ঢাকা, রবিবার, ২২ মার্চ ২০২৬,
সময়: ০৩:২৯:২৫ PM

উপন্যাস: সেই মেয়েটি

মান্নান মারুফ
22-03-2026 01:24:30 PM
উপন্যাস: সেই মেয়েটি

পর্ব-৩

এবার আর রিকশায় যাওয়ার উপায় নেই। মেয়েটি নিজেই নেমে হেঁটে চলেছে—ধীর পায়ে, নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে। যেন তার কোথাও তাড়া নেই, কোথাও পৌঁছানোর কোনো ব্যাকুলতাও নেই। সেই হাঁটার ভেতরেও ছিল এক অদ্ভুত ছন্দ, যা কুদ্দুছকে অজান্তেই টেনে নিয়ে যাচ্ছিল।

কুদ্দুছ আর তার বন্ধু একে অপরের দিকে তাকালো। কোনো কথা হলো না, তবুও দু’জনেই বুঝে গেল—তাদেরও হাঁটতেই হবে।

তারা হাঁটা শুরু করলো।

সামনে মেয়েটি, আর কিছুটা দূরে পেছনে তারা।

রাস্তা তখন প্রায় ফাঁকা। বিকেলের আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসছে। গাছের ছায়া লম্বা হয়ে রাস্তার ওপর পড়েছে। মাঝে মাঝে হালকা বাতাস বইছে, আর সেই বাতাসে মেয়েটির চুল উড়ে গিয়ে আবার স্থির হয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু হঠাৎ—

মেয়েটি পেছন ফিরে তাকালো।

কুদ্দুছ আর তার বন্ধু সঙ্গে সঙ্গে অন্যদিকে তাকিয়ে রইলো, যেন তারা কিছুই জানে না, কিছুই দেখছে না।

মেয়েটি আবার সামনে হাঁটতে শুরু করলো।

কিছুক্ষণ পর আবার পেছন ফিরে তাকালো।

আবার একই দৃশ্য—দু’জন অপরিচিত ছেলে, যেন নিজেদের মধ্যেই ব্যস্ত।

এভাবে চলতে লাগলো।

একবার সে তাকায়, তারা চোখ সরিয়ে নেয়।
একবার তারা এগোয়, সে একটু গতি বাড়ায়।

এই অদ্ভুত লুকোচুরি খেলায় সময় কেটে যাচ্ছিল।

কিন্তু এই খেলার ভেতরে ছিল ভয়ও।

মেয়েটির চোখে ধীরে ধীরে একটা আতঙ্কের ছায়া জমতে লাগলো। সে বুঝতে পারছিল—এই দুই ছেলেই তার পিছু নিয়েছে।

আর কুদ্দুছও বুঝতে পারছিল—সে যা করছে, সেটা ঠিক নয়।

তার বুকের ভেতর হঠাৎ একটা অপরাধবোধ জেগে উঠলো।

—“আমরা কি ভুল করছি?”
সে ধীরে বললো।

বন্ধু একটু থেমে বললো,
—“হয়তো… কিন্তু এখন তো এসেই পড়েছি।”

কুদ্দুছ চুপ করে গেল।

সে জানতো—এটা ইভটিজিংয়ের মধ্যে পড়ে। এমন কাজ সে কখনো করেনি। কোনো মেয়েকে এভাবে অনুসরণ করার সাহস বা ইচ্ছা—কোনোটাই তার ছিল না।

কিন্তু আজ—

আজ কেন যেন সবকিছু বদলে গেছে।

এই মেয়েটির মধ্যে এমন কিছু আছে, যা তাকে নিজের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছে।

সে নিজেকে থামাতে পারছে না।

তারা হাঁটতেই থাকলো।

হঠাৎ করেই সামনে দেখা গেল—রাস্তার পাশে কয়েকজন ছেলে দাঁড়িয়ে আছে।

মুখে হাসি, কারো হাতে সিগারেট, কেউ আবার চুপচাপ তাকিয়ে আছে।

কুদ্দুছের বুক ধক করে উঠলো।

—“দোস্ত… খারাপ লাগতেছে…”
সে বললো।

বন্ধুও একটু ভয় পেল।

—“ওরা যদি কিছু বলে?”

কুদ্দুছ কিছু বললো না।

তার মাথায় তখন একটাই চিন্তা—যদি মেয়েটি তাদের বিরুদ্ধে কিছু বলে, তাহলে এই ছেলেগুলোই হয়তো তাদের ধরে মারবে।

পরিস্থিতি হঠাৎ করেই ভারী হয়ে উঠলো।

ঠিক তখনই—

কুদ্দুছের বন্ধু হঠাৎ দৌড় দিল!

