ঢাকা, শুক্রবার, ৩ এপ্রিল ২০২৬,
সময়: ০৫:৫৩:০৭ PM

উপন্যাস:“সম্পর্ক”

মান্নান মারুফ
03-04-2026 04:00:16 PM
উপন্যাস:“সম্পর্ক”

পর্ব ৬

সময় মানুষকে বদলে দেয়—কখনো অজান্তেই, কখনো ইচ্ছার বিরুদ্ধে। যে মানুষ একসময় আবেগে ভেসে যেত, সে-ই একদিন হয়ে ওঠে স্থির, নির্লিপ্ত। কুদ্দুছ আর নীপার জীবনও ঠিক তেমনভাবেই বদলে গেছে।

বছর কেটে গেছে।

নীপা এখন কানাডায় প্রতিষ্ঠিত। নিজের চাকরি, নিজের জীবন—সবকিছু নিয়ে সে এখন অনেকটাই স্বাভাবিক। আরিয়ানের সাথে তার সম্পর্কটাও ধীরে ধীরে গভীর হয়েছে। খুব বেশি নাটকীয়তা নেই, তীব্র আবেগ নেই—কিন্তু আছে একটা স্থিরতা, একটা নির্ভরতা।

একদিন আরিয়ান তাকে বলল,
“আমরা কি আমাদের সম্পর্কটা পরবর্তী ধাপে নিতে পারি?”

নীপা একটু চুপ করে রইল।

এই প্রশ্নটা তার কাছে নতুন না—কিন্তু এর উত্তরটা সহজও না।

“তুমি কি নিশ্চিত?”—নীপা জিজ্ঞেস করল।

আরিয়ান হেসে বলল,
“আমি নিশ্চিত না হলে বলতাম না।”

নীপা জানত—এটা সেই সম্পর্ক না, যেটা একসময় কুদ্দুছের সাথে ছিল। এখানে কোনো উন্মাদনা নেই, কোনো অস্থিরতা নেই।

কিন্তু আছে একটা শান্তি।

এবং হয়তো এই শান্তিটাই এখন তার প্রয়োজন।

অন্যদিকে, কুদ্দুছও তার জীবনে অনেকটাই এগিয়ে গেছে। তানিয়ার সাথে তার সংসার চলছে—দায়িত্ব, কাজ, পরিবার—সবকিছু নিয়েই সে ব্যস্ত।

তাদের একটি ছোট্ট সন্তানও হয়েছে।

জীবন এখন তার কাছে অনেক বাস্তব।

কিন্তু মাঝে মাঝে, একেবারে অপ্রত্যাশিত মুহূর্তে, তার মনে পড়ে যায় পুরোনো কিছু কথা।

একদিন রাতে, অফিস থেকে ফেরার পথে হঠাৎ করে বৃষ্টি শুরু হলো।

সে থেমে গেল।

এই বৃষ্টিটা যেন তাকে কয়েক বছর পেছনে নিয়ে গেল—একটা ছাতা, দুজন মানুষ, আর কিছু না বলা কথা।

নীপার মুখটা হঠাৎ করেই ভেসে উঠল তার চোখের সামনে।

কুদ্দুছ কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর নিজেই হালকা করে হেসে বলল,
“সবকিছুই বদলে যায়।”

এদিকে, একদিন হঠাৎ করে নীপার কাছে একটি ইমেইল এল—বাংলাদেশ থেকে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো বন্ধুদের একটি পুনর্মিলনী (রিইউনিয়ন) অনুষ্ঠান হবে।

প্রথমে সে বিষয়টা তেমন গুরুত্ব দেয়নি।

কিন্তু পরে যখন বিস্তারিত পড়ল, তার মনে একটা অদ্ভুত অনুভূতি জাগল।

এই ক্যাম্পাস, এই মানুষগুলো—এগুলো তো তার জীবনের একটা বড় অংশ ছিল।

আর সেই অংশের সাথে জড়িয়ে আছে—কুদ্দুছ।

সে অনেক ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিল—সে যাবে।

অনেক বছর পর, সে আবার বাংলাদেশে ফিরল।

সবকিছু আগের মতোই, আবার যেন একদম নতুন।

ক্যাম্পাসে পা রাখতেই তার মনে হলো—সময় যেন একসাথে থেমেও আছে, আবার এগিয়েও গেছে।

রিইউনিয়নের দিন, চারপাশে পুরোনো মুখগুলো—সবাই বদলে গেছে, তবুও কোথাও একটা পরিচিতি রয়ে গেছে।

নীপা সবার সাথে কথা বলছে, হাসছে, পুরোনো স্মৃতি রোমন্থন করছে।

কিন্তু তার মনের ভেতরে একটা প্রশ্ন ঘুরছে—
“সে কি আসবে?”

