পর্ব – ৬
পূর্ণ ভালোবাসা না পেলে কাউকে আঁকড়ে ধরে রাখা উচিত নয়—এ কথাটা কুদ্দুছ অনেক আগেই বুঝেছিল। তবুও সে পারেনি নিজেকে সরিয়ে নিতে। কারণ কিছু ভালোবাসা থাকে, যেগুলো যুক্তি মানে না, হিসাব বোঝে না—শুধু হৃদয়ের গভীরে শেকড় গেড়ে বসে থাকে। সেই শেকড় উপড়ে ফেলতে গেলে মানুষ নিজেই ভেঙে পড়ে।
কুদ্দুছ জানত, নিপা তাকে ভালোবাসে না। হয়তো কোনো এক সময় ভালোবেসেছিল, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই অনুভূতি হারিয়ে গেছে। তবুও কুদ্দুছের ভালোবাসা কমেনি একটুও। বরং প্রতিদিন একটু একটু করে আরও গভীর হয়েছে।
অনেকে তাকে বলত, “ভাই, যে মানুষ তোমাকে ভালোবাসে না, তাকে এতটা ভালোবাসার মানে কী?”
কুদ্দুছ শুধু মৃদু হেসে বলত, “সব ভালোবাসার মানে খুঁজে পাওয়া যায় না।”
তার ভালোবাসা ছিল নিঃস্বার্থ, নিঃশব্দ, আর একান্ত নিজের। সে কখনো নিপার কাছে কিছু চায়নি—না সময়, না মনোযোগ, না কোনো প্রতিশ্রুতি। শুধু চেয়েছিল দূর থেকে তাকে দেখে যেতে, তাকে মনে রেখে বাঁচতে।
কুদ্দুছ কখনো নিপাকে শুধু “নিপা” বলে ডাকেনি। সে বলত—“আমার নিপা”। এই ‘আমার’ শব্দটার মধ্যে ছিল তার সমস্ত অনুভূতি, সমস্ত স্বপ্ন, সমস্ত না-পাওয়া ভালোবাসা।
কিন্তু একদিন সেই ‘আমার’ শব্দটা তার জীবন থেকে চিরতরে হারিয়ে গেল।
সময় বদলাতে লাগল। নিপা তার জীবনে নতুন করে এগিয়ে গেল। নতুন মানুষ, নতুন স্বপ্ন, নতুন বাস্তবতা—সবকিছু নিয়ে সে নিজের একটা পৃথিবী গড়ে তুলল। সেখানে কুদ্দুছের কোনো জায়গা ছিল না।
অন্যদিকে কুদ্দুছ থেমে রইল ঠিক সেখানেই, যেখানে নিপা তাকে ছেড়ে গিয়েছিল। সে এগোতে পারল না, ভুলতে পারল না, এমনকি নতুন করে বাঁচতেও পারল না।
প্রতিদিন রাতে সে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবত—
“নিপা, তুমি কি একবারও আমার কথা ভাবো?”
কিন্তু উত্তর আসত না।
ধীরে ধীরে কুদ্দুছের জীবন নিঃশব্দে বদলে যেতে লাগল। সে আগের মতো হাসত না, কারও সঙ্গে কথা বলত না। তার বন্ধুরা একে একে দূরে সরে গেল। সবাই ভাবল, সময় হলে সে ঠিক হয়ে যাবে।
কিন্তু কেউ বুঝতে পারেনি—সে ঠিক হওয়ার জন্য বেচেঁছিল না, সে বেচেঁছিল শুধু নিপাকে মনে রেখে।
তার শরীরও দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ছিল। ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করত না, ঘুমাত না। ভিতরে ভিতরে এক অদৃশ্য কষ্ট তাকে তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছিল।
একদিন হঠাৎ করে নিপার মনে পড়ল কুদ্দুছের কথা।
কেন মনে পড়ল, সে নিজেও জানত না। হয়তো কোনো পুরোনো স্মৃতি, হয়তো কোনো অজানা টান। অনেকদিন পর তার মনে হলো—
“কুদ্দুছ এখন কেমন আছে?” তার খুব জানতে ইচ্ছা করলো।
এই প্রশ্নটা তাকে অস্থির করে তুলল। সে খোঁজ নিতে শুরু করল। এক বন্ধুর কাছ থেকে শুনল, কুদ্দুছ খুব একটা ভালো নেই। একা থাকে, কারও সঙ্গে মেশে না।
নিপার বুকটা হঠাৎ করে কেঁপে উঠল।
সে সিদ্ধান্ত নিল—আজই সে কুদ্দুছকে দেখতে যাবে।
সন্ধ্যার দিকে নিপা পৌঁছাল সেই পুরোনো জায়গায়, যেখানে কুদ্দুছ থাকত। জায়গাটা অনেকটাই বদলে গেছে, কিন্তু কুদ্দুছের ছোট ঘরটা এখনও আগের মতোই আছে।
দূর থেকে নিপা দেখল—একটা ছায়া মাটিতে পড়ে আছে। কেউ একজন যেন শুয়ে আছে।
তার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
আরও কাছে আসতেই সে শুনতে পেল ক্ষীণ একটা কণ্ঠ—
“নিপা… একটু পানি দাও…”
শব্দটা শুনে নিপার শরীর শিউরে উঠল। এটা কুদ্দুছের কণ্ঠ!