—“এই! থাম!”
কুদ্দুছ চিৎকার করে বললো।

কিন্তু সে থামলো না।

সে দৌড়াতে দৌড়াতে দূরে চলে গেল, যেন এই জায়গা থেকে যত দ্রুত সম্ভব পালাতে চায়।

কুদ্দুছ একা হয়ে গেল।

চারপাশে অচেনা মানুষ, সামনে সেই মেয়েটি, আর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন অজানা ছেলে।

তার পা কাঁপছিল।

তবুও—

সে থামলো না।

সে আবার হাঁটা শুরু করলো।

একাই।

মেয়েটির পেছনে।

তার বুকের ভেতর ভয় আর আকর্ষণ একসাথে লড়াই করছিল।

সে জানতো—এখন ফিরে যাওয়া উচিত।

কিন্তু সে পারলো না।

মেয়েটির প্রতি সেই অদ্ভুত টান তাকে আটকে রেখেছে।

এই সময় সেই ছেলেগুলো নড়েচড়ে উঠলো।

তারা কুদ্দুছের দিকে এগিয়ে আসতে লাগলো।

কুদ্দুছের বুক ধকধক করতে লাগলো।

—“এবার বুঝি শেষ…”
সে মনে মনে বললো।

তার গলা শুকিয়ে গেল।

সে দাঁড়িয়ে পড়লো।

কিন্তু আশ্চর্য—

ছেলেগুলো তার পাশ দিয়ে হেঁটে চলে গেল।

কেউ কিছু বললো না।

কেউ তাকিয়েও দেখলো না।

কুদ্দুছ অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।

যেন সে অদৃশ্য।

যেন তার কোনো অস্তিত্বই নেই।

সে ধীরে ধীরে শ্বাস নিল।

তার বুকের ভেতর জমে থাকা ভয় একটু একটু করে কমতে লাগলো।

এবার সে আবার হাঁটা শুরু করলো।

সামনে সেই মেয়েটি।

কিন্তু এখন তার হাঁটার ভঙ্গি বদলে গেছে।

সে একটু দ্রুত হাঁটছে।

মাঝে মাঝে পেছনে তাকাচ্ছে।

তার চোখে এখন স্পষ্ট ভয়।

এই ভয়টা কুদ্দুছের হৃদয়কে বিদীর্ণ করে দিল।

সে বুঝতে পারলো—তার এই অনুসরণ মেয়েটিকে কষ্ট দিচ্ছে।

তবুও—

সে থামলো না।

কারণ তার ভেতরে এখন আর শুধু কৌতূহল নেই, আছে এক অদ্ভুত অনুভূতি—যা তাকে বারবার বলছে, “ওকে হারিও না…”

হঠাৎ কুদ্দুছ থেমে গেল।

তার মনে হলো—সে কি সত্যিই ভালোবাসার পিছু নিচ্ছে?

নাকি—

সে নিজেই একটা ভুল গল্পের ভেতরে ঢুকে পড়েছে?

দূরে, সূর্য ডুবে যাচ্ছে।

আলো ধীরে ধীরে অন্ধকারে বদলে যাচ্ছে।

মেয়েটির ছায়া লম্বা হয়ে মাটিতে পড়ছে।

আর সেই ছায়ার পিছু নিয়েই হাঁটছে কুদ্দুছ।

একটা ছায়া আরেকটা ছায়াকে অনুসরণ করছে—

যেখানে কোনো শব্দ নেই,
কোনো নিশ্চয়তা নেই,
শুধু আছে এক অজানা পরিণতির দিকে এগিয়ে চলা।

কুদ্দুছ বুঝতে পারছিল—

তার বন্ধু চলে গেছে,
তার সাহসও ধীরে ধীরে ফুরিয়ে যাচ্ছে,
তবুও সে থামছে না।

কারণ সে জানে—

এই পথের শেষে হয়তো আছে ভালোবাসা।

অথবা—

একটি ভয়ংকর ট্রাজেডি।

মেয়েটি আবার একবার পেছনে তাকালো।

এইবার কুদ্দুছ চোখ সরালো না।

দু’জনের চোখে চোখ পড়লো।

সেই চোখে ছিল ভয়,
কিন্তু তার সাথে ছিল এক অদ্ভুত প্রশ্ন—

“তুমি কেন আমার পিছু নিচ্ছো?”

কুদ্দুছ কোনো উত্তর দিতে পারলো না।

শুধু দাঁড়িয়ে রইলো।

তার ভেতরের সব অনুভূতি যেন এক জায়গায় এসে থেমে গেছে।

মেয়েটি আবার সামনে ফিরে হাঁটতে শুরু করলো।

আর কুদ্দুছ—

সে আবার হাঁটা শুরু করলো তার পিছু নিয়ে।

একাকী।

নিঃশব্দে।

অজানা এক ভালোবাসার টানে—

যা তাকে ধীরে ধীরে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে এমন এক অন্ধকারের দিকে,

যেখান থেকে ফিরে আসা হয়তো আর সম্ভব হবে না…

চলবে…