ঢাকা, সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬,
সময়: ১০:০৪:১৮ PM

কর্মসংস্কৃতিতে পরিবর্তনের সতর্কবার্তা প্রধানমন্ত্রীর

মান্নান মারুফ
30-03-2026 08:36:35 PM
কর্মসংস্কৃতিতে পরিবর্তনের সতর্কবার্তা প্রধানমন্ত্রীর

দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই প্রশাসনে শৃঙ্খলা, জবাবদিহিতা এবং কর্মসংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তার সময়ানুবর্তিতা, আকস্মিক পরিদর্শন এবং সরাসরি বার্তা ইতোমধ্যে সরকারি কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই সকাল ৯টায় নির্ধারিত সময়ের আগেই কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে তিনি প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে এক ধরনের অপ্রস্তুত পরিস্থিতির সৃষ্টি করেন। দীর্ঘদিন ধরে দেরিতে অফিসে আসার অভ্যাস যাদের মধ্যে ছিল, তাদের জন্য এটি ছিল এক ধরনের সতর্কবার্তা। এরপর থেকে সংশ্লিষ্ট অনেক কর্মকর্তাই নির্ধারিত সময়ের আগেই অফিসে উপস্থিত হতে শুরু করেছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

প্রধানমন্ত্রীর এই সময়ানুবর্তিতা কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং একটি বার্তা—কাজের প্রতি দায়িত্বশীলতা ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করা। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, দাপ্তরিক কার্যক্রমে কোনো ধরনের শৈথিল্য তিনি দেখতে চান না।

এরই ধারাবাহিকতায় সাম্প্রতিক সময়ে তিনি পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে আকস্মিক পরিদর্শন শুরু করেছেন। এসব পরিদর্শনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কার্যক্রম সরাসরি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিচ্ছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই উদ্যোগ কর্মকর্তাদের মধ্যে নতুন করে দায়িত্ববোধ ও কাজের গতি বৃদ্ধি পেয়েছে। 

প্রধানমন্ত্রী সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে পরিষ্কার বার্তা দিয়েছেন যে, তিনি কোনো “চোর-পুলিশ খেলা” করতে চান না। অর্থাৎ, তিনি এমন কোনো পরিস্থিতি চান না যেখানে কর্মকর্তারা তার উপস্থিতি এড়িয়ে চলবেন বা ধরা পড়ার পর শুধরে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেবেন। বরং তিনি চান, প্রতিটি দপ্তরে স্বতঃস্ফূর্তভাবে দায়িত্বশীলতা এবং কার্যকর কাজের পরিবেশ গড়ে উঠুক।

সরকারি বিভিন্ন সেক্টরে যাদের সম্পৃক্ত করা হয়েছে, তাদের সঙ্গে আলাপচারিতায় একটি বিষয় বারবার উঠে এসেছে—প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্টদের ওপর আস্থা রাখছেন এবং সেই আস্থার প্রতিদান হিসেবে কার্যকর ফলাফল প্রত্যাশা করছেন। তিনি প্রায়ই বলেন, “আমি বিশ্বাস রাখছি, কাজ করে দেখান।” ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে আলোচনায় তিনি আরও বলেন, “আমি বিশ্বাসটা রেখেছি বুঝেশুনে, সেটার মূল্য রাখেন।” তার এই বক্তব্যগুলো দায়িত্বপ্রাপ্তদের জন্য এক ধরনের নৈতিক চাপ ও অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শুধু নির্দেশনা প্রদানেই নয়, নিজের আচরণ ও কর্মপদ্ধতির মাধ্যমেও উদাহরণ স্থাপন করছেন প্রধানমন্ত্রী। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় তা স্পষ্ট হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম একটি ঘটনা ঘটে জাতীয় সংসদ ভবনে। সরকারদলীয় সংসদ সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক শেষে বের হওয়ার সময় সংসদ ভবনের প্রবেশপথে কিছু কর্মকর্তা তার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। কেউ সালাম জানাচ্ছিলেন, কেউ ভিডিও ধারণ করছিলেন। সাধারণত এ ধরনের উপস্থিতি অনেক সময় ঊর্ধ্বতনদের সন্তুষ্ট করার একটি প্রচলিত রীতি হিসেবে দেখা হয়।

