পর্ব ৫
দূরত্ব শুধু কিলোমিটারে মাপা যায় না—দূরত্ব মাপা যায় অনুভূতিতে, সময়ে, আর পরিবর্তনে। কুদ্দুছ আর নীপার জীবনে এই দূরত্ব এখন আর শুধু ভৌগোলিক নয়, মানসিকভাবেও তারা অনেক দূরে সরে গেছে।
নীপা এখন কানাডায়। নতুন দেশ, নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষ—সবকিছুই তার জন্য একেবারে ভিন্ন। প্রথম প্রথম সে নিজেকে অনেক একা মনে করত। চারপাশে সবাই ব্যস্ত, কেউ কারো দিকে তেমন তাকায় না।
শীতের সকালে বরফে ঢাকা রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তার হঠাৎ করে মনে পড়ে যেত—বাংলাদেশের সেই উষ্ণ দুপুর, ক্যাম্পাসের কোলাহল, আর পরিচিত মুখগুলো।
সবচেয়ে বেশি মনে পড়ত—কুদ্দুছ।
যাকে সে ভুলে যেতে চেয়েছিল, সেই মানুষটাই যেন সবচেয়ে বেশি মনে পড়ত।
কিন্তু এবার সে নিজেকে থামিয়ে দিত।
“এগুলো শুধু স্মৃতি,”—সে নিজেকে বলত। “বাস্তব না।”
সময়ের সাথে সাথে নীপা নিজেকে মানিয়ে নিতে শিখে গেল। পড়াশোনায় মন দিল, নতুন বন্ধু বানালো, নতুন জীবনের ছন্দ খুঁজে পেল।
এবং একসময় সে বুঝতে পারল—মানুষ সত্যিই সবকিছুতে অভ্যস্ত হয়ে যায়।
অন্যদিকে, কুদ্দুছ তার নিজের জীবনে অনেকটাই স্থির হয়ে গেছে। তানিয়ার সাথে তার সম্পর্ক এখন অনেক গভীর। তারা প্রায়ই ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলে—চাকরি, বিয়ে, সংসার।
একদিন কুদ্দুছের পরিবার থেকে বিয়ের কথা ওঠে।
তানিয়ার পরিবারও রাজি।
সবকিছু যেন খুব দ্রুত এগিয়ে যেতে থাকে।
কুদ্দুছ নিজেও তেমন কোনো আপত্তি করে না।
কারণ সে বিশ্বাস করে—জীবনকে স্থির করতে হলে বাস্তব সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
ভালবাসা—এই শব্দটা এখন তার কাছে তেমন কোনো গুরুত্ব বহন করে না।
বরং সে মনে করে, সম্পর্ক মানে বোঝাপড়া, সুবিধা, আর স্থায়িত্ব।
একদিন তানিয়া তাকে জিজ্ঞেস করল,
“তুমি কি আমাকে ভালবাসো?”
কুদ্দুছ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
“আমি তোমার সাথে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। তুমি আমার জীবনের জন্য উপযুক্ত।”
তানিয়া একটু হেসে বলল,
“এটাই তো ভালবাসা, তাই না?”
