শেষ পর্ব
তার সামনে পড়ে আছে কুদ্দুছ—নিঃশব্দ, নিথর, চিরতরে থেমে যাওয়া এক জীবন। একটু আগেও যে মানুষটি তার নাম ধরে পানি চেয়েছিল, সে এখন আর কোনো কথা বলছে না। চারপাশটা যেন হঠাৎ করেই স্তব্ধ হয়ে গেছে।
নিপা কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। যেন তার শরীর অবশ হয়ে গেছে। তারপর ধীরে ধীরে সে কুদ্দুছের পাশে বসে পড়ল। একজন জানালো নিপাকে কুদ্দুছ অনেকদিন ধরেই অসুস্থ ছিল।।
কুদ্দুছ শয্যাশায়ী ছিল অনেকদিন ধরেই,নিপা বলল। অসুস্থতা্ তাকে ধীরে ধীরে ভেঙে দিয়েছিল। শরীরের শক্তি হারিয়ে ফেললেও তার মনে ছিল একটাই নাম—নিপা। সে সবকিছু ভুলে গিয়েছিল, নিজের কষ্ট, নিজের অভাব, এমনকি নিজের অস্তিত্বও; কিন্তু নিপাকে ভুলতে পারেনি কখনো।
শেষ সময়েও সে নিপাকেই ডাকছিল।
নিপা কুদ্দুছের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল। তার চোখ দুটো অর্ধেক খোলা, যেন এখনো কারও অপেক্ষায় আছে। নিপার বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল।
হঠাৎ তার মনে পড়ল—কিছুক্ষণ আগে কুদ্দুছ তাকে কী বলেছিল।
তার কণ্ঠ তখন খুব ক্ষীণ, ভাঙা, তবুও প্রতিটি শব্দ ছিল স্পষ্ট—
“নিপা… জীবনে একটা কথা মনে রাখো… কাউকে কাঁদিয়ে নিজের স্বপ্ন সাজানো যায় না…”
নিপার চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়তে লাগল।
সে কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“কুদ্দুছ… আমি তো বুঝতে পারিনি…”
কিন্তু এখন আর কিছু বলার সুযোগ নেই।
কুদ্দুছ তখনও বলছিল—
“তুমি বলেছিলে… পৃথিবী বদলে গেলেও তুমি বদলাবে না… আমি বোকার মতো সেই কথা বিশ্বাস করেছিলাম…”
নিপা মাথা নিচু করে ফেলল। সেই কথাগুলো যেন তার বুকের ভেতর ছুরি হয়ে বিঁধছে।
“এখন দেখি… পৃথিবী ঠিকই আছে… শুধু বদলে গেছো তুমি…”
এই কথাটা বলার সময় কুদ্দুছের চোখে কোনো অভিযোগ ছিল না, ছিল শুধু এক ধরনের শান্ত কষ্ট—যে কষ্ট চিৎকার করে না, কিন্তু নিঃশব্দে মানুষকে শেষ করে দেয়।
“তাই আজ… আমি তোমার কাছ থেকে অনেক দূরে চলে যাচ্ছি… একদিন তোমার আমাকে মনে পড়বে… পড়বে… কিন্তু সেদিন হয়তো আমাকে স্পর্শ করারও সুযোগ থাকবে না…”
নিপা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
সে কুদ্দুছের নিথর হাতটা নিজের হাতে নিল। হাতটা ঠান্ডা হয়ে গেছে, প্রাণহীন।
“আমি অনেক দূরে যাচ্ছি… তুমি সুখে থাকো…”
এই ছিল তার শেষ কথা।
নিপার চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগল অতীতের দিনগুলো।
কুদ্দুছের সেই সরল হাসি…
তার নিঃস্বার্থ ভালোবাসা…
তার বারবার বলা—“আমার নিপা…”
কত সহজে, কত অবহেলায় সে সেই ভালোবাসাকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিল!
