপর বলল—
“ভালোবাসি কথাটা বলা সহজ…
যারা ভালোবাসে না, তারা নির্দ্বিধায় বলে দেয়—‘ভালোবাসি’।
কিন্তু যে সত্যিই ভালোবাসে…
সে অনেক সময় নীরব থাকে।”
মেহরিন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর চোখ মুছলো।
“তাহলে… তুমি আমাকে ভালোবাসতে?”
হৃদয় উত্তর দিল না।
শুধু মৃদু হাসল।
মেহরিন চলে গেল।
হৃদয় দাঁড়িয়ে রইল।
তার মনে হলো—কিছু গল্প কখনো শেষ হয় না। তারা শুধু থেমে যায়, সময়ের ভেতরে কোথাও।
আর কিছু ভালোবাসা…
মুখে বলা হয় না কখনো—
তবুও তারা থেকে যায়, গভীর, নীরব, আর অনন্ত।
সমাপ্ত।