সে দৌড়ে গেল। ঘরের পাশে রাখা একটা পাত্র থেকে পানি নিয়ে দ্রুত ফিরে এল।
কিন্তু…
ফিরে এসে যা দেখল, তা সে কখনো কল্পনাও করেনি।
কুদ্দুছ আর নেই। দুই চোখ বেয়ে পানি ছিল । পানির ফোটাগুলোর দাগ রয়েছে। কিন্তু কুদ্দুছের শ্বাস- প্রশ্বাস ছিল বন্ধ। কুদ্দুছ নিপা মায়া ত্যাগ করে অজানা দেশে চলে গেছে।
তার চোখ দুটো স্থির হয়ে গেছে, ঠোঁট শুকিয়ে গেছে। মনে হচ্ছিল, সে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কারও অপেক্ষায় ছিল। হয়তো নিপারই।
নিপার হাত থেকে পানির পাত্রটা পড়ে গেল। পানি ছড়িয়ে পড়ল মাটিতে—ঠিক যেমন কুদ্দুছের অসম্পূর্ণ ভালোবাসা ছড়িয়ে পড়েছিল তার জীবনে।
নিপা হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল কুদ্দুছের পাশে।
তার চোখ থেকে পানি পড়ছিল মাটিতে।
সে কাঁপা কণ্ঠে বলল—
“কুদ্দুছ… আমি এসেছি… দেখো, আমি এসেছি… তোমার নিপা…”
কিন্তু এবার আর কোনো উত্তর এল না।
সেই দিন নিপা বুঝতে পারল—
সব ভালোবাসা পাওয়া যায় না, কিন্তু কিছু ভালোবাসা চিরকাল থেকে যায়।
কুদ্দুছ তাকে কখনো দোষ দেয়নি, কখনো কিছু চায়নি। শুধু ভালোবেসেছিল—শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত।
আর নিপা?
সে বুঝতে পারল, সে এক বিশাল ভালোবাসা হারিয়ে ফেলেছে—যার কোনো তুলনা নেই।
রাত নেমে এলো ধীরে ধীরে।
আকাশে চাঁদ উঠেছে, কিন্তু নিপার চোখে সব অন্ধকার।
সে কুদ্দুছের নিথর হাতটা ধরে ফিসফিস করে বলল—
“তুমি তো বলতেই, আমি তোমার নিপা… আজ আমি সত্যিই তোমার হতে চেয়েছিলাম… কিন্তু তুমি চলে গেলে…”
তার কণ্ঠ ভেঙে গেল।
সেই দিন থেকে নিপার জীবনও আর আগের মতো রইল না।
সে বুঝে গেল—
অপূর্ণ ভালোবাসা মানুষকে মারে না, কিন্তু ভিতর থেকে চিরতরে বদলে দেয়।
কুদ্দুছ হয়তো চলে গেছে, কিন্তু তার ভালোবাসা থেকে গেছে—নিপার হৃদয়ের গভীরে, এক অমোচনীয় দাগ হয়ে।
চলবে…