কিন্তু প্রধানমন্ত্রী এ ধরনের আচরণে সন্তুষ্ট হননি। বরং তিনি বিরক্তি প্রকাশ করে বলেন, “এদের কোনো কাজ নেই?” তিনি প্রশ্ন তোলেন, কেন কর্মকর্তারা নিজেদের কাজ ফেলে এভাবে দাঁড়িয়ে আছেন। তার এই প্রতিক্রিয়া প্রশাসনের ভেতরে একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—অপ্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা বা তোষামোদ নয়, বরং দায়িত্ব পালনই হচ্ছে কর্মকর্তাদের প্রধান কাজ।

পর্যবেক্ষকদের মতে, এই অবস্থান প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে। দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ‘তোষামোদ সংস্কৃতি’ থেকে বেরিয়ে এসে দক্ষতা ও কর্মদক্ষতাভিত্তিক পরিবেশ তৈরির প্রচেষ্টা এতে প্রতিফলিত হবে।

ঈদের বিরতির পর পুনরায় শুরু হওয়া জাতীয় সংসদের অধিবেশনেও একই ধরণের দৃশ্য দেখা গেছে। অধিবেশনের প্রথম দিন প্রধানমন্ত্রী নির্ধারিত সময়ের পাঁচ মিনিট আগেই সংসদে উপস্থিত হন। তবে তখনও অধিকাংশ সংসদ সদস্য উপস্থিত ছিলেন না। পরে অনেকেই নির্ধারিত সময়ের পরে এসে প্রধানমন্ত্রীকে আগেই উপস্থিত দেখে বিব্রত হন।

সংসদে প্রবেশের পর প্রধানমন্ত্রীকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সুশৃঙ্খলভাবে গুছিয়ে পূর্ণ প্রস্তুত অবস্থায় বসে থাকতে দেখা যায়। তার এই প্রস্তুতি ও সময়ানুবর্তিতা সংসদ সদস্যদের জন্যও একটি বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রধানমন্ত্রীর এই আচরণ ভবিষ্যতে সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের মধ্যেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। তারা ধারণা করছেন, পরবর্তী কার্যদিবসগুলোতে অনেকেই নির্ধারিত সময়ের আগেই উপস্থিত হয়ে নিজেদের কাজের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রাখবেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পুরোনো ধাঁচের রাজনীতি থেকে সরে এসে একটি কাঠামোগত পরিবর্তনের দিকে এগোতে চান। তার লক্ষ্য একটি মেধাভিত্তিক (মেরিটোক্রেসি-ভিত্তিক) প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে ব্যক্তিগত আনুগত্যের চেয়ে দক্ষতা ও কর্মদক্ষতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে।

তারা আরও মনে করেন, এই পরিবর্তন খুব সহজেই হবে না। কারণ দীর্ঘদিনের অভ্যাস ও সংস্কৃতি পরিবর্তন করতে কিছুটা সময় লাগে। তবে প্রধানমন্ত্রীর ধারাবাহিক উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে প্রশাসনে শৃঙ্খলা, দক্ষতা এবং জবাবদিহিতা বৃদ্ধির সম্ভবনা রয়েছে।।

সব মিলিয়ে, সময়ানুবর্তিতা, সরাসরি তদারকি এবং অপ্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতার বিরুদ্ধে অবস্থানের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী প্রশাসনে একটি নতুন কর্মসংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন—যার ফলাফল আগামী দিনগুলোতে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এবং এর ফলে দেশ ও দেশের জনগন সুফল ভোগ করবে।