কুদ্দুছ কিছু বলল না।
হয়তো সে নিজেও জানে না—এটা ভালবাসা, নাকি শুধু একটা সমঝোতা।
কিছুদিন পর তাদের বিয়ে হয়ে যায়।
সবকিছু খুব স্বাভাবিকভাবে, খুব নিয়ম মেনে।
কুদ্দুছ এখন বিবাহিত জীবন শুরু করে—একটা নতুন অধ্যায়।
বিয়ের পর তার জীবন আরও গুছিয়ে যায়। চাকরি, সংসার, দায়িত্ব—সবকিছু নিয়ে সে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
এদিকে নীপাও তার জীবনে এগিয়ে যাচ্ছে।
কানাডায় পড়াশোনা শেষ করে সে একটি ভালো চাকরি পেয়ে যায়।
তার জীবনে এখন আর আগের মতো শূন্যতা নেই।
একদিন তার পরিচয় হয়—আরিয়ানের সাথে।
আরিয়ান একজন প্রবাসী বাঙালি। শান্ত স্বভাবের, পরিণত, আর বাস্তববাদী।
প্রথমে তারা শুধু বন্ধু ছিল।
কিন্তু ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে একটা সম্পর্ক তৈরি হতে লাগল।
এই সম্পর্কটা আগের মতো তীব্র না, আবেগপূর্ণ না।
বরং অনেক শান্ত, স্থির।
একদিন আরিয়ান তাকে জিজ্ঞেস করল,
“তুমি কি কখনো কাউকে খুব গভীরভাবে ভালবেসেছিলে?”
নীপা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
“হ্যাঁ… কিন্তু এখন মনে হয়, সেটা হয়তো শুধু একটা সময়ের আবেগ ছিল।”
আরিয়ান মৃদু হেসে বলল,
“সব ভালবাসাই হয়তো একরকম না।”
এই কথাটা নীপাকে নতুন করে ভাবতে শেখাল।
হয়তো ভালবাসা সত্যিই একরকম না।
কেউ তীব্রভাবে ভালবাসে, কেউ শান্তভাবে।
কেউ হারিয়ে ফেলে, কেউ ধরে রাখে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত, সবকিছুই সময়ের উপর নির্ভর করে।
একদিন নীপা হঠাৎ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় কুদ্দুছের একটা ছবি দেখল—তার বিয়ের ছবি।
সে থেমে গেল।
কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে ফোনটা বন্ধ করে দিল।
অদ্ভুতভাবে, তার চোখে কোনো পানি এল না।
কোনো কষ্টও যেন তেমন অনুভব করল না।
শুধু একটা হালকা শূন্যতা।
সে বুঝতে পারল—সে অনেকটাই বদলে গেছে।
যে মানুষটা একসময় তার পুরো পৃথিবী ছিল, সে এখন শুধু একটা স্মৃতি।
আর সেই স্মৃতির সাথে এখন আর কোনো তীব্র অনুভূতি জড়িয়ে নেই।
অন্যদিকে, কুদ্দুছও মাঝে মাঝে নীপার কথা ভাবে।
কিন্তু সেই ভাবনাগুলো খুব বেশি সময় স্থায়ী হয় না।
কারণ তার এখন নতুন জীবন, নতুন দায়িত্ব।
একদিন রাতে, বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে সে হঠাৎ করে ভাবল—
“আমি কি কখনো সত্যিই কাউকে ভালবেসেছিলাম?”
এই প্রশ্নের উত্তর সে খুঁজে পেল না।
হয়তো সে ভালবেসেছিল—নিজের মতো করে।
অথবা হয়তো না।
সময় তাদের দুজনকেই অনেক দূরে নিয়ে গেছে।
একজন নিজের সংসারে ব্যস্ত।
আরেকজন নিজের নতুন জীবনে।
একদিন যারা একে অপরকে ছাড়া থাকতে পারত না, আজ তারা সম্পূর্ণ আলাদা দুই জগতের মানুষ।
এটাই কি বাস্তব?
হয়তো হ্যাঁ।
ভালবাসা, সম্পর্ক—সবকিছুই হয়তো সাময়িক।
মানুষ একসময় এগিয়ে যায়, নতুন মানুষ খুঁজে পায়, নতুন জীবন শুরু করে।
আর পুরোনো সবকিছু ধীরে ধীরে মুছে যায়।
কিন্তু পুরোপুরি কি মুছে যায়?
হয়তো না।
কিছু স্মৃতি থেকে যায়—নীরবে, গভীরে।
যেগুলো মাঝে মাঝে মনে করিয়ে দেয়—
একসময়, কোথাও,
কেউ একজন ছিল…
চলবে.......