এবং ঠিক তখনই—

দূর থেকে সে দেখতে পেল—কুদ্দুছ।

কিছুক্ষণ তাদের চোখে চোখ পড়ল।

সময় যেন থেমে গেল।

কিন্তু সেই দৃষ্টিতে আর আগের মতো কোনো তীব্রতা নেই।

শুধু এক ধরনের নীরব স্বীকৃতি—
“আমরা একসময় একে অপরকে চিনতাম।”

কুদ্দুছ এগিয়ে এল।

“কেমন আছো?”—সে বলল।

নীপা মৃদু হেসে বলল,
“ভালো আছি। তুমি?”

“আমি-ও ভালো।”

এই সাধারণ কথোপকথনের ভেতরেই লুকিয়ে ছিল হাজারো না বলা কথা।

কিছুক্ষণ তারা একসাথে দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর কুদ্দুছ বলল,
“তুমি অনেক বদলে গেছ।”

নীপা হেসে বলল,
“তুমিও।”

“সময় বদলে দেয়,”—কুদ্দুছ বলল।

“হ্যাঁ, বদলে দেয়।”

একটু নীরবতা।

তারপর নীপা নিজেই বলল,
“তোমার সংসার কেমন?”

কুদ্দুছ হালকা হাসল।
“ভালো। একটা মেয়ে হয়েছে।”

“খুব ভালো খবর।”

“তোমার?”

নীপা একটু থেমে বলল,
“আমি… ভালো আছি। আরিয়ান আছে আমার জীবনে।”

কুদ্দুছ মাথা নাড়ল।

কোনো অস্বস্তি নেই, কোনো কষ্ট নেই—শুধু একটা পরিণত স্বাভাবিকতা।

কিছুক্ষণ পর তারা আলাদা হয়ে গেল।

কেউ কাউকে আটকে রাখল না।

কারণ এখন আর তাদের মধ্যে সেই সম্পর্ক নেই—যেটা একসময় ছিল।

কিন্তু সেই দেখা, সেই কয়েক মিনিটের কথোপকথন—দুজনের মনেই এক ধরনের নাড়া দিয়ে গেল।

রাতে, বাড়ি ফিরে নীপা একা বসে ছিল।

সে ভাবছিল—
“এই মানুষটাকে আমি একসময় এত ভালোবাসতাম… আর আজ?”

আজ সে শুধু একজন পরিচিত মানুষ।

অন্যদিকে, কুদ্দুছও সেদিন রাতে কিছুটা চুপচাপ ছিল।

তানিয়া জিজ্ঞেস করল,
“কি ভাবছো?”

সে হেসে বলল,
“পুরোনো কিছু কথা মনে পড়ছে।”

“অতীত?”

“হ্যাঁ… কিন্তু তেমন কিছু না।”

কারণ সে জানে—অতীতকে ধরে রাখার কোনো মানে নেই।

এই হঠাৎ করে দেখা হওয়া—তাদের জীবনে কোনো পরিবর্তন আনেনি।

তারা আবার তাদের নিজ নিজ জীবনে ফিরে গেছে।

কিন্তু একটা জিনিস পরিষ্কার হয়ে গেছে—

তাদের সম্পর্কটা সত্যিই শেষ হয়ে গেছে।

কোনো আফসোস নেই, কোনো অভিযোগ নেই।

শুধু একটা স্মৃতি।

যেটা এখন আর কষ্ট দেয় না—বরং একটা শিক্ষা দেয়।

সম্ভবত এটাই বাস্তব।

ভালবাসা হয়তো সাময়িক, কিন্তু তার প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী।

এবং সেই প্রভাব নিয়েই মানুষ এগিয়ে যায়।

 চলবে..........