সে কখনো ভাবেনি, কেউ তাকে এতটা ভালোবাসতে পারে—যে নিজের জীবন পর্যন্ত তুচ্ছ করে দেয়।
আজ বুঝতে পারছে, ভালোবাসা সবসময় পাওয়া যায় না, কিন্তু যখন কেউ নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসে—সেটা হারিয়ে ফেলা সবচেয়ে বড় ক্ষতি।
রাত ধীরে ধীরে নেমে এলো।
চারপাশে নিস্তব্ধতা। শুধু নিপার কান্নার শব্দ ভেসে আসছে।
সে কুদ্দুছের বুকে মাথা রেখে কাঁদতে লাগল—
“তুমি তো বলেছিলে, আমি তোমার নিপা… আজ আমি সত্যিই তোমার হতে চেয়েছিলাম… কিন্তু তুমি আমাকে সেই সুযোগটাও দিলে না…”
তার কণ্ঠ ভেঙে যাচ্ছিল।
“একবার চোখ খুলে তাকাও… দেখো, আমি এসেছি… তোমার নিপা এসেছি…”
কিন্তু কোনো সাড়া নেই।
কুদ্দুছ এবার সত্যিই অনেক দূরে চলে গেছে—এমন এক জায়গায়, যেখান থেকে কেউ আর ফিরে আসে না।
সেই রাতের পর নিপার জীবন পুরোপুরি বদলে গেল।
সে আর আগের মতো হাসতে পারে না, কারও সঙ্গে সহজভাবে কথা বলতে পারে না। তার চারপাশে সবকিছু ঠিকই আছে—মানুষ, সম্পর্ক, জীবন—কিন্তু তার ভেতরটা ফাঁকা হয়ে গেছে।
প্রতিদিন সে নিজেকে প্রশ্ন করে—
“আমি কি ভুল করেছি?”
উত্তর সে জানে। তবুও সে নিজেকে ক্ষমা করতে পারে না।
কিছু ভালোবাসা থাকে, যা কখনো শেষ হয় না। মানুষ চলে যায়, কিন্তু সেই অনুভূতি থেকে যায়—একটা অমোচনীয় স্মৃতি হয়ে।
কুদ্দুছ চলে গেছে, কিন্তু তার ভালোবাসা রয়ে গেছে নিপার হৃদয়ের গভীরে। সেই ভালোবাসা এখন আর আনন্দ দেয় না, দেয় শুধু কষ্ট—একটা নিঃশব্দ যন্ত্রণা।
বছর পেরিয়ে যায়।
একদিন নিপা সেই পুরোনো জায়গায় ফিরে আসে, যেখানে কুদ্দুছ তাকে শেষবার ডাকেছিল। চারপাশ অনেক বদলে গেছে, কিন্তু স্মৃতিগুলো বদলায়নি।
সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে।
হালকা বাতাস বইছে। মনে হয়, কেউ যেন ফিসফিস করে বলছে—
“নিপা…”
নিপার চোখ ভিজে ওঠে।
সে আস্তে করে বলে—
“আমি এসেছি, কুদ্দুছ… এবার আর দেরি করিনি…”
কিন্তু এবার আর কোনো উত্তর নেই।
নিপা বুঝে গেছে—
সময় কখনো কারও জন্য থেমে থাকে না।
আর কিছু সুযোগ একবার হারালে, আর কখনো ফিরে আসে না।
শেষ বিকেলের সূর্য ডুবে যাচ্ছে।
নিপা ধীরে ধীরে চোখ মুছে নেয়। তার ঠোঁটে একটুকরো কষ্টের হাসি।
সে ফিসফিস করে বলে—
“তুমি ভালো থেকো… যেখানেই থাকো…”
তারপর ধীরে ধীরে সে হাঁটতে শুরু করে—একটা একাকী পথে, যেখানে স্মৃতি আছে, কিন্তু ফিরে পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
সমাপ্ত।